মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরান। তেহরান বলছে, ওয়াশিংটন যদি নিজের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সক্ষম না হয়, তাহলে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কোনো অর্থ নেই।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, বৈরুতের উপশহরে হামলার ঘটনা প্রমাণ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র হয় তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার ইচ্ছা হারিয়েছে, নয়তো তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই। এমন পরিস্থিতিতে আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে ধোঁয়াশা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি খুব দ্রুত স্বাক্ষরিত হতে পারে। তিনি আরও বলেছিলেন, চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
তবে ইরান শুরু থেকেই বলে আসছে, যে কোনো সমঝোতার সঙ্গে লেবাননের সংঘাতের বিষয়টিও যুক্ত থাকতে হবে। তেহরানের মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
ইরানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, চুক্তি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো স্বাক্ষরের সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বৈরুত হামলায় উত্তেজনা বৃদ্ধি
ইসরায়েল জানিয়েছে, লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ড্রোন হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
অন্যদিকে লেবাননের জরুরি সেবা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হামলায় অন্তত তিনজন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন। ঘটনাটি সীমান্তজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাফর আসাদি সতর্ক করে বলেছেন, সাম্প্রতিক এই হামলার জবাব দেওয়া হবে এবং বিষয়টি অমীমাংসিত থাকবে না।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতবিরোধ
সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। ইরান স্পষ্ট করেছে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থানের বিরোধিতা করে আসছে। প্রণালিটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও অচলাবস্থা
আলোচনার আরেকটি বড় বাধা ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। ইরান দাবি করছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং পশ্চিমা দেশগুলোর একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছে যে এই কর্মসূচি থেকে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে যে কোনো সমাধান ইরানের ভেতরেই বাস্তবায়ন করতে হবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র চায় এসব উপাদান অপসারণ ও ধ্বংস করা হোক।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথে নতুন চ্যালেঞ্জ
কাতারের একটি প্রতিনিধি দল তেহরানে পৌঁছে আলোচনায় সহায়তার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং বৈরুতে নতুন হামলার কারণে সমঝোতার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি, লেবানন সংঘাত এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি—এই তিনটি ইস্যুতে সমাধান ছাড়া স্থায়ী কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ হবে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















