০৭:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
নিখোঁজ রুশ-ইসরায়েলি ইতিহাসবিদকে নিয়ে নীরব ইসরায়েল, মস্কোর জবাব চাওয়া লাওসে চীনের বিরল মাটির খনি প্রকল্পে ধাক্কা, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মুনাফার জোয়ার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের বিনিয়োগ বাড়ছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে শীর্ষে দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সার্ভারে বড় বাজি, তাইওয়ান-ভিয়েতনাম-যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা বাড়াচ্ছে কমপাল অবসরপ্রাপ্ত সামরিক জনবলকে শিক্ষায় কাজে লাগাতে পারে ভারত জাপানে রেকর্ড সংখ্যক ইজাকায়া বন্ধ, বদলে যাচ্ছে পানাহারের সংস্কৃতি এআইয়ের দাপটে ডেটা সেন্টার বীমার বাজার ১০ বিলিয়ন ডলার, বাড়ছে বড় ঝুঁকির আশঙ্কা হেফাজতে তৃণমূল কর্মীর মৃত্যুতে পুলিশের গাফিলতি স্বীকার, পরিবারকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ কাবেরী জলবণ্টন বিরোধে বৃহস্পতিবার তামিলনাড়ুর আবেদন শুনবে সুপ্রিম কোর্ট বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে এক নম্বর শি ইউ ছির মুখোমুখি আয়ুশ, ‘এটা আরেকটি ম্যাচ’

ইরানি বিমান ঠেকানোকে কেন্দ্র করে সৌদি-হুথি সংঘাত ফের উত্তপ্ত

ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অবতরণের আগেই একটি ইরানি বিমান আটকে দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলায় ২০২২ সালে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বৃহত্তর সংঘাতের মধ্যে ইয়েমেন নতুন করে যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করে বলেছেন, ২০২২ সালের এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইয়েমেনে বড় ধরনের সংঘাত আবার শুরু হওয়ার ঝুঁকি এখন সবচেয়ে বেশি। তাঁর আশঙ্কা, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে যুদ্ধবিরতির অর্জনগুলো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেন আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এর পরিণতি দেশটির সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ হতে পারে।

সানা বিমানবন্দর থেকে শুরু

নতুন উত্তেজনার সূত্রপাত ১৩ জুলাই। ওই দিন ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরের রানওয়েতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় একটি ইরানি বিমান অবতরণ করতে পারেনি। বিমানটিতে হুথিদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ছিল।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অনুমতি ছাড়া ইয়েমেনের আকাশসীমায় ওই বিমান পরিচালনা করাকে হুথিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের কাছে এটি ছিল দীর্ঘদিনের যুদ্ধকালীন নিয়ম অমান্য করার ঘটনা।

হুথিরা মনে করেছিল, ইরানের সঙ্গে যুক্ত ওই বিমান চলাচলের মাধ্যমে ইয়েমেনের আকাশসীমার ওপর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে। একই সঙ্গে তারা সৌদি আরবের কাছ থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছিল।

হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর সৌদি অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবিও তারা জোরালো করে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার হুথি প্রতিনিধিদলের জন্য ইরানি বিমান বাদ দিয়ে অন্য একটি বিমানে সানায় যাওয়ার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে হুথিরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

শেষ পর্যন্ত ইরানের বেসরকারি মালিকানাধীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা মাহান এয়ারের বিমানটি সানার উদ্দেশে যাত্রা করে। এরপর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বিমানবন্দরের রানওয়ে অচল করে দেয়। পরে ওমানের মধ্যস্থতায় বিমানটিকে হুথি নিয়ন্ত্রিত হোদেইদায় অবতরণের সুযোগ দেওয়া হয়।

পাল্টা হামলায় উত্তেজনা বাড়ে

সানা বিমানবন্দরে হামলার পর হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আবহা বিমানবন্দরে হামলা চালায়। একই সঙ্গে তারা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে অবরোধের ঘোষণা দেয়।

এরপর সৌদি জাহাজ এবং দেশটির ভেতরের কয়েকটি তেল স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়। এতে আঞ্চলিক উত্তেজনার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতেও নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের হোদেইদা ও লোহিত সাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ কামারানে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের বিভিন্ন সম্মুখসীমায় সরকারি বাহিনীকে শক্তিশালী করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, হুথিদের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

স্থলযুদ্ধের আশঙ্কায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা

সম্ভাব্য স্থল অভিযান ঠেকাতে হুথিরাও পাল্টা প্রস্তুতি শুরু করেছে। তারা মধ্য ও দক্ষিণ ইয়েমেনের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ডজন ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। এসব হামলায় বহু সেনা ও বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

তবে হুথিদের জন্য পরিস্থিতি কেবল বাইরের চাপের নয়। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে জীবনযাত্রার অবনতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ না হলেও শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

ইয়েমেনের গবেষক সালাহ আলি সালাহর মতে, দীর্ঘদিনের ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ পরিস্থিতির কারণে জনগণের প্রত্যাশা বেড়েছে। তারা বাস্তব অর্থনৈতিক উন্নতি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন চায়। ফলে হুথিদের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ছে।

A blocked Iranian flight to Yemen set off Houthis' latest spiral with Saudi  Arabia | News | kdhnews.com

দায় সৌদি অবরোধের ওপর চাপাচ্ছে হুথিরা

হুথিরা নতুন উত্তেজনার দায় সৌদি আরবের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। তাদের বক্তব্য, সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান ও নৌ অবরোধের কারণে হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে।

তারা বর্তমান সংঘাতকে ইরানকে ঘিরে নতুন কোনো যুদ্ধের অংশ হিসেবে না দেখিয়ে ইয়েমেনের পুরোনো যুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরছে।

ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের মার্চে। এর প্রায় ছয় মাস আগে উত্তরাঞ্চলের ঘাঁটি থেকে অগ্রসর হয়ে হুথিরা সানা দখল করেছিল। এতে ইয়েমেন সরকার প্রথমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এবং পরে সৌদি আরবে আশ্রয় নেয়।

দীর্ঘ যুদ্ধ ইয়েমেনকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত করেছে। হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে খাদ্যসংকট ও দারিদ্র্যের চাপ বিশেষভাবে তীব্র।

২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি কি ভেঙে যাবে?

বছরের পর বছর লড়াইয়ের পর ইয়েমেনের যুদ্ধ একসময় অচলাবস্থায় পৌঁছায়। এরপর ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এতে দেশজুড়ে বড় ধরনের সংঘাত অনেকটাই থেমে যায় এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও বন্ধ হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাত পরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে সরে যায়।

যুদ্ধবিরতি ধরে রাখতে ওমানের মধ্যস্থতায় পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছিল। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক আহমেদ নাগির মতে, হুথিদের অগ্রাধিকারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে তারা সরকারি কর্মীদের বেতন পরিশোধসহ আস্থাবর্ধক কিছু পদক্ষেপ আদায়ের দিকে বেশি গুরুত্ব দিত। এখন তারা ইয়েমেনের আকাশসীমা, বন্দর ও জলসীমার ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সংঘাতের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে।

তাঁর মতে, এ অবস্থান বাস্তবায়নে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ায় রাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক ইয়াসমিন আল-ইরিয়ানি মনে করেন, মাহান এয়ারের বিমানকে ঘিরে ঘটনাটি ইরানের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হতে পারে। তাঁর মতে, ইয়েমেনের ফ্রন্ট সক্রিয় করে তেহরান বোঝাতে চাইছে—ইরানের ওপর হামলা হলে তার প্রভাব অন্যত্র, বিশেষ করে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলেও পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে সানা বিমানবন্দরকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনাটি এখন কেবল একটি বিমান অবতরণের বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই। পাল্টাপাল্টি হামলা, সামরিক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার কারণে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। জাতিসংঘ ও ওমানের মধ্যস্থতার উদ্যোগ ব্যর্থ হলে ইয়েমেন আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে—যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে দেশটির সাধারণ মানুষকে।

ইরান-সৌদি উত্তেজনা, হুথি হামলা এবং ইয়েমেনের নতুন সংঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর অস্থিরতাকেও আরও জটিল করে তুলছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

নিখোঁজ রুশ-ইসরায়েলি ইতিহাসবিদকে নিয়ে নীরব ইসরায়েল, মস্কোর জবাব চাওয়া

ইরানি বিমান ঠেকানোকে কেন্দ্র করে সৌদি-হুথি সংঘাত ফের উত্তপ্ত

০৬:০২:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অবতরণের আগেই একটি ইরানি বিমান আটকে দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলায় ২০২২ সালে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বৃহত্তর সংঘাতের মধ্যে ইয়েমেন নতুন করে যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করে বলেছেন, ২০২২ সালের এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইয়েমেনে বড় ধরনের সংঘাত আবার শুরু হওয়ার ঝুঁকি এখন সবচেয়ে বেশি। তাঁর আশঙ্কা, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে যুদ্ধবিরতির অর্জনগুলো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেন আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এর পরিণতি দেশটির সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ হতে পারে।

সানা বিমানবন্দর থেকে শুরু

নতুন উত্তেজনার সূত্রপাত ১৩ জুলাই। ওই দিন ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরের রানওয়েতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় একটি ইরানি বিমান অবতরণ করতে পারেনি। বিমানটিতে হুথিদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ছিল।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অনুমতি ছাড়া ইয়েমেনের আকাশসীমায় ওই বিমান পরিচালনা করাকে হুথিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের কাছে এটি ছিল দীর্ঘদিনের যুদ্ধকালীন নিয়ম অমান্য করার ঘটনা।

হুথিরা মনে করেছিল, ইরানের সঙ্গে যুক্ত ওই বিমান চলাচলের মাধ্যমে ইয়েমেনের আকাশসীমার ওপর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে। একই সঙ্গে তারা সৌদি আরবের কাছ থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছিল।

হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর সৌদি অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবিও তারা জোরালো করে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার হুথি প্রতিনিধিদলের জন্য ইরানি বিমান বাদ দিয়ে অন্য একটি বিমানে সানায় যাওয়ার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে হুথিরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

শেষ পর্যন্ত ইরানের বেসরকারি মালিকানাধীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা মাহান এয়ারের বিমানটি সানার উদ্দেশে যাত্রা করে। এরপর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বিমানবন্দরের রানওয়ে অচল করে দেয়। পরে ওমানের মধ্যস্থতায় বিমানটিকে হুথি নিয়ন্ত্রিত হোদেইদায় অবতরণের সুযোগ দেওয়া হয়।

পাল্টা হামলায় উত্তেজনা বাড়ে

সানা বিমানবন্দরে হামলার পর হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আবহা বিমানবন্দরে হামলা চালায়। একই সঙ্গে তারা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে অবরোধের ঘোষণা দেয়।

এরপর সৌদি জাহাজ এবং দেশটির ভেতরের কয়েকটি তেল স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়। এতে আঞ্চলিক উত্তেজনার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতেও নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের হোদেইদা ও লোহিত সাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ কামারানে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের বিভিন্ন সম্মুখসীমায় সরকারি বাহিনীকে শক্তিশালী করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, হুথিদের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

স্থলযুদ্ধের আশঙ্কায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা

সম্ভাব্য স্থল অভিযান ঠেকাতে হুথিরাও পাল্টা প্রস্তুতি শুরু করেছে। তারা মধ্য ও দক্ষিণ ইয়েমেনের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ডজন ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। এসব হামলায় বহু সেনা ও বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

তবে হুথিদের জন্য পরিস্থিতি কেবল বাইরের চাপের নয়। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে জীবনযাত্রার অবনতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ না হলেও শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

ইয়েমেনের গবেষক সালাহ আলি সালাহর মতে, দীর্ঘদিনের ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ পরিস্থিতির কারণে জনগণের প্রত্যাশা বেড়েছে। তারা বাস্তব অর্থনৈতিক উন্নতি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন চায়। ফলে হুথিদের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ছে।

A blocked Iranian flight to Yemen set off Houthis' latest spiral with Saudi  Arabia | News | kdhnews.com

দায় সৌদি অবরোধের ওপর চাপাচ্ছে হুথিরা

হুথিরা নতুন উত্তেজনার দায় সৌদি আরবের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। তাদের বক্তব্য, সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান ও নৌ অবরোধের কারণে হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে।

তারা বর্তমান সংঘাতকে ইরানকে ঘিরে নতুন কোনো যুদ্ধের অংশ হিসেবে না দেখিয়ে ইয়েমেনের পুরোনো যুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরছে।

ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের মার্চে। এর প্রায় ছয় মাস আগে উত্তরাঞ্চলের ঘাঁটি থেকে অগ্রসর হয়ে হুথিরা সানা দখল করেছিল। এতে ইয়েমেন সরকার প্রথমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এবং পরে সৌদি আরবে আশ্রয় নেয়।

দীর্ঘ যুদ্ধ ইয়েমেনকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত করেছে। হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে খাদ্যসংকট ও দারিদ্র্যের চাপ বিশেষভাবে তীব্র।

২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি কি ভেঙে যাবে?

বছরের পর বছর লড়াইয়ের পর ইয়েমেনের যুদ্ধ একসময় অচলাবস্থায় পৌঁছায়। এরপর ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এতে দেশজুড়ে বড় ধরনের সংঘাত অনেকটাই থেমে যায় এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও বন্ধ হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাত পরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে সরে যায়।

যুদ্ধবিরতি ধরে রাখতে ওমানের মধ্যস্থতায় পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছিল। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক আহমেদ নাগির মতে, হুথিদের অগ্রাধিকারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে তারা সরকারি কর্মীদের বেতন পরিশোধসহ আস্থাবর্ধক কিছু পদক্ষেপ আদায়ের দিকে বেশি গুরুত্ব দিত। এখন তারা ইয়েমেনের আকাশসীমা, বন্দর ও জলসীমার ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সংঘাতের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে।

তাঁর মতে, এ অবস্থান বাস্তবায়নে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ায় রাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক ইয়াসমিন আল-ইরিয়ানি মনে করেন, মাহান এয়ারের বিমানকে ঘিরে ঘটনাটি ইরানের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হতে পারে। তাঁর মতে, ইয়েমেনের ফ্রন্ট সক্রিয় করে তেহরান বোঝাতে চাইছে—ইরানের ওপর হামলা হলে তার প্রভাব অন্যত্র, বিশেষ করে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলেও পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে সানা বিমানবন্দরকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনাটি এখন কেবল একটি বিমান অবতরণের বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই। পাল্টাপাল্টি হামলা, সামরিক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার কারণে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। জাতিসংঘ ও ওমানের মধ্যস্থতার উদ্যোগ ব্যর্থ হলে ইয়েমেন আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে—যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে দেশটির সাধারণ মানুষকে।

ইরান-সৌদি উত্তেজনা, হুথি হামলা এবং ইয়েমেনের নতুন সংঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর অস্থিরতাকেও আরও জটিল করে তুলছে।