বিশ্বব্যবস্থার ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন পুরোনো কাঠামো আর বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। আজ আমরা ঠিক তেমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য এবং উন্নয়নের যে মডেল বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, সেটি এখন ক্রমশ চাপের মুখে পড়ছে। সীমান্ত পেরিয়ে পণ্য, পুঁজি ও ধারণার অবাধ প্রবাহ একসময় বৈশ্বিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি ছিল। কিন্তু সেই আন্তঃসংযুক্ত পৃথিবী আজ আগের মতো নেই।
বর্তমান বিশ্বে বিভাজন কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা এবং এমনকি তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, দক্ষিণ চীন সাগরকে ঘিরে প্রতিযোগিতা কিংবা সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক পরিবেশ আরও অনিশ্চিত ও জটিল হয়ে উঠেছে। সংঘাতের ধরনও বদলেছে। সামরিক শক্তির পাশাপাশি প্রযুক্তি, তথ্য এবং ডিজিটাল অবকাঠামো এখন কৌশলগত প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বহু দেশ এখন বৈশ্বিক সহযোগিতার চেয়ে নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে অনেক দেশ নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে এই পরিস্থিতিকে কেবল সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের সময় নতুন সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে এমন সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা যায়, যা বাস্তববাদী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কার্যকর। পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করে তাদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা এবং নতুন অংশীদারিত্বের পথ খোঁজা এখন জরুরি।
বিশ্বায়নের প্রথম যুগে সহযোগিতার ধারণা ছিল তুলনামূলকভাবে সরল। কিন্তু আজকের বিশ্ব অনেক বেশি জটিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং ডিজিটাল অর্থনীতি—এসব প্রশ্ন জাতীয় সীমানার মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে কেবল রাষ্ট্রভিত্তিক কূটনীতিও আর যথেষ্ট নয়। স্থানীয় নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এই কারণেই নতুন ধরনের বৈশ্বিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। এমন সংলাপ, যেখানে মতাদর্শগত বিভাজনের চেয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা থাকবে। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস দেখায়, স্থায়ী শান্তি কখনও একক শক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; তা গড়ে ওঠে পারস্পরিক নির্ভরতা ও আস্থার ভিত্তিতে।
বর্তমান বিশ্বে আস্থার সংকটই সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমস্যা। দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম নিয়ে মতভেদ বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় প্রয়োজন এমন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং তরুণ প্রজন্ম একসঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে পারে। কারণ আগামী দিনের নেতৃত্বকে আজকের বিভক্ত বিশ্ব উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্বশান্তি ও সমৃদ্ধি কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়। এটি একটি যৌথ প্রকল্প, যার সঙ্গে প্রত্যেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্পর্ক রয়েছে। সহযোগিতার নতুন ধারণা গড়ে তোলা মানে শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন নয়; বরং এমন এক মানসিকতা তৈরি করা, যেখানে ভিন্নতা সত্ত্বেও একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা বজায় থাকে।
আজকের বাস্তবতা যতই কঠিন হোক না কেন, বিকল্প পথ খুব সীমিত। বিচ্ছিন্নতা হয়তো সাময়িক নিরাপত্তার অনুভূতি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা বৈশ্বিক সমস্যাগুলোকে আরও গভীর করবে। বিপরীতে, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া সহযোগিতামূলক কাঠামো বিশ্বকে আরও স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
অতএব, প্রশ্নটি আর সহযোগিতা দরকার কি না—সেটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, পরিবর্তিত বিশ্বের জন্য আমরা কী ধরনের সহযোগিতা গড়ে তুলতে চাই। সেই উত্তর খুঁজে পাওয়ার মধ্যেই আগামী দিনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
কাং জিয়ং-সিক 



















