ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ নতুন করে আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় এলাকায় টানা কয়েক রাতের হামলার পর সাময়িক বিরতি দিলেও ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা এবং কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আপাতত স্থগিত থাকলেও ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা কমেনি। বরং লোহিত সাগর ও কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক নৌপথ, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সৌদি তেল স্থাপনায় হুথিদের হামলা
ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবের জিজান ও ইয়ানবু এলাকায় রাষ্ট্রীয় তেল প্রতিষ্ঠান আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে।
জিজানের একটি তেল শোধনাগার থেকে ব্যাপক ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। ওই স্থাপনায় প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। ইয়ানবুতে তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথাও জানানো হয়েছে।
লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেলবন্দর ইয়ানবু বর্তমানে সৌদি আরবের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালির ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় সৌদি তেল পরিবহনের বিকল্প পথ হিসেবে এই বন্দরটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
আবার জেগে উঠতে পারে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ
হুথিদের হামলার পর সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীও পাল্টা অভিযান চালিয়েছে। মারিব ও আল-জাওফ প্রদেশে হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালানোর খবর পাওয়া গেছে।
দুই পক্ষই বিভিন্ন যুদ্ধফ্রন্টে নিজেদের শক্তি বাড়াচ্ছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এতে ২০২২ সাল থেকে কার্যত স্থবির থাকা ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ আবার বড় আকারে শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সঙ্গে হুথিরা সরাসরি যুক্ত হওয়ায় সেই পুরোনো সংকট নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র কেন হামলা থামাল
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার পেছনে একাধিক উদ্বেগ কাজ করছে বলে জানা গেছে। সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে মার্কিন সামরিক মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কাও রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। তবে ইরান গুরুতর আলোচনায় না এলে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতাও দেখানো হয়েছে বলে তাঁর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানকে ঘিরে তাদের নৌ অবরোধ এখনো কার্যকর রয়েছে। তবে কেন টানা ১৩ রাতের হামলার পর অভিযান থামানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
কাস্পিয়ান সাগরেও নতুন উত্তেজনা
এর মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইউক্রেনের বিরুদ্ধে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ তুলেছে। ইরানের দাবি, কাস্পিয়ান সাগরে ওই হামলায় একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন।
অভিযোগের প্রতিবাদ জানাতে তেহরানে ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত কূটনীতিককে তলব করেছে ইরান। ঘটনাটিকে তেহরান শত্রুতাপূর্ণ ও অপরাধমূলক হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের উপগ্রহ পর্যবেক্ষণের তথ্য ইরানকে সরবরাহ করছে। তাঁর দাবি, এই তথ্য ব্যবহার করে ইরান ওই অঞ্চলে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সুবিধা পাচ্ছে।
হরমুজের পর নতুন নৌপথ নিয়ে উদ্বেগ
ইরানকে ঘিরে সংঘাতের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলোর একটি হলো জ্বালানি পরিবহন। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
এর সঙ্গে যদি লোহিত সাগরেও হামলা বাড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও বড় সমস্যায় পড়তে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের বিকল্প তেল পরিবহনপথে হামলা অব্যাহত থাকলে বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক সামরিক বিরতি যুদ্ধের উত্তেজনা কমানোর বদলে সংঘাতকে নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। লোহিত সাগর থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইরান যুদ্ধ, লোহিত সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরে নতুন উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যপথে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















