দুর্নীতি নিয়ে জনআলোচনা যতই বাড়ুক, আমাদের বোঝাপড়া এখনও প্রায়শই একটি সংকীর্ণ ধারণার মধ্যে আটকে থাকে। সাধারণত যখন দুর্নীতির কথা বলা হয়, তখন মানুষের মনে ঘুষ, কমিশন বা সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনাই ভেসে ওঠে। কিন্তু বাস্তবে দুর্নীতির প্রকৃতি এর চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত এবং জটিল। একটি দেশের উন্নয়ন, সুশাসন এবং নাগরিক কল্যাণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো বহু কর্মকাণ্ড রয়েছে, যেগুলো আইনি সংজ্ঞার মধ্যে পুরোপুরি না পড়লেও বাস্তব অর্থে দুর্নীতিরই রূপ।
স্বাধীনতার বহু দশক পরও অনেক উন্নয়নশীল দেশ কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এর পেছনে নীতিগত ভুল, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতার পাশাপাশি দুর্নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করেছে। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই গড়ে তুলতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন বা অপরাধীদের শাস্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রথমে দরকার দুর্নীতিকে তার প্রকৃত ও বিস্তৃত রূপে চিহ্নিত করা।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে দুর্নীতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে, আইনের শাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সামাজিক বৈষম্যকে আরও গভীর করে তোলে। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়; রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও নষ্ট করে। যখন নাগরিকরা দেখতে পান যে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়, তখন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ভেঙে পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের বহুল ব্যবহৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারই দুর্নীতি। সংজ্ঞাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, দুর্নীতির অনেক রূপ এই সীমারেখার বাইরে অবস্থান করে। একজন কর্মকর্তা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তার দায়িত্ব পালন না করেন, অযথা ফাইল আটকে রাখেন, জনসেবা প্রদানে বিলম্ব ঘটান অথবা কাজের প্রতি উদাসীনতা দেখান, তাহলে তার আচরণ সরাসরি ঘুষের সঙ্গে যুক্ত না হলেও জনস্বার্থের ক্ষতি করে। সেই অর্থে এটিও দুর্নীতিরই একটি রূপ।
প্রশাসনের ভেতরে আরেক ধরনের প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে অসৎ কর্মকাণ্ডের কথা জানার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নীরব থাকেন। অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অধস্তনদের অপরাধ আড়াল করেন, প্রমাণ গোপন করতে সহায়তা করেন বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখান। এই নীরবতা দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখে এবং বিস্তার লাভের সুযোগ দেয়। ফলে দুর্নীতিকে কেবল অপরাধীর কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখলে হবে না; যারা সচেতনভাবে তা উপেক্ষা করে, তাদের ভূমিকাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
দুর্নীতি ব্যক্তিগত পর্যায়ে যেমন ঘটে, তেমনি সংঘবদ্ধভাবেও ঘটতে পারে। একজন কর্মকর্তা এককভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন। আবার একটি পুরো প্রশাসনিক কাঠামোও দুর্নীতিগ্রস্ত আচরণে জড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো সেবা পেতে গিয়ে নাগরিক যদি দেখতে পান যে একাধিক কর্মকর্তা একই ধরনের বাধা তৈরি করছেন এবং সুবিধা না পাওয়া পর্যন্ত কাজ এগোচ্ছে না, তাহলে সেখানে ব্যক্তিগত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কাজ করছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কখনও কখনও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে জবাবদিহি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। তদন্ত, বিচার বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যদি নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করেন, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে যায়। এই ধরনের সমষ্টিগত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতা নয়; এটি দুর্নীতির একটি কাঠামোগত রূপ।
সরকারি ও বেসরকারি খাতের সম্পর্কের মধ্যেও দুর্নীতির বহু উদাহরণ দেখা যায়। রাষ্ট্রের ক্রয়প্রক্রিয়া, টেন্ডার বা চুক্তিভিত্তিক কার্যক্রমে বেসরকারি পক্ষ যখন অবৈধ সুবিধা দিয়ে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তখন তা স্পষ্ট দুর্নীতি। তবে সব ক্ষেত্রে অর্থের লেনদেন দৃশ্যমান থাকে না। কখনও দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাব খাটানো কিংবা পদ্ধতিগত ফাঁকফোকর ব্যবহার করেও অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘দুর্নীতির ওপর দুর্নীতি’। অর্থাৎ কোনো দুর্নীতির ঘটনা সম্পর্কে জানার পরও যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে সেই নিষ্ক্রিয়তাও একটি পৃথক দুর্নীতির রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ অপরাধকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এই নীরবতা প্রত্যক্ষ সহায়তা প্রদান করে।
তাই দুর্নীতিবিরোধী আইনকে শুধু অপরাধ শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আইনকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দুর্নীতি ঘটলে শুধু প্রত্যক্ষ অপরাধী নয়, যারা তা জানার পরও ব্যবস্থা নেয়নি, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
অবশ্য আইন প্রয়োগই একমাত্র সমাধান নয়। অনেক দেশে যথেষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও দুর্বল প্রয়োগের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। কোথাও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, কোথাও প্রশাসনিক অদক্ষতা আবার কোথাও আইনের ফাঁকফোকর দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে। ফলে আইন সংস্কারের পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়নও সমান জরুরি।
দুর্নীতিকে সফলভাবে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের প্রথম কাজ হবে এর ধারণাগত পরিসর প্রসারিত করা। ঘুষ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাৎ বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিঃসন্দেহে দুর্নীতির গুরুত্বপূর্ণ রূপ। কিন্তু একই সঙ্গে দায়িত্বহীনতা, ইচ্ছাকৃত বিলম্ব, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং দুর্নীতির প্রতি সচেতন নীরবতাকেও আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অপরাধীদের বিরুদ্ধে নয়; সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও, যে সংস্কৃতি অপরাধকে সহ্য করে, আড়াল করে এবং কখনও কখনও বৈধতার আবরণে টিকিয়ে রাখে।
একটি সমাজ তখনই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নিতে পারে, যখন নাগরিক, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবাই মিলে দুর্নীতির প্রকৃত রূপ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জন করে। দুর্নীতিকে যত বিস্তৃতভাবে বোঝা যাবে, তা নিয়ন্ত্রণ করার পথও তত বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হবে।
ড. টিকিরি নিমাল হেরাথ 



















