যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণঘাতী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত ড্রোন এবার পরিণত হয়েছে প্রতিযোগিতা ও বিনোদনের মাধ্যমেও। ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে আয়োজিত এক ব্যতিক্রমী ড্রোন প্রতিযোগিতায় যুদ্ধফেরত সেনারা পরিবার-পরিজন নিয়ে অংশ নেন। শিশুদের খেলাধুলার পার্কে গুঞ্জন তুলতে থাকা ড্রোন আর সামরিক পোশাকে ঘুরে বেড়ানো সেনাদের উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে এক অনন্য রূপ দেয়।
প্রতিযোগিতার রোমাঞ্চকর মুহূর্ত
ড্রোন দৌড়ের এক পর্যায়ে দুটি ড্রোন পাশাপাশি ছুটতে ছুটতে একটি টানেল অতিক্রম করে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়। দর্শকেরা বড় পর্দায় ড্রোনের চোখে দেখা দৃশ্য উপভোগ করছিলেন। হঠাৎ দুটি ড্রোন একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। সবাই যখন ভেবেছিল প্রতিযোগিতা শেষ, তখন ধীরগতিতে আরেকটি ড্রোন সামনে আসে।
এই ড্রোনটির নিয়ন্ত্রণে ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী সার্জেন্ট জাখার কোরোল। যেখানে পাঁচ মিনিটে শেষ হওয়ার কথা ছিল রেস, সেখানে তিনি সতর্কভাবে ১১ মিনিট সময় নিয়ে পুরো পথ অতিক্রম করেন। শেষ পর্যন্ত তিনিই চ্যাম্পিয়ন হন এবং দর্শকদের হাসি ও করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ।

যুদ্ধে ড্রোনের বাড়তে থাকা গুরুত্ব
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বেড়ে যায়। বর্তমানে দেশটি বিভিন্ন ধরনের ড্রোন তৈরি করছে, যার মধ্যে রয়েছে আক্রমণাত্মক ড্রোন, প্রতিরোধকারী ড্রোন, বোমা বহনকারী ড্রোন, জলযান ড্রোন এবং চালকবিহীন স্থলযান।
যুদ্ধক্ষেত্রে এখন ড্রোনের প্রভাব এতটাই বেশি যে উভয় পক্ষের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির পেছনেই এই প্রযুক্তির বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে ড্রোন শুধু সামরিক সরঞ্জাম নয়, ইউক্রেনের জনপ্রিয় সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি ও সেনাদের মধ্যে সেতুবন্ধন
‘ওয়াইল্ড ড্রোনস’ নামে পরিচিত এই আয়োজনে ইউক্রেনের বিভিন্ন ব্রিগেডের ১৯টি দল অংশ নেয়। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন প্রদর্শন করে।

আয়োজকদের মতে, এমন অনুষ্ঠান নির্মাতাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করা ড্রোনচালকদের মতামত শোনার সুযোগ দেয়। এতে ভবিষ্যতের ড্রোন আরও কার্যকর ও উন্নতভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়।
ফ্রন্টলাইন থেকে কিছুটা স্বস্তি
সেনাদের কাছে এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় মূল্য ছিল কিছুটা বিশ্রাম ও স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ। অনেকেই দীর্ঘ সময় যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার পর এখানে এসে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন।
চ্যাম্পিয়ন সার্জেন্ট কোরোলও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা কাটানোর সুযোগ পান। পাশাপাশি তিনি নতুন ধরনের যোগাযোগ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ড্রোন সম্পর্কেও জানতে পারেন, যা দীর্ঘ দূরত্বে কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক।

বিজয়ের স্বপ্নে দিনশেষ
দিনের শেষে সেনারা একসঙ্গে বসে পানীয় হাতে ভবিষ্যৎ বিজয়ের জন্য শুভকামনা জানান। কেউ কেউ হাস্যরসের মাধ্যমে যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতাকে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকার চেষ্টা করেন।
যুদ্ধ এখনো চলছে, কিন্তু এই ড্রোন উৎসব দেখিয়ে দিয়েছে যে কঠিন সময়ের মধ্যেও মানুষ বিনোদন, পরিবার এবং আশার জন্য কিছুটা জায়গা খুঁজে নিতে পারে। ইউক্রেনের জন্য ড্রোন এখন শুধু যুদ্ধের অস্ত্র নয়, সাহস, উদ্ভাবন এবং টিকে থাকার প্রতীকও।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















