শিশুদের পরিবেশ, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ইতিহাস বিষয়ে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা দিতে ব্র্যাকের শিখন তরীর বহরে যুক্ত হয়েছে তিনটি নতুন তরী। এর ফলে ব্র্যাকের শিখন তরীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়টিতে। নদীকে শ্রেণিকক্ষে রূপান্তর করে দেশের দুর্গম নদীভাঙন ও হাওরাঞ্চলের শিশুদের কাছে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সোমবার (১৫ জুন) নারায়ণগঞ্জের কদম রসুল দরগাহ মাঠে নতুন তিনটি শিখন তরীর উদ্বোধন করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য বিশেষভাবে সাজানো হলেও এসব তরীতে অন্যান্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও দর্শনার্থীরাও অংশ নিতে পারবেন।
শেখার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগ
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসিফ সালেহ্ বলেন, শুধু মুখস্থবিদ্যার মাধ্যমে পরীক্ষায় ভালো ফল করা সম্ভব হলেও বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করা যায় না। শিক্ষার্থীদের সামনে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের নানা সমস্যার সমাধানে দক্ষ ও সৃজনশীল মানুষ তৈরি করতে হলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার বিকল্প নেই। শিখন তরীর মাধ্যমে বই, সংবাদ ও ইন্টারনেটে পাওয়া তথ্যকে হাতে-কলমে বোঝার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

শিশুদের কল্পনার নতুন দিগন্ত
ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মাইগ্রেশন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, এসব তরী শুধু শিক্ষার উপকরণ নয়; বরং শিশুদের কল্পনাশক্তি বিকাশের একটি অনন্য ক্ষেত্র। এর মাধ্যমে তারা এমন অনেক বিষয় ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, যা সাধারণত তাদের নাগালের বাইরে থাকে।
ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির হেড অব সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজেস নিভিন রেজা জানান, অনেক শিশুর জন্য এই তরীগুলোই রোবোটিকস, অগমেন্টেড রিয়েলিটি, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান কিংবা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের সুযোগ তৈরি করছে।
নতুন তিন তরীতে কী থাকছে
পরিবেশ তরী জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য, দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, টেকসই জীবনধারা ও পরিবেশগত দায়িত্ববোধ সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করে তুলতে তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ু বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে সাজানো এই ভাসমান শিক্ষাকেন্দ্রে শিশুরা পরিবেশ বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক ধারণা লাভ করতে পারবে।
ডিজিটাল তরীতে শিশুদের জন্য রাখা হয়েছে অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর), ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), রোবোটিকস এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিজিটাল লার্নিং কার্যক্রম। নদীবেষ্টিত অঞ্চলের অনেক শিশু প্রথমবারের মতো এসব প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে।
অন্যদিকে ইতিহাস তরীতে রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, খনন অভিজ্ঞতা, গল্পভিত্তিক প্রদর্শনী, চিত্রভিত্তিক উপস্থাপনা এবং মানচিত্রনির্ভর কার্যক্রম। এসবের মাধ্যমে শিশুরা বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারছে নতুনভাবে।

১৬ জেলায় পৌঁছেছে শিখন তরী
২০১১ সালে বন্যাপ্রবণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে ব্র্যাক শিক্ষাতরী চালু করেছিল। পরবর্তীতে ব্র্যাকের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অবশিষ্ট কয়েকটি নৌকাকে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়। শুরু হয় শিখন তরীর যাত্রা, যেখানে প্রথমে ছিল বিজ্ঞান, গণিত ও মূল্যবোধভিত্তিক তিনটি তরী।
বর্তমানে ভোলা থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত নদীপথে চলমান এই উদ্যোগ ১৬টি জেলার ৭৭টি স্থানে পৌঁছেছে। এখন পর্যন্ত ৭৯ হাজার ১৮৫ জন শিক্ষার্থী এসব তরীর মাধ্যমে শেখার সুযোগ পেয়েছে। পাশাপাশি ৪৬২ জন নারী স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি তরী সাধারণত একটি এলাকায় সাত থেকে ১০ দিন অবস্থান করে এবং প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের সহজে প্রবেশ নিশ্চিত করতে বিশেষ র্যাম্পও সংযোজন করা হয়েছে।
ব্র্যাকের মতে, শিখন তরী কেবল আনন্দময় শিক্ষা নয়; বরং জলবায়ু সংকট, শিক্ষাবৈষম্য, সীমিত অভিজ্ঞতা এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি নতুন উদ্যোগ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নদীকে প্রতিবন্ধকতা নয়, বরং সম্ভাবনার পথ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















