চীনের নিজস্বভাবে তৈরি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ সি৯১৯ বাণিজ্যিক যাত্রা শুরুর তিন বছর পর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। উড়োজাহাজটির বিভিন্ন ইউনিট এখন ধাপে ধাপে কঠোর ‘সি-চেক’ বা পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ পরীক্ষার আওতায় যাচ্ছে। এই পরীক্ষার ফলাফল ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকদের কাছে উড়োজাহাজটির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স মে মাসের শেষে তাদের সি৯১৯ বহরের প্রথম সি-চেক সম্পন্ন করেছে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে প্রায় তিন সপ্তাহ সময় এবং ৬ হাজার কর্মঘণ্টা লেগেছে। পরীক্ষার সময় উড়োজাহাজের বিভিন্ন অংশ আলাদা করে পরীক্ষা করা হয় এবং প্রতিটি উপাদান বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হয়।
বোয়িং-এয়ারবাসের বিকল্প হওয়ার লক্ষ্য
চীনের কমার্শিয়াল এয়ারক্রাফট করপোরেশন অব চায়না (কম্যাক) সি৯১৯ তৈরি করেছে। একক করিডরবিশিষ্ট এই উড়োজাহাজকে বোয়িং ও এয়ারবাসের আধিপত্যের বিকল্প হিসেবে দেখা হয়। এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যিক বিমানবাজারে প্রবেশের মাধ্যমে চীনের প্রযুক্তিগত ও শিল্প সক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সি-চেক কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিমান রক্ষণাবেক্ষণের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘এ, বি, সি ও ডি’ চেক ব্যবস্থার মধ্যে সি-চেক দ্বিতীয় সর্বাধিক জটিল ধাপ। সাধারণত ১৮ থেকে ২৪ মাস পর অথবা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার ঘণ্টা উড্ডয়ন কিংবা নির্দিষ্ট সংখ্যক ফ্লাইট চক্র পূর্ণ হলে এই পরীক্ষা করা হয়।
চায়না সাউদার্ন, চায়না ইস্টার্ন ও এয়ার চায়নার কাছে সরবরাহ করা প্রথম দিকের সি৯১৯ উড়োজাহাজগুলো এখন এই সীমা অতিক্রম করেছে। ফলে সেগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে এই বিস্তৃত পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত তিন বছরের ব্যবহারের পর উড়োজাহাজের একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা। বিভিন্ন যন্ত্রাংশ কতটা ক্ষয় হয়েছে, কোন অংশে উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদনে কী ধরনের পরিবর্তন দরকার হতে পারে—এসব বিষয়ে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায় এই প্রক্রিয়া থেকে।

ইউরোপীয় অনুমোদনের পথে বড় ধাপ
এই পরীক্ষাগুলো এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (ইএএসএ) সি৯১৯-এর নকশা, কর্মক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউরোপের বাজারে প্রবেশের জন্য ইএএসএর অনুমোদন কম্যাকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে এই স্বীকৃতি বড় ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইএএসএ অবশ্যই সি-চেকের ফলাফল ও প্রতিবেদন পর্যালোচনা করতে চাইবে। ইতোমধ্যে চীনের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, কম্যাক এবং বিমান পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো অনুমোদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে আসছে।
তিন বছরের পরিচালনায় ইতিবাচক অভিজ্ঞতা
২০২৩ সালের মে মাসে বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করার পর থেকে সি৯১৯ চীনের ২৩টি শহরে ৫০ লাখের বেশি যাত্রী পরিবহন করেছে বলে জানিয়েছে কম্যাক।
এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে জানা যায়, ইএএসএর পরীক্ষামূলক পাইলটরা সাংহাইয়ে সি৯১৯-এর পরীক্ষামূলক উড্ডয়নও শুরু করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত তিন বছরে বড় কোনো সমস্যা ছাড়াই উড়োজাহাজটির পরিচালনা কম্যাকের জন্য ইতিবাচক বার্তা। যদি সি-চেকে উল্লেখযোগ্য কোনো ত্রুটি ধরা না পড়ে, তাহলে ইউরোপীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সি৯১৯-এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে।
চীনের সি৯১৯ উড়োজাহাজের প্রথম বড় নিরাপত্তা পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় অনুমোদনের পথে এই সি-চেককে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















