বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর নতুন ধরনের ফি আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। যদিও তেহরান বলছে, এটি কোনো ‘টোল’ নয়, বরং নির্দিষ্ট সেবার বিনিময়ে নেওয়া ফি। তবে কী ধরনের সেবা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা দেন যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হবে এবং এটি “স্থায়ীভাবে টোলমুক্ত” থাকবে। কিন্তু তার পরদিনই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, দেশটি ট্রানজিট টোল আরোপ করতে চায় না, তবে প্রদত্ত সেবার বিপরীতে ফি নেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?
সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক আইনে ‘টোল’ এবং ‘সেবা ফি’-এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনো প্রাকৃতিক আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহার করার জন্য সরাসরি টোল আরোপ বৈধ নয়। তবে নির্দিষ্ট সেবা—যেমন বন্দর সুবিধা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—প্রদান করা হলে কিছু ক্ষেত্রে ফি নেওয়া যেতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান বাস্তবে কী ধরনের সেবা দেবে, যার বিনিময়ে এই অর্থ নেওয়া হবে। যুদ্ধের আগে এই পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে কোনো ধরনের ফি দিতে হতো না।
যুদ্ধ-পরবর্তী উত্তেজনা থেকে পরিকল্পনার সূত্রপাত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক হামলা এবং পরবর্তীতে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পর থেকেই বিষয়টি সামনে আসে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাতের পর মার্চে ইরানি কর্মকর্তারা প্রথমবারের মতো প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান।
এরপর মে মাসে ইরান ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠা করে। সংস্থাটি নিরাপদ যাতায়াতের অনুমতিপত্র বা “সেফ প্যাসেজ পারমিট” ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে বলে জানানো হয়। একই সময়ে ইরান ও ওমান জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত অর্থপ্রদানের একটি কাঠামো নিয়েও আলোচনা করে, যা সেবা-ভিত্তিক ফি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আপত্তি
মার্কিন নেভাল ওয়ার কলেজের সামুদ্রিক কৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান জেমস আর. হোমসের মতে, আন্তর্জাতিক আইনে কোনো উপকূলীয় রাষ্ট্রের জন্য প্রাকৃতিক জলপথ ব্যবহার বাবদ অর্থ নেওয়ার সুযোগ নেই, সেটিকে টোল বা ফি—যাই বলা হোক না কেন।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, মালাক্কা প্রণালি বা তাইওয়ান প্রণালি ব্যবহার করতে কোনো অর্থ দিতে হয় না। তবে পানামা খাল বা সুয়েজ খালের মতো কৃত্রিম জলপথের ক্ষেত্রে অবকাঠামো ও পরিচালনাগত সেবার জন্য অর্থ নেওয়া হয়।
হোমসের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালি একটি প্রাকৃতিক জলপথ এবং সেখানে ইরানের সম্ভাব্য সেবার বিষয়টি অস্পষ্ট। কেবল জাহাজে হামলা না করাকে কোনো বৈধ সেবা হিসেবে গণ্য করা যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
ইরানের সম্ভাব্য এই পদক্ষেপ বিশ্বনেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় তার দেশ কাজ করবে এবং হরমুজ প্রণালিতে কোনো টোল বা অনুরূপ অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা চালু হতে না দেওয়ার চেষ্টা করবে।
অন্যদিকে ট্রাম্পও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানি টোলের ধারণার বিরোধিতা করেছেন। মে মাসে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত ও বিনামূল্যে থাকা উচিত। একই অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তার মতে, এমন কোনো অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তা কূটনৈতিক সমঝোতার পথও কঠিন করে তুলবে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন ফি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা শুধু শিপিং ব্যয়ই বাড়াবে না, বরং আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবস্থাপনায় নতুন বিতর্ক ও নজিরও সৃষ্টি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ফি পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক শিপিংয়ে নতুন ব্যয় ও আইনি বিতর্কের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
#হরমুজ_প্রণালি #ইরান #আন্তর্জাতিক_বাণিজ্য #শিপিং #জ্বালানি_বাজার #মধ্যপ্রাচ্য #বিশ্বঅর্থনীতি #ডোনাল্ড_ট্রাম্প #ইমানুয়েল_ম্যাক্রোঁ #গ্লোবাল_ট্রেড
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















