মধ্যপ্রাচ্যে ১০৭ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তবে চুক্তির পরবর্তী ধাপ নিয়ে ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধ, অবরোধ প্রত্যাহার এবং জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরই পরমাণু কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হবে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। পরে তিনি বলেন, আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর এবং মাইন অপসারণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, উভয় পক্ষ একটি বিস্তৃত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতার আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।
ইরানের অবস্থান
চুক্তি ঘোষণার পর ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। যুদ্ধের সমাপ্তি, অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের সম্পদ অবমুক্ত হওয়ার পরই ৬০ দিনের একটি আলোচনাপর্ব শুরু হবে।
তিনি জানান, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, চুক্তি ঘোষণার পরও ইরান বাস্তবায়নকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছে।
পরমাণু ইস্যুতে পরবর্তী ধাপ
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের এক কর্মকর্তার মতে, ৬০ দিনের প্রযুক্তিগত আলোচনায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কিছু পরমাণু উপাদান ধ্বংস এবং দেশ থেকে অপসারণের বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।
তবে চুক্তির পূর্ণ শর্তাবলি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে পরমাণু কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে অনেক প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
বিশ্বনেতাদের স্বাগত
চুক্তির ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন বিভিন্ন দেশের নেতারা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, এখন গুরুত্ব দিতে হবে বাস্তবায়নে। তিনি প্রযুক্তিগত আলোচনায় সহায়তারও আশ্বাস দিয়েছেন।
ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ইতালি এক যৌথ বিবৃতিতে চুক্তিটিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা জানিয়েছে, ইরান যদি তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নেয়, তবে সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয় বিবেচনা করা হবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিও আশা প্রকাশ করেছেন যে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও অবাধ নৌ চলাচল দ্রুত নিশ্চিত হবে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সংঘাতের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রভাব পড়ে হরমুজ প্রণালিতে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ এই জলপথের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং বিশ্বব্যাপী পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়।
চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চার শতাংশের বেশি কমে যায়, যা বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়।
তবু সংশয় রয়ে গেছে
চুক্তি নিয়ে আশাবাদ থাকলেও বিশ্লেষকদের একটি অংশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, শর্তাবলি প্রকাশ না হওয়ায় বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, সম্ভাব্য ট্রানজিট ফি, পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং আর্থিক প্রণোদনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে অনেকের মতে, দীর্ঘ সংঘাতের পর একটি অস্পষ্ট সমঝোতাও উত্তেজনা কমানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে।
#ইরান #যুক্তরাষ্ট্র #শান্তি_চুক্তি #হরমুজ_প্রণালি #মধ্যপ্রাচ্য #ডোনাল্ড_ট্রাম্প #শাহবাজ_শরিফ #পরমাণু_কর্মসূচি #বিশ্ব_রাজনীতি #আন্তর্জাতিক_সংবাদ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















