০৮:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
জেন-জি রাজনীতির ভাষা বুঝতে পারছে না প্রচলিত দলগুলো? ট্রাম্পের গোপন বিমানযাত্রা: ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য কতটা বাড়ছে গ্রিসের দ্বীপভ্রমণের স্বপ্ন, নাকি ‘বমির ধূমকেতু’? উত্তাল সাগরে পর্যটকদের নাজেহাল দশা অ্যাপলের টেক্সাসে নতুন কারখানা: ম্যাক মিনি উৎপাদন ও কর্মীদের প্রশিক্ষণে বড় বিনিয়োগ ট্রাম্প-মাস্কের ভাঙা সম্পর্ক আবার জোড়া লাগল, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য ১০ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা গ্যাসের সংকটে রূপগঞ্জে থমকে শিল্পের চাকা, বাড়ছে লোকসান ও কর্মসংস্থান নিয়ে শঙ্কা পাম্পে ত্রুটি, বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু: এক মাস আগেই নিরাপত্তা লঙ্ঘনে আইনি ব্যবস্থা হয়েছিল জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের বিরুদ্ধে ২৫০ দিনেরও বেশি সমুদ্রে মার্কিন রণতরী, খাবার-পানি ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ মীর রাজা আলী হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড়, স্মার্টঘড়ির ফরেনসিক নিয়ে পরিবারের আপত্তি

মুসলিম রাজনীতিকদের উত্থানে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষের নতুন ঢেউ

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের প্রভাব যত বাড়ছে, ততই তাদের বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য, অপপ্রচার ও রাজনৈতিক আক্রমণও তীব্র হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে আবদুল রহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদের জয়ের পর রিপাবলিকান নেতাদের একটি অংশ প্রকাশ্যে তাকে ‘সন্ত্রাসী’, ‘চরমপন্থী’ ও ‘আমেরিকাবিরোধী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

গত সপ্তাহে মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে জয় পান এল-সায়েদ। তার জয়ের পর রিপাবলিকান শিবিরের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা তার মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেন, ‘সব জায়গায় জিহাদিরা নির্বাচিত হচ্ছে।’ এর আগে সিনেটর টমি টিউবারভিল এল-সায়েদকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন। প্রতিনিধি ন্যান্সি মেস যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পদে থাকা ‘প্রতিটি মুসলিমকে’ জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রজাতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন।

মুসলিম রাজনীতিকদের উত্থান

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এবং মিশিগানের এল-সায়েদের মতো নেতারা এখন জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছেন।

মুসলিম-আমেরিকানদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে এখন ২৩০ জনের বেশি মুসলিম জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। এর মধ্যে চারজন কংগ্রেস সদস্য, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যা। চলতি শরতে আরও কয়েকজন মুসলিম প্রার্থী প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হতে পারেন।

মিশিগানেও গত সপ্তাহে একাধিক আরব-আমেরিকান প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রাথমিক নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। ফলে অঙ্গরাজ্যটির রাজনীতিতে মুসলিম ও আরব-আমেরিকান ভোটারদের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে বাড়ছে প্রতিক্রিয়াও

মুসলিম নেতাদের রাজনৈতিক অগ্রগতি যেমন দৃশ্যমান হচ্ছে, তেমনি তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও হুমকিও বাড়ছে। মুসলিম অধিকারকর্মীদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের রাজনৈতিক অগ্রগতি অভূতপূর্ব হলেও এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যের মাত্রা আরও বেড়েছে।

এর আগে ইলহান ওমরের মতো মুসলিম কংগ্রেস সদস্যদের নিয়েও ট্রাম্প বারবার আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও একাধিক রিপাবলিকান নেতা মিথ্যাভাবে ‘জিহাদি’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন।

মুসলিম অধিকার সংগঠনের নেতা এডওয়ার্ড আহমেদ মিচেলের মতে, মুসলিম রাজনীতিকদের দৃশ্যমানতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষও বেড়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে এসব নেতার অবস্থানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আক্রমণ আরও তীব্র হয়েছে।

গাজা ইস্যুতে বদলেছে ডেমোক্র্যাটদের রাজনীতি

নতুন প্রজন্মের অনেক মুসলিম ও আরব-আমেরিকান নেতা ফিলিস্তিনিদের অধিকার এবং ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিকে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছেন। তাদের যুক্তি, বিদেশে সামরিক সহায়তার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থ স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সরকারি শিক্ষায় ব্যবহার করা উচিত।

এ অবস্থান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরেও রাজনৈতিক পরিবর্তন আনছে। দলটির কিছু অংশে ইসরায়েলকে সমর্থন করা এখন আগের তুলনায় বেশি বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। আর এই পরিবর্তনকেই রিপাবলিকানরা মুসলিম ও ফিলিস্তিনপন্থী রাজনীতিকদের ‘চরমপন্থী’ হিসেবে তুলে ধরার কাজে ব্যবহার করছে।

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এল-সায়েদকে ‘হামাসের সমর্থক’ বলে অভিযোগ করেছেন। তবে এল-সায়েদ হামাসের নিন্দা করেছেন।

CAIR received an 'unprecedented' 1,283 reports of anti-Arab and  Islamophobic bias in the last month, new data shows | CNN

নাম ও পরিচয়ও হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অস্ত্র

এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রথম দিকের একটি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে উগ্র সিনেট প্রার্থী’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞাপনে তার পুরো নাম—আবদুর রহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদ—বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়।

মিশিগানের রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সও এল-সায়েদের বিরুদ্ধে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্য বলে মনে করার অভিযোগ করেন। এল-সায়েদ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ও মেলানিয়া ট্রাম্পের একটি ছবি এবং এল-সায়েদ ও তার হিজাব পরা স্ত্রীর একটি ছবি পাশাপাশি দিয়ে দুই ধরনের ‘আমেরিকা’র তুলনা করেন। এই ঘটনাকে মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে আলাদা করে দেখানোর আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মিশিগানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন

মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের রাজনৈতিক উত্থানের প্রভাব মিশিগানে সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। দেশটির মধ্যে এই অঙ্গরাজ্যেই আরব-আমেরিকানদের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। ডিয়ারবর্ন শহরে আরব-আমেরিকানরা জনসংখ্যার বড় অংশ।

২০২০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন ডিয়ারবর্নের বিপুল সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের সমর্থনে অনেক মুসলিম ও আরব-আমেরিকান ভোটার হতাশ হয়ে পড়েন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প ডিয়ারবর্নে প্রায় ছয় শতাংশ ব্যবধানে জয় পান। একই সময়ে মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় ডেমোক্র্যাটদের ভোটার উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

ডেমোক্র্যাটিক সংগঠক আব্বাস আলাওয়েহ বলেন, আরব-আমেরিকানরা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতাধর। গত সপ্তাহে তিনি মিশিগানের নতুন করে গঠিত একটি অঙ্গরাজ্য সিনেট আসনের প্রাথমিক নির্বাচনে সহজেই জয় পান।

পরিচয়ের চেয়ে কর্মসূচিকে সামনে রাখতে চান এল-সায়েদ

এল-সায়েদের জয়কে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখা হলেও তিনি নিজে তার মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্র করতে আগ্রহী নন। বরং তিনি রাজনীতিতে সততা ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন।

তার বক্তব্য, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার সম্ভাবনার চেয়ে মিশিগান থেকে পরবর্তী সিনেটর হওয়ার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। নিজের অস্বাভাবিক নামকে রাজনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্য করা হতে পারে—এ কথাও তিনি স্বীকার করেছেন।

তবে তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ হওয়া উচিত যেখানে ভিন্ন নাম বা ধর্মের মানুষও সমানভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন। মানুষ কীভাবে প্রার্থনা করে, তার চেয়ে তারা কীসের জন্য প্রার্থনা করে—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

এল-সায়েদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক শক্তিও দ্রুত বাড়ছে। দেশজুড়ে ২৫ লাখের বেশি মুসলিম ভোটার নিবন্ধিত রয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোতে বসবাস করেন।

মিশিগানের প্রাথমিক নির্বাচনে ডিয়ারবর্নে এল-সায়েদ প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। পাশের ডিয়ারবর্ন হাইটসেও তিনি পেয়েছেন প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট। ফলে তার জয় শুধু একজন মুসলিম প্রার্থীর নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম ও আরব-আমেরিকান ভোটের ক্রমবর্ধমান শক্তিরও একটি বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তবে এই উত্থানের বিপরীতে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা কতটা ভোটে প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত সপ্তাহে মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত রিপাবলিকান প্রতিনিধি অ্যান্ডি ওগলস নিজ দলের প্রাথমিক নির্বাচনে হেরে গেছেন। ফলে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সব সময় নির্বাচনী সাফল্য এনে দেয়—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের প্রভাব এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। একদিকে তারা নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন দরজা খুলছেন, অন্যদিকে তাদের পরিচয়কে কেন্দ্র করে বাড়ছে আক্রমণ ও বিদ্বেষ। এই দ্বন্দ্ব আগামী মার্কিন নির্বাচনের রাজনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণাও বাড়ছে। মিশিগানে এল-সায়েদের জয় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জেন-জি রাজনীতির ভাষা বুঝতে পারছে না প্রচলিত দলগুলো?

মুসলিম রাজনীতিকদের উত্থানে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষের নতুন ঢেউ

০৫:০৬:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের প্রভাব যত বাড়ছে, ততই তাদের বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য, অপপ্রচার ও রাজনৈতিক আক্রমণও তীব্র হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে আবদুল রহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদের জয়ের পর রিপাবলিকান নেতাদের একটি অংশ প্রকাশ্যে তাকে ‘সন্ত্রাসী’, ‘চরমপন্থী’ ও ‘আমেরিকাবিরোধী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

গত সপ্তাহে মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে জয় পান এল-সায়েদ। তার জয়ের পর রিপাবলিকান শিবিরের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা তার মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেন, ‘সব জায়গায় জিহাদিরা নির্বাচিত হচ্ছে।’ এর আগে সিনেটর টমি টিউবারভিল এল-সায়েদকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন। প্রতিনিধি ন্যান্সি মেস যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পদে থাকা ‘প্রতিটি মুসলিমকে’ জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রজাতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন।

মুসলিম রাজনীতিকদের উত্থান

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এবং মিশিগানের এল-সায়েদের মতো নেতারা এখন জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছেন।

মুসলিম-আমেরিকানদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে এখন ২৩০ জনের বেশি মুসলিম জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। এর মধ্যে চারজন কংগ্রেস সদস্য, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যা। চলতি শরতে আরও কয়েকজন মুসলিম প্রার্থী প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হতে পারেন।

মিশিগানেও গত সপ্তাহে একাধিক আরব-আমেরিকান প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রাথমিক নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। ফলে অঙ্গরাজ্যটির রাজনীতিতে মুসলিম ও আরব-আমেরিকান ভোটারদের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে বাড়ছে প্রতিক্রিয়াও

মুসলিম নেতাদের রাজনৈতিক অগ্রগতি যেমন দৃশ্যমান হচ্ছে, তেমনি তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও হুমকিও বাড়ছে। মুসলিম অধিকারকর্মীদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের রাজনৈতিক অগ্রগতি অভূতপূর্ব হলেও এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যের মাত্রা আরও বেড়েছে।

এর আগে ইলহান ওমরের মতো মুসলিম কংগ্রেস সদস্যদের নিয়েও ট্রাম্প বারবার আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও একাধিক রিপাবলিকান নেতা মিথ্যাভাবে ‘জিহাদি’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন।

মুসলিম অধিকার সংগঠনের নেতা এডওয়ার্ড আহমেদ মিচেলের মতে, মুসলিম রাজনীতিকদের দৃশ্যমানতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষও বেড়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে এসব নেতার অবস্থানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আক্রমণ আরও তীব্র হয়েছে।

গাজা ইস্যুতে বদলেছে ডেমোক্র্যাটদের রাজনীতি

নতুন প্রজন্মের অনেক মুসলিম ও আরব-আমেরিকান নেতা ফিলিস্তিনিদের অধিকার এবং ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিকে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছেন। তাদের যুক্তি, বিদেশে সামরিক সহায়তার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থ স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সরকারি শিক্ষায় ব্যবহার করা উচিত।

এ অবস্থান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরেও রাজনৈতিক পরিবর্তন আনছে। দলটির কিছু অংশে ইসরায়েলকে সমর্থন করা এখন আগের তুলনায় বেশি বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। আর এই পরিবর্তনকেই রিপাবলিকানরা মুসলিম ও ফিলিস্তিনপন্থী রাজনীতিকদের ‘চরমপন্থী’ হিসেবে তুলে ধরার কাজে ব্যবহার করছে।

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এল-সায়েদকে ‘হামাসের সমর্থক’ বলে অভিযোগ করেছেন। তবে এল-সায়েদ হামাসের নিন্দা করেছেন।

CAIR received an 'unprecedented' 1,283 reports of anti-Arab and  Islamophobic bias in the last month, new data shows | CNN

নাম ও পরিচয়ও হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অস্ত্র

এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রথম দিকের একটি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে উগ্র সিনেট প্রার্থী’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞাপনে তার পুরো নাম—আবদুর রহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদ—বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়।

মিশিগানের রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সও এল-সায়েদের বিরুদ্ধে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্য বলে মনে করার অভিযোগ করেন। এল-সায়েদ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ও মেলানিয়া ট্রাম্পের একটি ছবি এবং এল-সায়েদ ও তার হিজাব পরা স্ত্রীর একটি ছবি পাশাপাশি দিয়ে দুই ধরনের ‘আমেরিকা’র তুলনা করেন। এই ঘটনাকে মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে আলাদা করে দেখানোর আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মিশিগানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন

মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের রাজনৈতিক উত্থানের প্রভাব মিশিগানে সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। দেশটির মধ্যে এই অঙ্গরাজ্যেই আরব-আমেরিকানদের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। ডিয়ারবর্ন শহরে আরব-আমেরিকানরা জনসংখ্যার বড় অংশ।

২০২০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন ডিয়ারবর্নের বিপুল সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের সমর্থনে অনেক মুসলিম ও আরব-আমেরিকান ভোটার হতাশ হয়ে পড়েন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প ডিয়ারবর্নে প্রায় ছয় শতাংশ ব্যবধানে জয় পান। একই সময়ে মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় ডেমোক্র্যাটদের ভোটার উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

ডেমোক্র্যাটিক সংগঠক আব্বাস আলাওয়েহ বলেন, আরব-আমেরিকানরা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতাধর। গত সপ্তাহে তিনি মিশিগানের নতুন করে গঠিত একটি অঙ্গরাজ্য সিনেট আসনের প্রাথমিক নির্বাচনে সহজেই জয় পান।

পরিচয়ের চেয়ে কর্মসূচিকে সামনে রাখতে চান এল-সায়েদ

এল-সায়েদের জয়কে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখা হলেও তিনি নিজে তার মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্র করতে আগ্রহী নন। বরং তিনি রাজনীতিতে সততা ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন।

তার বক্তব্য, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার সম্ভাবনার চেয়ে মিশিগান থেকে পরবর্তী সিনেটর হওয়ার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। নিজের অস্বাভাবিক নামকে রাজনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্য করা হতে পারে—এ কথাও তিনি স্বীকার করেছেন।

তবে তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ হওয়া উচিত যেখানে ভিন্ন নাম বা ধর্মের মানুষও সমানভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন। মানুষ কীভাবে প্রার্থনা করে, তার চেয়ে তারা কীসের জন্য প্রার্থনা করে—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

এল-সায়েদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক শক্তিও দ্রুত বাড়ছে। দেশজুড়ে ২৫ লাখের বেশি মুসলিম ভোটার নিবন্ধিত রয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোতে বসবাস করেন।

মিশিগানের প্রাথমিক নির্বাচনে ডিয়ারবর্নে এল-সায়েদ প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। পাশের ডিয়ারবর্ন হাইটসেও তিনি পেয়েছেন প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট। ফলে তার জয় শুধু একজন মুসলিম প্রার্থীর নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম ও আরব-আমেরিকান ভোটের ক্রমবর্ধমান শক্তিরও একটি বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তবে এই উত্থানের বিপরীতে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা কতটা ভোটে প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত সপ্তাহে মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত রিপাবলিকান প্রতিনিধি অ্যান্ডি ওগলস নিজ দলের প্রাথমিক নির্বাচনে হেরে গেছেন। ফলে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সব সময় নির্বাচনী সাফল্য এনে দেয়—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের প্রভাব এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। একদিকে তারা নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন দরজা খুলছেন, অন্যদিকে তাদের পরিচয়কে কেন্দ্র করে বাড়ছে আক্রমণ ও বিদ্বেষ। এই দ্বন্দ্ব আগামী মার্কিন নির্বাচনের রাজনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণাও বাড়ছে। মিশিগানে এল-সায়েদের জয় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।