বিশ্বের ধনী গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জোট জি৭-এর এবারের সম্মেলন শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের চেয়ে মতপার্থক্যই বেশি চোখে পড়ছে। ফ্রান্সের এভিয়ানে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ ও অসন্তোষ নতুন করে সামনে এসেছে।
দুই দশকেরও বেশি সময় আগে ইরাক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একই শহরে জি৭ নেতারা মিলিত হয়েছিলেন। তখনও মতবিরোধ ছিল, তবে জোটের মৌলিক কাঠামো অটুট ছিল। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান সংকট, নিরাপত্তা ইস্যু এবং জলবায়ু নীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সদস্য দেশগুলোর অবস্থান ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
ট্রাম্পকে ঘিরে অনিশ্চয়তা
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর জন্য এবারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ট্রাম্পকে পুরো সম্মেলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে রাজি করানো। অতীতের কয়েকটি জি৭ বৈঠকে ট্রাম্প নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে গিয়েছিলেন।

এ কারণে ম্যাক্রোঁ সম্মেলনের পর ট্রাম্পের জন্য বিশেষ নৈশভোজেরও আয়োজন করেছেন। ফরাসি কর্মকর্তাদের আশা, ব্যক্তিগত কূটনীতি দুই নেতার সম্পর্ককে আরও ইতিবাচক করতে পারে এবং সম্মেলনের কার্যক্রমকে মসৃণ রাখতে সহায়তা করবে।
ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন
ইউরোপের অনেক নেতা এখন আর যুক্তরাষ্ট্রকে আগের মতো নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখছেন না। ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ, উত্তর আটলান্টিক জোট নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনা এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার বক্তব্য ইউরোপে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন এমন একটি অবস্থান নিতে শুরু করেছে, যেখানে তারা প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে, আবার নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রকাশ্যে ভিন্নমতও জানাবে।
ইউক্রেন ও ইরান ইস্যুতে বিভক্ত অবস্থান
ইউক্রেন যুদ্ধ জি৭-এর অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হলেও এ ক্ষেত্রে ঐকমত্যের অভাব স্পষ্ট। ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে সমর্থন অব্যাহত রাখতে আগ্রহী হলেও ট্রাম্প শান্তি আলোচনা নিয়ে আগের মতো সক্রিয় নন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনাও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নতুন বিভাজন তৈরি করেছে। বেশ কয়েকটি দেশ সামরিক পদক্ষেপে সরাসরি জড়াতে অনাগ্রহী। ফলে এই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে।
ইউরোপের মধ্যেও মতভেদ
শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। জার্মানি ও জাপান নিরাপত্তাজনিত কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপের স্বাধীন কৌশলগত সক্ষমতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
যুক্তরাজ্যও সম্প্রতি কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ফলে পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
চীন ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন

সম্মেলনে চীনের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতাও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তবে এ বিষয়েও সদস্য দেশগুলো কী ধরনের যৌথ অবস্থান নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জি৭-এর মূল লক্ষ্য বড় কোনো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়; বরং বিদ্যমান মতপার্থক্যের মধ্যেও সহযোগিতার ন্যূনতম ক্ষেত্রগুলো ধরে রাখা।
বিশ্ব রাজনীতির ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্যে এভিয়ানের এই সম্মেলন তাই শুধু নীতিগত আলোচনার নয়, পশ্চিমা জোটের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















