বাংলাদেশের নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এটি কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখার প্রতিফলন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, সেটিও সেই অর্থে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘোষণাপত্র। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শিরোনামের এই বাজেট একদিকে যেমন মানুষের প্রত্যাশাকে ধারণ করার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে
বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্নও উত্থাপন করেছে।
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের সংকট, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা।
এই বাস্তবতায় প্রস্তাবিত বাজেটকে অনেকেই স্বপ্নের বাজেট বলছেন, আবার কেউ কেউ উচ্চাভিলাষী বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। বাস্তবতা হলো,
বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।
বাজেটের আকার: ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট
এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩.৭ শতাংশের সমান।
এই বাজেট ব্যয়ের জন্য সরকারের মোট আয় ধরা হয়েছে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ সরকারের আয়ের মূল ভরকেন্দ্র রাজস্ব আহরণ। মোট আয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশ আসবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর রাজস্ব থেকে।
অন্যদিকে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
এর মধ্যে পরিচালন বা চলতি ব্যয় ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ সরকারের প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ৬৫ টাকা যাবে পরিচালন ব্যয়ে এবং ৩৪ টাকা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে।
এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে, উন্নয়নশীল একটি দেশে যেখানে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে কেন চলতি ব্যয়ের অংশ এত বেশি?
বাজেটের ১০ অগ্রাধিকার: অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি
অর্থমন্ত্রী বাজেটে ১০টি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করেছেন।
এর মধ্যে রয়েছে সবার জন্য উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগনির্ভর কর্মসংস্থান, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা,
তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন।

এ ছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি ও সুনীল অর্থনীতির মতো নতুন ধারণাগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।এ জন্য নানা ধরনের কর ছাড়ও দিয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে নতুনত্বের পরিচয় বহন করে।
কারণ বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রযুক্তি, পরিবেশ ও সৃজনশীল শিল্প আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব নতুন খাতকে বাস্তবে কতটা অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হবে? কেবল বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করলেই এগুলো অর্থনীতির নতুন
চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে না।
রাজস্ব আয়: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য।
অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের জন্য অনুদানসহ মোট আয় ধরেছেন ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়। আবার রাজস্ব আয়ের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্য হচ্ছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
বাজেটে দেখা যাচ্ছে, সরকারের মোট আয়ের ৮৬ দশমিক ১ শতাংশই আসবে এনবিআরের কর রাজস্ব থেকে, করবহির্ভূত অন্যান্য উৎস থেকে আসবে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাজেটের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে সরকার নির্ধারিত কর আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে কি না, তার ওপর।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত কয়েক বছর ধরেই সরকার ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এপ্রিল পর্যন্ত এনবিআর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশ আদায় করতে পেরেছে। সুতরাং প্রশ্ন উঠছে, রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এত বড় লাফ দেওয়া কীভাবে সম্ভব?
করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে টিআইএন, বিআইএন, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রকে সমন্বিত ডেটাবেজে আনার উদ্যোগ নেওয়া
হয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদেরও করের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে। ফলে আগামী অর্থবছরেই বড় ধরনের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি পাওয়া সহজ হবে না।

করনীতিতে স্বস্তি ও বিতর্ক
এবারের বাজেটে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য কিছু স্বস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরের কর কাঠামোর রূপরেখাও ঘোষণা করা হয়েছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০-৩১ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত হবে। নারী, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বেশি রাখা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মধ্যবিত্ত কিছুটা স্বস্তি পাবে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো আগামী পাঁচ বছরের আয়কর-কাঠামো আগেই ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সহজে করতে পারবে।
কিন্তু একই সঙ্গে ৫ শতাংশের প্রাথমিক কর ধাপ বিলুপ্ত করে ১০ শতাংশ করহার চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতও কমানো হয়েছে। ফলে অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যবিত্তের ওপর প্রকৃত করের চাপ বরং বেড়ে যেতে পারে।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক। কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে থাকে। তাদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
প্রতি বছরই বাজেটে করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হয়। কিন্তু করের আওতা তেমন বাড়ে না। এবার অর্থমন্ত্রী যেটি করেছেন, তা হলো করের হার অনেক ক্ষেত্রে কমিয়েছেন, আর বাড়িয়েছেন করের আওতা। এতে করছাড় পেয়েছেন প্রায় সবাই, তবে করের আওতায় বেশি পড়েছেন ছোটরাই। এটি ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য বাজেটের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে।
করের আওতা বাড়াতে খুচরা বিক্রেতাদের কর-ব্যবস্থার আওতায় আনতে পণ্য সরবরাহের সময় ০.২০ শতাংশ অগ্রিম কর কেটে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি এক হাজারে ২ টাকা কর দিতে হবে। হারটি খুবই কম হলেও এর মাধ্যমে খুচরা পর্যায়ের ব্যবসাকে করের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাবের জন্য ব্যবসায় শনাক্তকরণ নম্বর (বিন নিবন্ধন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫০ সিসি বা তার বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও টিআইএন প্রয়োজন হবে। আবার বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, ইউটিলিটি সেবা ও সম্পত্তির তথ্যকে একটি সমন্বিত ডেটাবেজে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সরকার এ থেকে কর ফাঁকি কমাতে পারবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।

সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির উদ্যোগ
সরকার বাজেটকে স্বস্তির বাজেট হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছে। চাল, গম, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনসহ প্রায় ৬০টির বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানো হয়েছে।
কৃষি খাতে সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষিযন্ত্রে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাঋণ কর্মসূচি, প্রবীণদের জন্য ট্রেনে বিনামূল্যে ভ্রমণ সুবিধা, ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য আবগারি শুল্কে ছাড় এবং নারীদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ফ্রিল্যান্সার, স্টার্টআপ, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য উল্লেখযোগ্য কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ তরুণ সমাজ ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) আমদানি ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে। এ খাতে অনেক বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। ইভি চার্জার আমদানিতেও কর কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য করহার বজায় রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে যদি দেশে সৌর বিদ্যুতে বিপ্লব সৃষ্টি করা যায়, তাহলেই বাজেটের একটি বড় লক্ষ্য পূরণ হবে। এতে চাপ কমবে জ্বালানিতে আমদানিতে। আর সারাদেশের মানুষ অন্তত সমানতালে বিদ্যুত সুবিধা পাবে।
বাজেট ঘাটতি: উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু
এই বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশাল ঘাটতি। সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ সরকার প্রতি ১০০ টাকা ব্যয় করবে, কিন্তু আয় করবে মাত্র ৭৪ টাকা। বাকি ২৬ টাকা ঋণ নিয়ে জোগাড় করতে হবে।

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এটি খুব বড় ঘাটতি না হলেও, এর অর্থায়নের কৌশল উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে মূলত দুটি বিষয়ের ওপর।
একটি হচ্ছে, সরকার নির্ধারিত রাজস্ব কতটা আদায় করতে পারবে এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সেই অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করতে পারবে। এই রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে কিংবা বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে চাপ পড়বে ব্যাংক-ব্যবস্থার ওপর। তখন সরকারকে ব্যাংক-ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটাতে হবে। এতে ঋণ পাবে না বেসরকারি খাত। বিনিয়োগও বাড়বে না, মূল্যস্ফীতিও কমবে না।
ঋণনির্ভর বাজেট
ঘাটতি পূরণে সরকার বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ, উভয় উৎস থেকেই ঋণ নেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী: বৈদেশিক ঋণ নেয়া হবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য উৎস: ১৫ হাজার কোটি টাকা।
এখানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা। কারণ চলতি অর্থবছরে যেখানে বৈদেশিক ঋণ এসেছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা, সেখানে আগামী অর্থবছরে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি ঋণ পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
এই ঋণ পেতে হলে উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী সরকার বৈদেশিক ঋণ পাচ্ছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু নতুন অর্থবছরে এর লক্ষ্য হচ্ছে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশি ঋণ বাড়াতে হবে।
সুদের বোঝা বাড়ছে

সরকারের আর্থিক চাপের আরেকটি বড় উৎস হলো ঋণের সুদ। আগামী অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধ করতেই ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেট ব্যয়ের প্রায় ১৩.৬ শতাংশ।
এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি প্রবণতা। কারণ সরকারের আয়ের একটি বড় অংশ উন্নয়ন বা সামাজিক সুরক্ষার পরিবর্তে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়ে হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য: বাস্তবতা নাকি আশাবাদ?
মানুষের জীবনযাপনের ব্যয় কমিয়ে কিছুটা স্বস্তি দিতে সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত
করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৪২ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.১৪ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, ডলারের চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা
অত্যন্ত কঠিন হবে। একইভাবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের গতি না এলে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনও কঠিন।
মূল্যস্ফীতি বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় কারণেই দীর্ঘদিন ধরে অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। প্রকৃত মজুরি না বাড়লেও মূল্যস্ফীতি থেমে নেই, বরং বেড়েই চলেছে।
জীবনযাপনের ব্যয় মিটাতে হিমসিম খাচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষ। এমন সময় এ উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর কথা সবার। কিন্তু বাস্তবে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সবাই ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করছেন এটা কি আদৌ সম্ভব?
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহল মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জন করা সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
বাজেটে প্রতিটি মানুষকে আনার চেষ্টা : অর্থমন্ত্রী
এবারের জাতীয় বাজেটে দেশের প্রতিটি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, সমাজের কোনো শ্রেণি, পেশা, ধর্ম বা গোষ্ঠীকে বাজেটের আওতার বাইরে রাখা হয়নি। সীমিত সম্পদের মধ্যেও সবার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ, বিভিন্ন কর্মসূচি এবং বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ রাখা হয়েছে।

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, এবারের বাজেটের প্রেক্ষাপট অন্যান্য সময়ের তুলনায় ভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষ এমন একটি বাজেট থেকে বঞ্চিত ছিল, যেখানে তাদের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্য নিয়েই সরকার বাজেট প্রণয়ন করেছে। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত গ্রহণ এবং তাদের চাহিদা ও প্রত্যাশাকে বাজেটে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর দেশের মানুষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সরকার পেয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্খা এখন অনেক বেশি। সেই প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্য নিয়েই সরকার বাজেট প্রণয়ন করেছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে সরকারি ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এগুলো হলো- অর্থের যথাযথ ব্যবহার (ভ্যালু ফর মানি), বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাবর্তন (রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট), কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিবেচনা। সরকারের প্রতিটি প্রকল্প ও ব্যয় এই চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। অপচয়ভিত্তিক অর্থনীতি নয়, বরং নীতি-নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই সরকারের লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, বাজেটের লক্ষ্যগুলো আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবায়নের পথ স্পষ্ট নয়। অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের ভাষায়, বাজেট জনগণের প্রত্যাশাকে ধারণ করেছে, কিন্তু সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবায়নযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনায় পুরোপুরি
রূপ দিতে পারেনি। তবে সামগ্রিকভাবে বাজেটটি কিছু ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করলেও এতে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি ও বাস্তবায়নগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। ঘোষণার চেয়ে বাস্তব ফলাফল কতটা আসবে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলছে, চলমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে এই বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করেন, সরকারের পরিকল্পিত ব্যয় বৃদ্ধি যদি উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ না বাড়ায়, তবে তা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে। তার ভাষায়, ‘এটি একটি বড় বাজেট। সরকারি ব্যয় বাড়বে। কিন্তু সেই ব্যয় যদি উৎপাদনশীলতা না বাড়ায়, তাহলে তা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।’
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে
আনা এবং ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য, পাশাপাশি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য, এসবই বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের বাস্তব স্বীকৃতি
দেয়। বিশেষ করে টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি নির্ভরতা এবং জ্বালানি ও সারসহ বৈশ্বিক মূল্যচাপকে বাজেটে স্বীকার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ঠিক করতে এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে পদক্ষেপ থাকতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মুল্যস্ফীতির লক্ষ্যটি উচ্চাভিলাষী বলেই মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ৫ শতাংশের কর ধাপটি বিলুপ্ত করা এবং নির্দিষ্ট বিনিয়োগে কর রেয়াত ৫ শতাংশ কমানোর কারণে মাসিক ৭৪ হাজার বেতনের নাগরিকের করভার সর্বাধিক ৪৯ শতাংশ বাড়বে।
স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারা চালিয়ে নেওয়াই কষ্ট। এ অবস্থায় সরকার যদি এভাবে করভার চাপায়, তাহলে অনেকেই কর দিতে চাইবেন না। দেশে বর্তমানে কর দেওয়া মানুষের চেয়ে করযোগ্য মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার কারণ এটি বলে মনে করেন তিনি।
স্বপ্নের বাজেট, বাস্তবায়নের পরীক্ষা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিঃসন্দেহে একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট। এতে নতুন সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির আকাঙ্খা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বড় স্বপ্ন দেখিয়ে ২০ বছর পর ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। মানুষ তাকিয়ে ছিলেন বাজেটের দিকে। সবার স্বপ্নপূরণে বিশাল বাজেটও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সব পক্ষকে খুশি করতে করের ক্ষেত্রে বিপুল ছাড়ও দিয়েছেন।
এমনকি আগামী পাঁচ বছরে দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চান, সে কথাও বলেছেন। কিন্তু কাজটি কীভাবে হবে, সংশয় এ নিয়েই। স্বপ্নের কথা আছে, সেই স্বপ্নপূরণ কীভাবে হবে, সেই কাঠামো এখনো অস্পষ্ট। তার ওপর বিশ্ব অর্থনীতি এখনো নানা অনিশ্চয়তায় ভরা।
টানা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নানা ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশের মানুষ। বাজেট বড় না ছোট—এতে সাধারণ মানুষের কিছু যায় আসে না। বরং তাঁরা এখন স্বস্তি চান। আর এ জন্য তাঁরা ভরসা করে আছেন নতুন সরকারের ওপর। সবার আশা, সরকার কেবল স্বপ্নের কথাই শোনাবে না, কাজও করবে।
তবে একই সঙ্গে এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাজেটও। এত বড় বাজেটের জন্য অর্থ কোথা থেকে আসবে। অনেক বেশি হারে কর আদায় করতে হবে। এরপরও ঘাটতি থাকবে অনেক। আর এই ঘাটতি মেটাতে আগের বছরের চেয়ে নতুন বছরে দ্বিগুণ ঋণ পেতে হবে। রাজস্ব আহরণের উচ্চ লক্ষ্য, বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বিশাল ব্যাংকঋণ, উচ্চ সুদের বোঝা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কঠিন চ্যালেঞ্জ বাজেট বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ব্যাংক খাত দুরবস্থায়। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে লক্ষ্যাধিক কোটি টাকার ঋণ বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাধা হয়ে দাড়াতে পারে। তারওপর মূল্যস্ফীতি এখনো অনেক বেশি। বেসরকারি বিনিয়োগ আরও কমেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তো আছেই। এই অবস্থার মধ্যদিয়েই অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদকে তার প্রথম বাজেট বাস্তবায়ণ করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরের জন্য বেশ কিছু লক্ষ্যের কথাও বলেছেন।
যেমন জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশ করা, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১১ শতাংশ ও কর-জিডিপি অনুপাত ৯ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশ করা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন
(লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা। এত বড় স্বপ্নপূরণে মহাকর্মযজ্ঞ দরকার। অর্থমন্ত্রী ও সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ এটাই।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই বাজেট আশা জাগিয়েছে, কিন্তু সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক দক্ষতা, কর সংস্কার,
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সর্বোপরি সুশাসন। অন্যথায় এটি কেবল আরেকটি উচ্চাভিলাষী বাজেট হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে। আর যদি সরকার ঘোষিত সংস্কার ও বাস্তবায়নে সফল হয়, তাহলে এই বাজেটই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
আকিব রহমান 



















