ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ বিরতির পথ খুঁজতে একটি চুক্তিতে আসার জন্য পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৪ দফা “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক” স্বাক্ষর হয়েছে।
‘সমঝোতা স্মারক’ চুক্তির পথে একটি প্রাথমিক ধাপ। সমঝোতা স্মারক হলেই যে চুক্তি অবধি বিষয়টি যাবে এমন ধরে নেওয়া যায় না, তবে সাধারণত চুক্তির পথেই যায়।
কিন্তু ইরান-আমেরিকার মধ্যে এই যুদ্ধ বিরতির সমঝোতার ১৪ দফাই বলে দেয় বিষয়টির মধ্যে একটি দ্রুততা আছে। এই দ্রুততা কি ট্রাম্পের মেজাজের সঙ্গে মিলিয়ে না জি-৭ এ ট্রাম্প যাতে নিজেকে নায়ক হিসেবে দেখাতে পারেন সে জন্য, তা নিয়েও একটা প্রশ্ন উঠতে পারে।
জি-৭ এর পরের দিনে ইরান ও আমেরিকার শান্তি চুক্তি নিয়ে সুইজারল্যান্ডে যে আলোচনার কথা ছিল সেটা হয়নি। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্টও সেখানে যাননি। এমনকি ওই আলোচনা কবে হবে তারও কোনো তারিখ দেওয়া হয়নি।
তাছাড়া বিশ্বের রাজনীতির গতিপ্রকৃতির দিক নির্ণয়ের কাঁটাটি ব্যবসায়ীরা সব সময়েই সাধারণ মানুষের থেকে বেশি বোঝেন। কারণ, তাদের লাভ-ক্ষতির বিষয়টি সাধারণ মানুষের থেকে বেশি থাকে। যে কারণে “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক” সই হবার পরেও তেল কোম্পানি ও জাহাজ ব্যবসায়ীরা সকলেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে বসে আছেন, পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তেল কোম্পানি, জাহাজ ব্যবসায়ী, বীমা কোম্পানি কেউই সমঝোতার আনন্দে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

সমঝোতা স্মারকটি যদিও প্রাথমিক ধাপ, তবে তার ১৪ দফার মধ্যে সব থেকে বড় বিষয়টি অনুচ্ছেদ ৬ এ। সেখানে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের পূর্ণগঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। এবং এর সকল ব্যবস্থা আমেরিকা করবে। এবং সমঝোতা স্মারক যে ৬০ দিনের মধ্যে চুক্তিতে পৌঁছাবে তার ভেতরই আমেরিকা অর্থ ছাড় শুরু করবে। অন্যদিকে অনুচ্ছেদ ১১-তে বলা হচ্ছে, ইরানের যাবতীয় জব্দকৃত অর্থ আমেরিকা সমঝোতা স্মারক কার্যকর হবার সঙ্গে সঙ্গে উন্মুক্ত করে দেবে। এবং ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটা তাদের ইচ্ছে মতোই নিয়ন্ত্রণ করবে।
অর্থাৎ “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক” কার্যকর হবার সঙ্গে সঙ্গেই ইরানের হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে আসবে।
পশ্চিমা মিডিয়া বিশেষ করে আমেরিকার ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া ইসলামাবাদ সমঝোতাকে পরিপূর্ণরূপে ইরানের বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করছে। এবং ট্রাম্প পরাজিত হয়ে ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন এটাই তারা বলতে চাচ্ছেন।
বাস্তবে কোনো যুদ্ধ শুরু করলে কখনই কেউ তার নিজের ইচ্ছে মতো এই যুদ্ধ থেকে বের হতে পারে না। ট্রাম্পের বা আমেরিকার যেমন উপায় নেই এই যুদ্ধ থেকে সহজে বের হয়ে যাওয়া, ইরানেরও তেমনি উপায় নেই।
কারণ, এই যুদ্ধের মোটা দাগে চরিত্র হলো, আমেরিকা যুদ্ধ শুরু করেছিল তার ইচ্ছে মতো একটা “ইরান” তৈরি করতে। যেমন আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক ছোট ছোট দেশের রেজিমচেঞ্জ করে করেছে। এ কাজটি বেশ জটিল কারণ এখানে বিপরীতে শুধু ক্ষমতাসীন সরকার থাকে না জনগণের একটি বড় অংশ যেমন থাকে তেমনি ওই রাষ্ট্র ঘিরে অন্যান্য রাষ্ট্রের স্বার্থগুলোও জড়িত থাকে। তাই স্বাভাবিকই আমেরিকার যুদ্ধের পরিধিটি বড়। কারণ তাকে ইরানের সরকার, জনগণ, এবং তার সঙ্গে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যুদ্ধ করতে হবে।

এর বিপরীতে ইরানের যুদ্ধটা সরল পথে। তার যুদ্ধের মূল লক্ষ্য আক্রমণকারীকে প্রতিহত করে নিজে টিকে থাকা ও তার সঙ্গে স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ কতটা সে যুদ্ধকালীন অবস্থায় রক্ষা করতে পারে সে কাজটি করা। এবং এখানে ইরানের প্রথম অংশই বড়।
যুদ্ধের বাস্তবতা ইরানের প্রথমাংশের সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু বিষয় ইরানের স্বপক্ষে স্পষ্ট করেছে- যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অনেকটা অসাধ্য। যেমন ইরানের ভৌগোলিক অবস্থা যা এশিয়া ইউরোপসহ গোটা বিশ্বেরই কম বেশি জ্বালানি সংকটের কারণ হয়েছে। যদিও ইউরোপ বলছে তার জৈব জ্বালানি থেকে বের হয়ে আসতে শিখছে, দ্রুত তারা সেটা পারবে। কিন্তু বাস্তবতা এই “দ্রুত” রাষ্ট্রের জন্য দ্রুত, ব্যক্তির জীবনে দীর্ঘ সময়। অন্যদিকে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থার সুবিধা ইরান যুদ্ধের ফলে পৃথিবীর সার সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা পশ্চিমা বিশ্বের কৃষি থেকে এশিয়া, আফ্রিকাসহ সকলের কৃষিকেও আঘাত করছে এবং আরো করবে। খাদ্য পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। তাই সমঝোতা স্মারক চুক্তির পথে গেলেও সহজে খাবার প্লেটে খাদ্যমূল্য সুলভ হবে না। এবং দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত দুইকেই ভুগতে হবে।
তাই ইরান যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যেটা পেয়েছে তা পৃথিবীতে এক ধরনের কর্তৃত্ব। কোনো রাষ্ট্র যদি কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে এ কর্তৃত্ব পেয়ে যায় তাহলে তার কতটুকু সে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ছাড় দেবে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। ইরানের কথিত পারমাণবিক শক্তির থেকেও এই শক্তিকেও ছোট করার সুযোগ কম।
এরপরে আসছে, যদি চুক্তির আগে সমঝোতা স্মারকে উল্লিখিত ৬০ দিনের মধ্যে ৩০০ বিলিয়নের একটি বড় অংশ ইরানের হাতে যাবে। এবং চুক্তি যদি সম্পন্ন হয় তাহলে ইরান তার জব্দকৃত অর্থ সবই মুক্ত করতে পারবে।
এই বিপুল অর্থ ও ভৌগোলিক শক্তিতে বলীয়ান (জিওগ্রাফিকাল ব্লেসড) ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে দূরে রেখে যুদ্ধ থেকে আমেরিকা বের হবার পথ পেলেও মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির কী হবে?

ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক কার্যক্রম অবিলম্বে স্থায়ী বন্ধ ঘোষণা করছে। কিন্তু যখন এই স্মারকে সই হয় এবং যখন শেহবাজ শরিফ তা প্রদর্শন করেন তখনও লেবাননের আকাশে বারুদ ছিল। এখনও আছে।
এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর পরই তাৎক্ষণিক পডকাস্টে টিম মার্শাল যে প্রশ্নটি রেখেছেন, এ প্রশ্নটি যারা এ যুদ্ধ নিয়ে আগ্রহী এবং এর গতিপ্রকৃতির অতীত ও বর্তমানের খোঁজ খবর রাখেন তাদের সকলেরই।সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী চুক্তি হলেও ইরান কি হেজবুল্লাহ, হুতি, হামাস এদেরকে সহযোগিতা দেওয়া বন্ধ করবে?
এর পাশাপাশি সমঝোতা স্মারকের দিনে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে, এই সমঝোতা স্মারক সই হবার পর পরই রাশিয়াতে ইউক্রেনের হামলা বেড়েছে, রাশিয়াও পাল্টা হামলা বাড়িয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের হঠাৎ এই গতিপ্রকৃতিও ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ বিরতি চুক্তির একেবারে বাইরে নয়।
এর সঙ্গে সঙ্গে সিরিয়ায় আসাদের পতন ঘটানোর পরে সেখানে আল কায়েদার উত্থান, আফগানিস্তানে ও পাকিস্তানে আল কায়েদা ও হামাস সব মিলে “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক” কী আসলে চুক্তির জন্য কোনো সরল রেখা তৈরি করতে পারবে?
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ও আমেরিকার পররাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঞ্জারের দূতিয়ালিতে চায়না ও আমেরিকার মিলন একটা গেইম চেঞ্জার ল্যান্ড মার্ক হিসেবে পৃথিবীতে চিহ্নিত। তার ফল কী হয়েছে সেটা এই লেখার বিষয় নয়।

কিন্তু এবার ট্রাম্পের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে বেছে নেওয়ার একমাত্র কারণ এ অবধি যা বোঝা যাচ্ছে, ইরানের মূল শক্তির একটি দেশটির মেজরটি শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিম। সংখ্যায় প্রায় ৬৬ থেকে ৭০ মিলিয়ন। শিয়া মুসলিম ঐক্যটি বেশ দৃঢ়, আবার এটা অনেকটা তাদের ভিন্ন ধরনের গর্বের ঐক্য। ইরানের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তর শিয়া সম্প্রদায় পাকিস্তানে– যা ১৭ থেকে ২৪ মিলিয়নের মতো। পাকিস্তানের এই শক্তি ছাড়া ইরানের সঙ্গে অন্য কোনো দিক দিয়ে খুব বেশি দূর এগোনো সম্ভব নয়। এমনকি ভৌগোলিকভাবেও।
কিন্তু যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি যেখানে কোনো মতেই ধর্মের মধ্যে নেই। বরং বিশ্ব জ্বালানি, খাদ্য, নিরাপত্তা এগুলোই সামনে এসেছে। সে ক্ষেত্রে ছোট ও দরিদ্র দেশ হিসেবে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কত দূর যেতে পারবে? তাছাড়া ৭০ এর দশকে পাকিস্তানের আর্মি যেমন ইরানের প্রয়োজন ছিল এখন তাদের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড নিশ্চয়ই আর পাকিস্তান আর্মিকে প্রয়োজনীয় মনে করে না। তাছাড়া এই দুই আর্মির রাজনৈতিক মোটিভেশনও ভিন্ন।
তাই আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ বিরতি চুক্তিতে ইরান বিজয়ী হবে না আমেরিকা বিজয়ী হবে- তার থেকে এখনও বড় প্রশ্ন “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক” কি আসলে চুক্তির প্রথম ধাপ হবে? পৃথিবী কি দ্রুত ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ বিরতি চুক্তি পাবে? মধ্যপ্রাচ্য কি আসলে শান্ত হবে?
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 



















