পাকিস্তানে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। প্রতি বছর বাজেটের সময় এ প্রশ্ন আবার সামনে আসে—রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ কি নগদ সহায়তা কর্মসূচিতে ব্যয় করা উচিত, নাকি তা শিল্প, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান তৈরির প্রকল্পে বিনিয়োগ করা উচিত? অনেকের কাছে এই প্রশ্নটি অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয়। কিন্তু বাস্তবে এটি আরও গভীর একটি প্রশ্ন—রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ এবং উন্নয়ন বলতে ঠিক কী বোঝায়?
সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে সমালোচনার বড় অংশই একটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে দরিদ্র মানুষের হাতে নগদ অর্থ তুলে দেওয়া উৎপাদনশীল নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ধরে নেয় যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেবল কারখানা, সড়ক বা বড় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমেই সম্ভব। কিন্তু মানুষের জীবন ও অর্থনীতির বাস্তবতা এত সরল নয়। যারা দারিদ্র্য, মূল্যস্ফীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা আয়ের অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করে, তাদের জন্য সামান্য আর্থিক সহায়তাও জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের বেনজির ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রাম (বিআইএসপি) এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। এটি কেবল দরিদ্র পরিবারকে কিছু নগদ অর্থ দেওয়ার প্রকল্প নয়; সময়ের সঙ্গে এটি একটি বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। মাতৃ ও শিশু পুষ্টি, শিক্ষাবৃত্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নারীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে একত্রে যুক্ত করে কর্মসূচিটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানব উন্নয়ন কৌশলের রূপ নিয়েছে।

প্রায়ই সামাজিক সুরক্ষাকে দান বা অনুদান হিসেবে দেখা হয়। অথচ এর প্রকৃত অর্থ ভিন্ন। এটি মানুষের সক্ষমতা গড়ে তোলার একটি বিনিয়োগ। একটি অপুষ্ট শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা জাতীয় উৎপাদনশীলতা, স্বাস্থ্য ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপরও পড়ে। একইভাবে শিক্ষাবঞ্চিত একটি শিশু ভবিষ্যতে দক্ষ শ্রমশক্তির অংশ হতে পারে না। ফলে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয়কে যদি শুধুই বর্তমানের ব্যয় হিসেবে দেখা হয়, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল উপেক্ষিত হয়।
এখানেই সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার ভুলটি স্পষ্ট হয়। বাস্তবে সফল রাষ্ট্রগুলো কখনও এই দুইয়ের মধ্যে নির্বাচন করে না। তারা একই সঙ্গে মানবসম্পদ এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে। কারণ একটি সুস্থ, শিক্ষিত ও নিরাপদ জনগোষ্ঠী ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
নগদ সহায়তা মানুষের কর্মস্পৃহা নষ্ট করে বা নির্ভরশীলতা বাড়ায়—এমন অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা এ দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ খুঁজে পায়নি। বরং দেখা গেছে, দরিদ্র পরিবারগুলো সহায়তার অর্থের বড় অংশ খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন ব্যয়ে ব্যবহার করে। অনেক পরিবার ছোট আকারের সম্পদ, যেমন গবাদিপশু বা হাঁস-মুরগি কিনে আয়ের বিকল্প উৎসও তৈরি করে। অর্থাৎ সহায়তা তাদের শ্রমবাজার থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না; বরং ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ায়।
এছাড়া দরিদ্র মানুষের হাতে পৌঁছানো অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এই অর্থ দ্রুত বাজারে ফিরে আসে। স্থানীয় দোকানদার, পরিবহন সেবা, কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এর সুফল পায়। ফলে সামাজিক সুরক্ষা কেবল ব্যক্তিগত কল্যাণের বিষয় নয়; এটি স্থানীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমকেও সচল রাখে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীর ক্ষমতায়ন। বিআইএসপি শুরু থেকেই নারীদের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচনা করেছে। এর ফলে লাখো নারী প্রথমবারের মতো জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং বিভিন্ন নাগরিক অধিকারের আওতায় এসেছেন। অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে এই সহায়তা নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও সামাজিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। উন্নয়নের আলোচনায় এই পরিবর্তনের গুরুত্ব প্রায়ই যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
অবশ্যই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ক্ষেত্রে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। কোটি কোটি মানুষের জন্য পরিচালিত যে কোনো বড় কর্মসূচির মতো এখানেও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। তথ্যভান্ডার হালনাগাদ করা, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং অযোগ্য পরিবারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার মতো পদক্ষেপগুলো দেখায় যে ব্যবস্থাটি স্থবির নয়; বরং সময়ের সঙ্গে নিজেকে সংশোধন ও উন্নত করার চেষ্টা করছে।
কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সামাজিক সুরক্ষার অবকাঠামো শুধু নিয়মিত সহায়তার জন্য নয়, জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত কার্যকর। দুর্যোগের সময় কোন পরিবার সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে এবং কীভাবে দ্রুত তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো যাবে, সে সক্ষমতা গড়ে তুলতে বহু বছর সময় লাগে। বিআইএসপি সেই সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
তবে পাকিস্তানের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সামনে এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিভিন্ন ফেডারেল ও প্রাদেশিক কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, ভিন্ন ভিন্ন তথ্যভান্ডার এবং নীতিগত বিচ্ছিন্নতা পুরো ব্যবস্থাকে কম কার্যকর করে তুলেছে। তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত সামাজিক সুরক্ষা থাকবে কি থাকবে না—তা নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত কীভাবে এটিকে আরও সমন্বিত, স্বচ্ছ এবং ফলপ্রসূ করা যায়।
উন্নয়নকে আমরা প্রায়ই দৃশ্যমান অবকাঠামোর মাধ্যমে মাপি। নতুন সড়ক, সেতু কিংবা ভবন সহজেই চোখে পড়ে। কিন্তু একটি শিশুর উন্নত পুষ্টি, একটি মায়ের স্বাস্থ্যসেবা, একটি মেয়ের স্কুলে টিকে থাকা বা একটি দরিদ্র পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা ততটা দৃশ্যমান নয়। অথচ দীর্ঘমেয়াদে এগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য অনেক বেশি।
সামাজিক সুরক্ষার বিতর্কের কেন্দ্রে আসলে উন্নয়নের ধারণা নিয়ে এক মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। যদি উন্নয়নের অর্থ হয় মানুষের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা, তবে সামাজিক সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি এমন একটি বিনিয়োগ, যা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে বহু গুণে ফিরে আসে। পাকিস্তানের জন্য চ্যালেঞ্জ তাই সামাজিক সুরক্ষা কমানো নয়; বরং এটিকে আরও কার্যকর, লক্ষ্যভিত্তিক এবং টেকসই করে তোলা, যাতে মানুষ শুধু দারিদ্র্য থেকে রক্ষা না পায়, বরং সেখান থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসার সুযোগও পায়।
আউন আব্বাস সাহি 


















