সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের সুয়াইদা প্রদেশে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে দখল ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতের আশঙ্কা। দ্রুজ সম্প্রদায়-অধ্যুষিত এই অঞ্চলটি এখনো কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে যায়নি। তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরকারের কর্তৃত্ব সম্প্রসারণের পর সুয়াইদার বাসিন্দাদের মধ্যে আশঙ্কা বেড়েছে—যেকোনো সময় সরকারি বাহিনী প্রদেশটির নিয়ন্ত্রণ নিতে এগিয়ে আসতে পারে।
৬৫ বছর বয়সী দ্রুজ বাসিন্দা সুমায়াহ আল-ইউসুফ বলেন, ‘আমরা জানি তারা আসছে।’ গত বছরের সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হওয়া এই নারী মনে করেন, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত এলাকার ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘটনাই সুয়াইদার জন্য সতর্কবার্তা।
জাতিসংঘের হিসাবে, গত বছরের সহিংসতায় ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই ছিলেন দ্রুজ সম্প্রদায়ের। কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধের পর সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলেও সুয়াইদা এখনো কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্বের বাইরে রয়েছে।
সরকারের প্রতি গভীর অবিশ্বাস
সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব বলছে, পুরো দেশকে একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে আনা জরুরি। তাদের মতে, এতে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কমবে, দেশের স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং সিরিয়ার আরও বিভক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি ঠেকানো যাবে।
কিন্তু সুয়াইদার বহু দ্রুজ বাসিন্দা নতুন সরকারকে বিশ্বাস করেন না। তাদের অভিযোগ, সরকারের নেতৃত্বের সঙ্গে অতীতে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা ছিল এবং সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে অতীতে দ্রুজদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
গত নভেম্বর ও জানুয়ারিতে সুয়াইদা সফর এবং পরবর্তী মাসগুলোতে ফোন ও বার্তার মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানা গেছে। সাধারণ মানুষ, সরকারি কর্মচারী, নিরাপত্তা কর্মকর্তা, চিকিৎসাকর্মী ও ধর্মীয় নেতাদের অনেকেই মনে করেন, কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত সুয়াইদার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে।
গত বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত
সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সুয়াইদা প্রদেশ। পাথুরে পাহাড়, বিস্তীর্ণ অনুর্বর জমি ও ছড়িয়ে থাকা ফলের বাগান নিয়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে দ্রুজ সম্প্রদায়ের বসবাস।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সশস্ত্র বেদুইনদের সঙ্গে দ্রুজ মিলিশিয়াদের সংঘর্ষ শুরু হয়। চারণভূমি, জমি ও পানির অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিভাজন যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি দ্রুত বিস্ফোরক হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সংঘর্ষ অল্প সময়ের মধ্যেই বড় আকারের সহিংসতায় রূপ নেয়। সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্র যোদ্ধারা সুয়াইদার পাহাড়ি এলাকায় প্রবেশ করে। স্বাধীন পর্যবেক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হন, শহর ও গ্রাম ধ্বংস হয় এবং কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
তবে মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু হত্যাকাণ্ডে দ্রুজ যোদ্ধারাও জড়িত ছিলেন। দ্রুজ নেতাদের কেউ কেউ এসব হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের দায় অস্বীকার করেছেন। সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও সে সময় বলেছিল, সামরিক পোশাক পরা একটি ‘অজ্ঞাত গোষ্ঠী’ গুরুতর ও ভয়াবহ লঙ্ঘন করেছে।
হত্যাকাণ্ড তদন্তে গঠিত সরকারি কমিটি মার্চে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সরকারি সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং কিছু মামলা দামেস্কের সামরিক আদালতে পাঠানো হয়েছে।

ইসরায়েলের ভূমিকাও বড় প্রশ্ন
সুয়াইদাকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে প্রতিবেশী ইসরায়েলের অবস্থান। ইসরায়েলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দ্রুজ জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং দেশটির সঙ্গে সিরিয়ার দ্রুজ সম্প্রদায়েরও দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তিনি সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংঘাতে না জড়ানোর কথা বলেছেন।
তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বকে এখনো গভীরভাবে সন্দেহ করেন। তাদের আশঙ্কা, সিরিয়ার সরকারি বাহিনী সীমান্তের কাছে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ালে ভবিষ্যতে ওই অঞ্চল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলার ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে।
গত বছরের সংঘাতের পর ইসরায়েল দামেস্কে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছাকাছি এলাকায় হামলা চালায়। সুয়াইদায় সরকারি বাহিনীর ওপরও বিমান হামলা করে দেশটি। ইসরায়েল তখন সিরিয়ার দ্রুজদের সুরক্ষার অঙ্গীকার করে এবং সুয়াইদাকে সামরিকীকরণমুক্ত রাখার দাবি জানায়।
দ্রুজ ধর্মীয় নেতা শেখ হিকমত আল-হিজরি ইসরায়েলের সমর্থনকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলই প্রথম তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি সিরিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে সুয়াইদার ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে অঞ্চলটির বিচ্ছিন্নতাকেই একমাত্র কার্যকর পথ হিসেবে দেখছেন।
তবে সব দ্রুজ ধর্মীয় নেতা তাঁর মতো কঠোর অবস্থানে নেই। অনেকেই প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতার দাবি জানাননি।
এক বছর পরও অনিশ্চয়তা কাটেনি
২০২৫ সালের জুলাইয়ের সংঘর্ষের পর সিরিয়ার সরকার ও সুয়াইদার দ্রুজ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু এক বছর পরও সেই যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
জলপাই ও পীচবাগানের মাঝখানে মাঝেমধ্যে দুই পক্ষের স্নাইপাররা একে অপরকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একদিকে রয়েছে সুয়াইদায় শেখ আল-হিজরির অনুগত প্রায় ২৮ হাজার সদস্যের ন্যাশনাল গার্ড, অন্যদিকে সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা।
গত বছরের সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত বহু মানুষ এখনো সুয়াইদা শহরের আশ্রয়কেন্দ্রে আটকে আছেন।
তাদের একজন শেখ মারহেজ শাহিন। গত বছর পর্যন্ত কৃষিকাজ, নামাজ ও স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন নিয়েই তাঁর দিন কাটত। কিন্তু সশস্ত্র লোকজন তাঁর আল-থালা গ্রামে ঢুকে পড়ার পর সেই জীবন বদলে যায়।
শাহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা তাঁকে মারধর করে, গোঁফ কেটে দেয় এবং মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়। গুরুতর সেই অভিজ্ঞতার পরও তিনি নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা এই বৃদ্ধের প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তারপরও তাঁর কণ্ঠে হার না মানার দৃঢ়তা। তিনি বলেন, সবকিছুর পরও তারা ভেঙে পড়বেন না।
সুয়াইদার বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি প্রদেশের ক্ষমতার লড়াই নয়। সিরিয়ার নতুন সরকার দেশকে একত্র করার চেষ্টা করছে, দ্রুজ সম্প্রদায় নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর ইসরায়েল সীমান্তের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে সাম্প্রদায়িক ক্ষত, রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও আঞ্চলিক স্বার্থের জটিল সমীকরণে সুয়াইদার ভবিষ্যৎ এখনো গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
সুয়াইদার মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সরকার কি আস্থা তৈরি করে শান্তিপূর্ণভাবে এই অঞ্চলকে দেশের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে, নাকি নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পথেই এগোবে সিরিয়া?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















