০৩:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে চাঞ্চল্য হামের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু, সিলেটে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৯ সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় নয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ কাবুল ‘অক্ষম’ না ‘অনিচ্ছুক’: পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকট ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন সেপ্টেম্বরের অপেক্ষা: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রকৃত ঝুঁকি এখনও সামনে খুলনার মসজিদে ফজরের নামাজের সময় গুলিবর্ষণ, আহত ২ পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও যেতে দেব না, দাবি ভারতের; নতুন করে বাড়ছে পানি সংকটের আশঙ্কা ২০২৭ সিনেট নির্বাচন ঘিরে পিটিআইর শঙ্কা, আরও শক্তিশালী হতে পারে ‘হাইব্রিড ব্যবস্থা’ পাকিস্তানের বাজেট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, খুশি বস্ত্রখাত, উদ্বেগে পোলট্রি ও শ্রমিক সংগঠন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি ঘিরে উত্তেজনা, তেহরানে বিক্ষোভের মধ্যেই বাড়ছে সমঝোতার আশা

কাবুল ‘অক্ষম’ না ‘অনিচ্ছুক’: পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকট ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন

আফগানিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে পাকিস্তান যদি বিমান হামলা চালায়, তাহলে কি তা পাকিস্তানের ভেতরে ভারতের সামরিক হামলার যৌক্তিকতাকে সমর্থন করে? আমার মতে, করে না। কারণ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে দুটি পরিস্থিতি এক নয় এবং তাদের আইনি ভিত্তিও সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তবে এটাও সত্য যে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যত তিক্ততাই থাকুক না কেন, দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের বিকল্প নেই। কোনো রাষ্ট্রই অনির্দিষ্টকাল বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভর করতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন পাকিস্তান একের পর এক সন্ত্রাসী হামলার মুখোমুখি হচ্ছে, তখন কূটনৈতিক সমাধানের জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করা সম্ভব?

ফেব্রুয়ারিতে ৮০টি, মার্চে ১৪৬টি এবং এপ্রিলে ৮৫টি হামলা হয়েছে। গত এক বছরে শত শত হামলার ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সামনে বিকল্প সীমিত হয়ে আসে। সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সক্ষমতা ধ্বংস করতে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত তখন নিরাপত্তার প্রয়োজনে বিবেচিত হতে পারে।

Increasing Use of UN Charter Article 51 and the Security Council

জাতিসংঘ সনদের অধীনে আত্মরক্ষার যে আধুনিক ব্যাখ্যা গড়ে উঠেছে, তার আলোকে এমন পদক্ষেপকে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে দেখা যায়। প্রতিটি হামলার উদ্দেশ্য নতুন হামলা প্রতিরোধ করা। যখন গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনটি সন্ত্রাসী আক্রমণ ঘটছে এবং বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় ধারাবাহিক রক্তক্ষয়ী হামলা হচ্ছে, তখন আসন্ন হুমকির ধারণাও বাস্তব রূপ পায়।

পাকিস্তানের দাবি, তাদের লক্ষ্য কখনোই আফগান রাষ্ট্র নয়। লক্ষ্য হচ্ছে অস্ত্রভাণ্ডার, গোলাবারুদের গুদাম, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল। এসব লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত নজরদারি ব্যবহৃত হয়। যদিও যেকোনো সামরিক অভিযানের মতো এখানে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থাকে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল হিসেবেই বিবেচিত হয়।

আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—‘অক্ষম’ অথবা ‘অনিচ্ছুক’ রাষ্ট্র। আফগান সরকার বহুবার বলেছে, তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অনুমোদন দেয়নি। কিন্তু একই সঙ্গে তারা এসব গোষ্ঠীকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেও ব্যর্থ হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কাবুল সরকার কি সত্যিই অক্ষম, নাকি তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক?

পাকিস্তানের কিছু নীতিনির্ধারক আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, এটি কেবল সক্ষমতার সংকট নয়; বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবও রয়েছে। এই বিতর্ক আন্তর্জাতিক আইন ও ভূরাজনীতির সংযোগস্থলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

India–Pakistan ceasefire remains shaky, with relations unlikely to return  to status quo | Chatham House – International Affairs Think Tank

অন্যদিকে, পাকিস্তানের ভেতরে ভারতের আগের হামলাগুলোকে একই আইনি কাঠামোর মধ্যে ফেলা যায় না। আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের জন্য যে ‘আসন্ন হুমকি’র প্রমাণ প্রয়োজন, তা সেখানে অনুপস্থিত ছিল। যাদের বিরুদ্ধে ভারত পদক্ষেপ নিয়েছিল বলে দাবি করা হয়, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় ছিলেন।

যদি কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে প্রথমে সেই ঘটনার জন্য দায়ী পক্ষকে প্রমাণের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হয়। তার পরিবর্তে তদন্ত, আইনি সহযোগিতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার পথ অনুসরণ করা আরও গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু সামরিক প্রতিক্রিয়ার পথ বেছে নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

পাকিস্তান দাবি করে যে সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থা, তদন্ত কাঠামো, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা কার্যকর অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নেও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় তাদের কিছু অগ্রগতির স্বীকৃতি এসেছে।

Afghanistan and the International Criminal Court | Human Rights Watch

এই কারণেই পাকিস্তানের যুক্তি হলো, তারা ‘সক্ষম’ এবং ‘আগ্রহী’ রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে, যেখানে আফগানিস্তান সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না। ফলে আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনায় দুটি পরিস্থিতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

সবশেষে, শক্তি প্রয়োগ কখনোই স্থায়ী সমাধান নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তা সাময়িক উপায় হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ রাজনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ।

লেখক: আহমের বিলাল সুফি, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক আইনমন্ত্রী।

জনপ্রিয় সংবাদ

কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে চাঞ্চল্য

কাবুল ‘অক্ষম’ না ‘অনিচ্ছুক’: পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকট ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন

০২:৫৮:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

আফগানিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে পাকিস্তান যদি বিমান হামলা চালায়, তাহলে কি তা পাকিস্তানের ভেতরে ভারতের সামরিক হামলার যৌক্তিকতাকে সমর্থন করে? আমার মতে, করে না। কারণ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে দুটি পরিস্থিতি এক নয় এবং তাদের আইনি ভিত্তিও সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তবে এটাও সত্য যে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যত তিক্ততাই থাকুক না কেন, দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের বিকল্প নেই। কোনো রাষ্ট্রই অনির্দিষ্টকাল বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভর করতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন পাকিস্তান একের পর এক সন্ত্রাসী হামলার মুখোমুখি হচ্ছে, তখন কূটনৈতিক সমাধানের জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করা সম্ভব?

ফেব্রুয়ারিতে ৮০টি, মার্চে ১৪৬টি এবং এপ্রিলে ৮৫টি হামলা হয়েছে। গত এক বছরে শত শত হামলার ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সামনে বিকল্প সীমিত হয়ে আসে। সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সক্ষমতা ধ্বংস করতে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত তখন নিরাপত্তার প্রয়োজনে বিবেচিত হতে পারে।

Increasing Use of UN Charter Article 51 and the Security Council

জাতিসংঘ সনদের অধীনে আত্মরক্ষার যে আধুনিক ব্যাখ্যা গড়ে উঠেছে, তার আলোকে এমন পদক্ষেপকে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে দেখা যায়। প্রতিটি হামলার উদ্দেশ্য নতুন হামলা প্রতিরোধ করা। যখন গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনটি সন্ত্রাসী আক্রমণ ঘটছে এবং বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় ধারাবাহিক রক্তক্ষয়ী হামলা হচ্ছে, তখন আসন্ন হুমকির ধারণাও বাস্তব রূপ পায়।

পাকিস্তানের দাবি, তাদের লক্ষ্য কখনোই আফগান রাষ্ট্র নয়। লক্ষ্য হচ্ছে অস্ত্রভাণ্ডার, গোলাবারুদের গুদাম, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল। এসব লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত নজরদারি ব্যবহৃত হয়। যদিও যেকোনো সামরিক অভিযানের মতো এখানে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থাকে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল হিসেবেই বিবেচিত হয়।

আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—‘অক্ষম’ অথবা ‘অনিচ্ছুক’ রাষ্ট্র। আফগান সরকার বহুবার বলেছে, তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অনুমোদন দেয়নি। কিন্তু একই সঙ্গে তারা এসব গোষ্ঠীকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেও ব্যর্থ হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কাবুল সরকার কি সত্যিই অক্ষম, নাকি তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক?

পাকিস্তানের কিছু নীতিনির্ধারক আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, এটি কেবল সক্ষমতার সংকট নয়; বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবও রয়েছে। এই বিতর্ক আন্তর্জাতিক আইন ও ভূরাজনীতির সংযোগস্থলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

India–Pakistan ceasefire remains shaky, with relations unlikely to return  to status quo | Chatham House – International Affairs Think Tank

অন্যদিকে, পাকিস্তানের ভেতরে ভারতের আগের হামলাগুলোকে একই আইনি কাঠামোর মধ্যে ফেলা যায় না। আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের জন্য যে ‘আসন্ন হুমকি’র প্রমাণ প্রয়োজন, তা সেখানে অনুপস্থিত ছিল। যাদের বিরুদ্ধে ভারত পদক্ষেপ নিয়েছিল বলে দাবি করা হয়, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় ছিলেন।

যদি কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে প্রথমে সেই ঘটনার জন্য দায়ী পক্ষকে প্রমাণের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হয়। তার পরিবর্তে তদন্ত, আইনি সহযোগিতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার পথ অনুসরণ করা আরও গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু সামরিক প্রতিক্রিয়ার পথ বেছে নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

পাকিস্তান দাবি করে যে সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থা, তদন্ত কাঠামো, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা কার্যকর অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নেও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় তাদের কিছু অগ্রগতির স্বীকৃতি এসেছে।

Afghanistan and the International Criminal Court | Human Rights Watch

এই কারণেই পাকিস্তানের যুক্তি হলো, তারা ‘সক্ষম’ এবং ‘আগ্রহী’ রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে, যেখানে আফগানিস্তান সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না। ফলে আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনায় দুটি পরিস্থিতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

সবশেষে, শক্তি প্রয়োগ কখনোই স্থায়ী সমাধান নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তা সাময়িক উপায় হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ রাজনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ।

লেখক: আহমের বিলাল সুফি, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক আইনমন্ত্রী।