যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে নতুন রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে ডেমোক্র্যাট দল। সেই প্রচেষ্টায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো। জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের প্রার্থী বাছাই—এই তিন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে চাইছেন তিনি।
ক্রো মনে করছেন, ডেমোক্র্যাটদের শুধু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ চালালেই হবে না। জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও দলকে বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ ভোটারের দৈনন্দিন উদ্বেগ—বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির অভিযোগ—নিয়ে রিপাবলিকানদের চাপে রাখতে হবে।
হাউসের নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর পরিকল্পনা
ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন ক্রো। তাঁর লক্ষ্য শুধু প্রচলিত দলীয় রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত প্রার্থী খুঁজে বের করা নয়; বরং এমন ব্যক্তিদের সামনে আনা, যাদের জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক বাহিনী বা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, সামুদ্রিক বাহিনীর প্রশিক্ষক এবং ফেডারেল কৌঁসুলিদের মতো পেশাজীবীদের তিনি সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। তাঁর ধারণা, দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতিই হতাশ ভোটারদের কাছে এমন প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য হতে পারেন।
এই কৌশলের মধ্য দিয়ে ক্রো মূলত ডেমোক্র্যাটদের একটি নতুন ধরনের নির্বাচনী পরিচয় তৈরি করতে চাইছেন—যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে শক্ত অবস্থান এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ, দুটিই একসঙ্গে জায়গা পাবে।
ট্রাম্পের সঙ্গে সংঘাত যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ
ক্রোর রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার জন্য ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরের নভেম্বরে জাতীয় নিরাপত্তার পটভূমি থাকা কয়েকজন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্যের সঙ্গে তিনি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়, বেআইনি আদেশ মানার বাধ্যবাধকতা তাদের নেই।
ভিডিওটি প্রকাশের পর ট্রাম্প এর নির্মাতাদের গ্রেপ্তার ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচারের আহ্বান জানান। এমনকি তাঁদের ফাঁসিতে ঝোলানোর পক্ষে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন তিনি। পরে ওয়াশিংটনের একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার বিচার বিভাগের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে।
এই ঘটনা ক্রোর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করে। সাবেক প্যারাট্রুপার ও সেনা রেঞ্জার হিসেবে তাঁর সামরিক পরিচয় এখন কংগ্রেসে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একই সঙ্গে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাত তাঁকে ডেমোক্র্যাটদের একটি দৃঢ়চেতা কণ্ঠ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রার্থী বাছাইয়ে ‘লড়াকু’ ভাবনা
ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী প্রচেষ্টায় ক্রোর সবচেয়ে বড় প্রভাব হয়তো তাঁর প্রার্থী বাছাইয়ের ভূমিকা। তিনি এমন প্রার্থী চান, যারা কঠিন নির্বাচনী লড়াই থেকে পিছিয়ে যাবেন না এবং দলীয় প্রচারণার বাইরে নিজেদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতাও ভোটারের সামনে তুলে ধরতে পারবেন।
অ্যারিজোনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে রিপাবলিকান প্রার্থী জুয়ান সিসকোমানির বিরুদ্ধে লড়ছেন অবসরপ্রাপ্ত সামুদ্রিক বাহিনীর প্রশিক্ষক জোয়ানা মেন্ডোজা। ক্রো ও ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সংগঠন তাঁর প্রার্থিতাকে শুরু থেকেই সমর্থন দিয়েছে।
ক্রোর হিসাব হলো, এ ধরনের প্রার্থীরা শুধু দলীয় সমর্থকদের নয়, রাজনীতিতে হতাশ এবং দুই দলের প্রতিই বিরক্ত ভোটারদেরও আকৃষ্ট করতে পারেন।
তবে এই কৌশল পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিভিন্ন আসনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে ক্রো এবং ডেমোক্র্যাটদের কেন্দ্রীয় নির্বাচনী সংগঠনের মধ্যে সব সময় একই অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। কোথাও সংগঠন নিরপেক্ষ থেকেছে, কোথাও আবার ক্রোর পছন্দের প্রার্থীর পরিবর্তে অন্য কাউকে সমর্থন করেছে।

২০২৮-এর আগেই দলের ‘হার্ড রিসেট’
ক্রোর দৃষ্টিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ বদলের লড়াই নয়। এটি ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের পরীক্ষাও।
তিনি মনে করেন, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দলকে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তবে সেই পরিবর্তন অতীতের ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত নয়। তাঁর ভাষায়, আমেরিকানরা পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোকে পুনরায় সাজিয়ে দেওয়ার চেয়ে নতুন কিছু দেখতে চায়।
এই বক্তব্যের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সামনে থাকা বড় প্রশ্নটি স্পষ্ট—দল কি শুধু ট্রাম্পবিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে, নাকি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, দুর্নীতি ও নেতৃত্বের প্রশ্নে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করবে?
ক্রোর কর্মকাণ্ড থেকে বোঝা যায়, তিনি দ্বিতীয় পথটির দিকে এগোতে চাইছেন।
হাউস জিতলে বাড়বে ক্রোর প্রভাব
ডেমোক্র্যাটরা যদি মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষরের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়, তাহলে গোয়েন্দা বিষয়ক হাউস কমিটিতে ক্রোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিষয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ তাঁকে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক করে তুলেছে।
এরই মধ্যে তিনি গোয়েন্দা কমিটিতে ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম শীর্ষ সদস্য এবং সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির গোয়েন্দা উপকমিটিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ট্রাম্পের ওপর হামলার ব্যর্থ প্রচেষ্টার তদন্তেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
ফলে হাউসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ডেমোক্র্যাটদের হাতে এলে ক্রোর রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রভাব আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভবিষ্যতের লক্ষ্য আরও বড়
ক্রোর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু প্রতিনিধি পরিষদে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৮ সালে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর নাম আলোচনায় আসতে পারে। কলোরাডোর সিনেট আসন নিয়েও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনাও তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
তবে আপাতত তাঁর প্রধান লক্ষ্য প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরিয়ে আনা। সেই লক্ষ্য পূরণে প্রার্থী বাছাই, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান এবং দলীয় রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি—এই তিন ক্ষেত্রকে তিনি একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছেন।
ক্রোর রাজনৈতিক পথচলার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট: তিনি শুধু নিজে নির্বাচনে জিততে চান না, নিজের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন প্রজন্মের আইনপ্রণেতাও তৈরি করতে চাইছেন। ডেমোক্র্যাটরা যদি হাউসের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিতে পারে, তাহলে সেই নতুন প্রজন্মই হয়তো পরবর্তী কয়েক বছরের মার্কিন রাজনীতিতে ক্রোর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ হয়ে উঠবে।
ক্রোর নিজের ভাষায়, তাঁর মধ্যে স্বাধীনচেতা মনোভাব রয়েছে। কিন্তু তাঁর বর্তমান কর্মকাণ্ড বলছে, সেই স্বাধীনচেতা রাজনীতিকে তিনি এখন একটি বৃহত্তর নির্বাচনী সংগঠন ও নেতৃত্ব তৈরির প্রকল্পে পরিণত করতে চাইছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















