০৮:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
হংকংয়ের সাবেক বিরোধী নেতা উ চি-ওয়াইকে যুক্তরাজ্যে ছয় মাস থাকার অনুমতি ২১ বছর বয়সেই সাহিত্যজগতে ঝড় তুলেছিলেন ব্রেট ইস্টন এলিস, ‘লেস দ্যান জিরো’ নিয়ে মুখ খুললেন ত্বকের যত্নে নতুন চমক, একসঙ্গে আর্দ্রতা ও উজ্জ্বলতা দেবে টোনার প্যাড এইডস প্রতিরোধে অর্থসংকট, বিশ্বজুড়ে আবারও এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা চাকরি পেতে যোগ্যতার পাশাপাশি আপনার পোশাক-পরিচ্ছদও কি গুরুত্বপূর্ণ? হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরান-ওমানের তৎপরতা, যুদ্ধের উত্তেজনা কমার আশায় বিশ্ব এসঅ্যান্ডপি’র সতর্কবার্তা: বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ আগুনে ৬ বাংলাদেশির মৃত্যু, আহত আরও একজন ইরান যুদ্ধের ধাক্কাতেও ২০২৮ সালে জেডি ভ্যান্সই কেন এগিয়ে, রুবিওর সম্ভাবনা কতটা যুদ্ধের ক্ষত পেরিয়ে ইরান: শোক, ক্ষোভ আর টিকে থাকার লড়াই

ইবোলা ঠেকাতে সীমান্তে দড়ি, কঙ্গোর পাশের উগান্ডার শহরে নেই নতুন সংক্রমণ

কঙ্গোর সীমান্তঘেঁষা উগান্ডার ছোট শহর বুন্দিবুগিও। একসময় এই শহরেই শনাক্ত হয়েছিল ইবোলার একটি বিরল ধরন, যার নামও রাখা হয় শহরটির নামে। প্রায় দুই দশক পর সেই ভাইরাস আবার ফিরে এসেছে প্রতিবেশী কঙ্গোয়। তবে এবার ভয়াবহ সেই রোগের বিরুদ্ধে প্রস্তুত উগান্ডা। সীমান্তে কড়াকড়ি, জনসচেতনতা আর দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে দেশটিতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে নতুন কোনো ইবোলা রোগী শনাক্ত হয়নি।

সেতুতে শুধু একটি দড়ি, বন্ধ দুই দেশের যাতায়াত

বুন্দিবুগিওর কাছে লামিয়া নদীর ওপর একটি সেতু। কয়েক মাস আগেও এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন দুই দেশের মানুষের অবাধ যাতায়াত ছিল। উগান্ডার কৃষকেরা নদী পেরিয়ে কঙ্গোয় গিয়ে জমিতে কাজ করতেন। আবার কঙ্গোর শিশুরা উগান্ডার বিদ্যালয়ে পড়তে আসত। দুই দেশের সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা ছিল পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু মে মাস থেকে সেই চিত্র বদলে গেছে। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ইবোলার নতুন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর উগান্ডা প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। এখন সেতুর ওপর টানানো একটি পাতলা দড়িই দুই দেশের মানুষের চলাচল থামিয়ে রাখছে।

সীমান্তের উগান্ডা অংশে নিরাপত্তারক্ষী থাকলেও আগের মতো মানুষের ভিড় নেই। নদীর ওপারে কঙ্গোর মানুষ কাপড় ধুচ্ছেন, আর এপারে প্রায় স্বাভাবিকভাবেই চলছে স্থানীয় জীবন।

যে শহরের নামেই ভাইরাসের নাম

বুন্দিবুগিওর মানুষের কাছে ইবোলা নতুন কোনো আতঙ্ক নয়। ২০০৭ সালে এই শহরেই প্রথমবারের মতো ইবোলার একটি অস্বাভাবিক ধরন শনাক্ত হয়। পরে শহরটির নাম অনুসারে ভাইরাসটির নাম দেওয়া হয় বুন্দিবুগিও ইবোলা।

সেই সময় রোগটি শনাক্ত করতে দেরি হয়েছিল। চিকিৎসকেরা শুরুতে বুঝতেই পারেননি যে এটি ইবোলা। স্থানীয় মানুষও রোগটিকে অজানা অসুখ বলে ভাবতেন। পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম না থাকায় চিকিৎসাকর্মীদের অনেকে আক্রান্ত হন এবং কয়েকজন মারা যান।

সেই ভয়াবহ সময়ের স্মৃতি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন স্থানীয় হাসপাতালের নার্স এজেকিয়েল কিসুগু। ২০০৭ সালের অক্টোবরে রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে তিনিও আক্রান্ত হন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে থাকার পর কোনোমতে বেঁচে ফেরেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার তারিখও তিনি এখনো মনে রেখেছেন—৭ ডিসেম্বর ২০০৭।

রোগ থেকে বেঁচে ফিরলেও তখন সামাজিকভাবে তাকে নানা কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ইবোলার ভয় ও কলঙ্কের কারণে অনেকেই তাকে এড়িয়ে চলতেন।

এবার প্রস্তুত উগান্ডা

প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতা উগান্ডার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অনেক বদলে দিয়েছে। সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় দেশটি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত। ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, রোগী শনাক্তকরণ, কোয়ারেন্টিন ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এখন পর্যন্ত উগান্ডায় ২০ জনের ইবোলা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন সীমান্ত পেরিয়ে দেশটিতে এসেছিলেন, বেশির ভাগই চিকিৎসার জন্য। দুজন মারা গেলেও বাকিরা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। অন্যদের পর্যবেক্ষণে রেখে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বুন্দিবুগিওতে চলতি প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত একজনেরও সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি। এক মাসের বেশি সময় ধরে উগান্ডায় নতুন কোনো রোগীও পাওয়া যায়নি।

আতঙ্কের বদলে স্বাভাবিক জীবন

কঙ্গোর ওপারে ইবোলা ছড়িয়ে পড়লেও বুন্দিবুগিওতে জীবন থেমে নেই। বিদ্যালয়, দোকানপাট ও সরকারি দপ্তর খোলা রয়েছে। শহরের সরকারি কার্যালয়ের পাশের মাঠে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ফুটবল খেলাও হচ্ছে।

মানুষজন সাধারণভাবে চলাফেরা করছেন। মুখে মাস্ক পরার দৃশ্যও খুব একটা দেখা যায় না। তবে জনসমাগমস্থল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত মানুষকে ইবোলার লক্ষণ সম্পর্কে জানাচ্ছেন। বিদ্যালয়গুলোতেও শিশুদের হাত পরিষ্কার রাখার নিয়ম শেখানো হচ্ছে। সাবান দিয়ে আঙুলের ফাঁক, নখের নিচ এবং হাতের প্রতিটি অংশ ভালোভাবে ধোয়ার পদ্ধতি দেখানো হচ্ছে।

20 Years After Its Own Outbreak, an Ugandan Town Beats Back Ebola - The New  York Times

সীমান্ত বন্ধের বড় মূল্য দিচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি

রোগ ঠেকাতে সীমান্ত বন্ধ করা গেলেও এর প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবিকা ও ব্যবসায়। বুন্দিবুগিওর অনেক পরিবার সীমান্তের ওপারে ব্যবসা-বাণিজ্য বা কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের আয় কমে গেছে।

এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যালয়গুলোর ওপরও। অনেক অভিভাবক আগের মতো আয় করতে না পারায় সন্তানদের বিদ্যালয়ের বেতন পরিশোধ করতেও সমস্যায় পড়ছেন। ফলে কিছু বিদ্যালয় চালু রাখাই কঠিন হয়ে উঠছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সীমান্ত বন্ধ করা হলেও এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন যে দুই দেশের অর্থনীতি ও চলাচলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, বর্তমান পরিস্থিতি তা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

কোকো চাষ বদলে দিচ্ছে বুন্দিবুগিও

ইবোলার আতঙ্কের পাশাপাশি গত দুই দশকে বুন্দিবুগিওর জীবনযাত্রাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে স্থানীয় মানুষের বড় অংশ জীবিকার জন্য নিজেদের প্রয়োজনের কৃষিকাজ ও বন্যপ্রাণী শিকারের ওপর নির্ভর করতেন। এখন অনেকেই কোকো চাষের দিকে ঝুঁকেছেন।

শহরের চারপাশে এখন বড় বড় পাতার কোকো গাছ ও ফলের দেখা মেলে। কৃষির এই পরিবর্তন মানুষকে ধীরে ধীরে নগদ অর্থনির্ভর জীবনের দিকে নিয়ে গেছে।

স্থানীয়দের মতে, বন্যপ্রাণী খাওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ার পেছনেও এই পরিবর্তনের ভূমিকা থাকতে পারে। আশপাশে দুটি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বন্যপ্রাণী শিকার করাও আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ফলখেকো বাদুড় ইবোলা ভাইরাসের সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বাহক। সেখান থেকে ভাইরাস অন্য প্রাণী এবং পরে মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নদী যতই অগভীর হোক, ঝুঁকি থেকেই যায়

বুন্দিবুগিওর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কঙ্গোর সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ অবস্থান। লামিয়া নদীর অনেক অংশ এতটাই অগভীর যে হেঁটেই পার হওয়া সম্ভব। ফলে সীমান্ত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের আশঙ্কা, কঙ্গোর সঙ্গে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এতটাই গভীর যে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সীমান্তের ওপারে সংক্রমণ থাকলে যেকোনো সময় নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তবে প্রায় দুই দশক আগের অসহায় বুন্দিবুগিও আর এখনকার বুন্দিবুগিও এক নয়। আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রস্তুত। মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বেড়েছে। সীমান্তে একটি সাধারণ দড়ি হয়তো দুই দেশের চলাচল আটকে দিয়েছে, কিন্তু ইবোলার বিরুদ্ধে বুন্দিবুগিওর আসল প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে অভিজ্ঞতা, সতর্কতা ও দ্রুত পদক্ষেপের ওপর।

ইবোলার ভয়াবহ স্মৃতি বুকে নিয়েও তাই শহরটি এখন স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। নদীর ওপারে সংকট থাকলেও এপারে জীবন চালিয়ে যাওয়ার এই লড়াই হয়ে উঠেছে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

ইবোলা ঠেকাতে উগান্ডার সীমান্ত বন্ধ, বুন্দিবুগিওতে নেই নতুন সংক্রমণ—অভিজ্ঞতা ও সচেতনতায় ভাইরাস মোকাবিলায় এগিয়ে দেশটি।

জনপ্রিয় সংবাদ

হংকংয়ের সাবেক বিরোধী নেতা উ চি-ওয়াইকে যুক্তরাজ্যে ছয় মাস থাকার অনুমতি

ইবোলা ঠেকাতে সীমান্তে দড়ি, কঙ্গোর পাশের উগান্ডার শহরে নেই নতুন সংক্রমণ

০৭:৪৭:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

কঙ্গোর সীমান্তঘেঁষা উগান্ডার ছোট শহর বুন্দিবুগিও। একসময় এই শহরেই শনাক্ত হয়েছিল ইবোলার একটি বিরল ধরন, যার নামও রাখা হয় শহরটির নামে। প্রায় দুই দশক পর সেই ভাইরাস আবার ফিরে এসেছে প্রতিবেশী কঙ্গোয়। তবে এবার ভয়াবহ সেই রোগের বিরুদ্ধে প্রস্তুত উগান্ডা। সীমান্তে কড়াকড়ি, জনসচেতনতা আর দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে দেশটিতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে নতুন কোনো ইবোলা রোগী শনাক্ত হয়নি।

সেতুতে শুধু একটি দড়ি, বন্ধ দুই দেশের যাতায়াত

বুন্দিবুগিওর কাছে লামিয়া নদীর ওপর একটি সেতু। কয়েক মাস আগেও এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন দুই দেশের মানুষের অবাধ যাতায়াত ছিল। উগান্ডার কৃষকেরা নদী পেরিয়ে কঙ্গোয় গিয়ে জমিতে কাজ করতেন। আবার কঙ্গোর শিশুরা উগান্ডার বিদ্যালয়ে পড়তে আসত। দুই দেশের সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা ছিল পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু মে মাস থেকে সেই চিত্র বদলে গেছে। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ইবোলার নতুন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর উগান্ডা প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। এখন সেতুর ওপর টানানো একটি পাতলা দড়িই দুই দেশের মানুষের চলাচল থামিয়ে রাখছে।

সীমান্তের উগান্ডা অংশে নিরাপত্তারক্ষী থাকলেও আগের মতো মানুষের ভিড় নেই। নদীর ওপারে কঙ্গোর মানুষ কাপড় ধুচ্ছেন, আর এপারে প্রায় স্বাভাবিকভাবেই চলছে স্থানীয় জীবন।

যে শহরের নামেই ভাইরাসের নাম

বুন্দিবুগিওর মানুষের কাছে ইবোলা নতুন কোনো আতঙ্ক নয়। ২০০৭ সালে এই শহরেই প্রথমবারের মতো ইবোলার একটি অস্বাভাবিক ধরন শনাক্ত হয়। পরে শহরটির নাম অনুসারে ভাইরাসটির নাম দেওয়া হয় বুন্দিবুগিও ইবোলা।

সেই সময় রোগটি শনাক্ত করতে দেরি হয়েছিল। চিকিৎসকেরা শুরুতে বুঝতেই পারেননি যে এটি ইবোলা। স্থানীয় মানুষও রোগটিকে অজানা অসুখ বলে ভাবতেন। পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম না থাকায় চিকিৎসাকর্মীদের অনেকে আক্রান্ত হন এবং কয়েকজন মারা যান।

সেই ভয়াবহ সময়ের স্মৃতি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন স্থানীয় হাসপাতালের নার্স এজেকিয়েল কিসুগু। ২০০৭ সালের অক্টোবরে রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে তিনিও আক্রান্ত হন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে থাকার পর কোনোমতে বেঁচে ফেরেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার তারিখও তিনি এখনো মনে রেখেছেন—৭ ডিসেম্বর ২০০৭।

রোগ থেকে বেঁচে ফিরলেও তখন সামাজিকভাবে তাকে নানা কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ইবোলার ভয় ও কলঙ্কের কারণে অনেকেই তাকে এড়িয়ে চলতেন।

এবার প্রস্তুত উগান্ডা

প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতা উগান্ডার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অনেক বদলে দিয়েছে। সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় দেশটি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত। ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, রোগী শনাক্তকরণ, কোয়ারেন্টিন ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এখন পর্যন্ত উগান্ডায় ২০ জনের ইবোলা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন সীমান্ত পেরিয়ে দেশটিতে এসেছিলেন, বেশির ভাগই চিকিৎসার জন্য। দুজন মারা গেলেও বাকিরা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। অন্যদের পর্যবেক্ষণে রেখে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বুন্দিবুগিওতে চলতি প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত একজনেরও সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি। এক মাসের বেশি সময় ধরে উগান্ডায় নতুন কোনো রোগীও পাওয়া যায়নি।

আতঙ্কের বদলে স্বাভাবিক জীবন

কঙ্গোর ওপারে ইবোলা ছড়িয়ে পড়লেও বুন্দিবুগিওতে জীবন থেমে নেই। বিদ্যালয়, দোকানপাট ও সরকারি দপ্তর খোলা রয়েছে। শহরের সরকারি কার্যালয়ের পাশের মাঠে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ফুটবল খেলাও হচ্ছে।

মানুষজন সাধারণভাবে চলাফেরা করছেন। মুখে মাস্ক পরার দৃশ্যও খুব একটা দেখা যায় না। তবে জনসমাগমস্থল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত মানুষকে ইবোলার লক্ষণ সম্পর্কে জানাচ্ছেন। বিদ্যালয়গুলোতেও শিশুদের হাত পরিষ্কার রাখার নিয়ম শেখানো হচ্ছে। সাবান দিয়ে আঙুলের ফাঁক, নখের নিচ এবং হাতের প্রতিটি অংশ ভালোভাবে ধোয়ার পদ্ধতি দেখানো হচ্ছে।

20 Years After Its Own Outbreak, an Ugandan Town Beats Back Ebola - The New  York Times

সীমান্ত বন্ধের বড় মূল্য দিচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি

রোগ ঠেকাতে সীমান্ত বন্ধ করা গেলেও এর প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবিকা ও ব্যবসায়। বুন্দিবুগিওর অনেক পরিবার সীমান্তের ওপারে ব্যবসা-বাণিজ্য বা কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের আয় কমে গেছে।

এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যালয়গুলোর ওপরও। অনেক অভিভাবক আগের মতো আয় করতে না পারায় সন্তানদের বিদ্যালয়ের বেতন পরিশোধ করতেও সমস্যায় পড়ছেন। ফলে কিছু বিদ্যালয় চালু রাখাই কঠিন হয়ে উঠছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সীমান্ত বন্ধ করা হলেও এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন যে দুই দেশের অর্থনীতি ও চলাচলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, বর্তমান পরিস্থিতি তা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

কোকো চাষ বদলে দিচ্ছে বুন্দিবুগিও

ইবোলার আতঙ্কের পাশাপাশি গত দুই দশকে বুন্দিবুগিওর জীবনযাত্রাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে স্থানীয় মানুষের বড় অংশ জীবিকার জন্য নিজেদের প্রয়োজনের কৃষিকাজ ও বন্যপ্রাণী শিকারের ওপর নির্ভর করতেন। এখন অনেকেই কোকো চাষের দিকে ঝুঁকেছেন।

শহরের চারপাশে এখন বড় বড় পাতার কোকো গাছ ও ফলের দেখা মেলে। কৃষির এই পরিবর্তন মানুষকে ধীরে ধীরে নগদ অর্থনির্ভর জীবনের দিকে নিয়ে গেছে।

স্থানীয়দের মতে, বন্যপ্রাণী খাওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ার পেছনেও এই পরিবর্তনের ভূমিকা থাকতে পারে। আশপাশে দুটি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বন্যপ্রাণী শিকার করাও আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ফলখেকো বাদুড় ইবোলা ভাইরাসের সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বাহক। সেখান থেকে ভাইরাস অন্য প্রাণী এবং পরে মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নদী যতই অগভীর হোক, ঝুঁকি থেকেই যায়

বুন্দিবুগিওর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কঙ্গোর সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ অবস্থান। লামিয়া নদীর অনেক অংশ এতটাই অগভীর যে হেঁটেই পার হওয়া সম্ভব। ফলে সীমান্ত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের আশঙ্কা, কঙ্গোর সঙ্গে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এতটাই গভীর যে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সীমান্তের ওপারে সংক্রমণ থাকলে যেকোনো সময় নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তবে প্রায় দুই দশক আগের অসহায় বুন্দিবুগিও আর এখনকার বুন্দিবুগিও এক নয়। আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রস্তুত। মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বেড়েছে। সীমান্তে একটি সাধারণ দড়ি হয়তো দুই দেশের চলাচল আটকে দিয়েছে, কিন্তু ইবোলার বিরুদ্ধে বুন্দিবুগিওর আসল প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে অভিজ্ঞতা, সতর্কতা ও দ্রুত পদক্ষেপের ওপর।

ইবোলার ভয়াবহ স্মৃতি বুকে নিয়েও তাই শহরটি এখন স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। নদীর ওপারে সংকট থাকলেও এপারে জীবন চালিয়ে যাওয়ার এই লড়াই হয়ে উঠেছে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

ইবোলা ঠেকাতে উগান্ডার সীমান্ত বন্ধ, বুন্দিবুগিওতে নেই নতুন সংক্রমণ—অভিজ্ঞতা ও সচেতনতায় ভাইরাস মোকাবিলায় এগিয়ে দেশটি।