আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির হিসাব শুধু সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য কিংবা কূটনৈতিক জোট দিয়ে হয় না। মানুষের মন কে কতটা প্রভাবিত করতে পারছে, কোন দেশের বক্তব্য বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে কতটা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করছে—সেটিও এখন প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা তাই ক্রমেই তথ্য, যোগাযোগ ও জনমত গঠনের লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে।
৩০ জুলাই স্থানীয় সময়, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থা ইউএসএজিএমের প্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোনীত সারাহ বি. রজার্স সিনেটের অনুমোদন শুনানিতে অংশ নেন। চীনের তথাকথিত ‘মিডিয়া চ্যালেঞ্জ’ মোকাবিলার উপায় জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, বেইজিং বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার প্রচার ও প্রভাব বিস্তারমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করে। এর পাল্টা হিসেবে তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও, পডকাস্ট এবং বিদেশে বসবাসরত বিভিন্ন প্রবাসী জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে ইউএসএজিএমের প্রভাব পুনর্গঠনের কথা বলেন। তিন দিন পর সিনেট তার নিয়োগ অনুমোদন করে।
এই ঘটনা আসলে বৃহত্তর একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে নিজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বয়ান প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু সেই প্রভাব এখন আগের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
বিশ্বের চোখে বদলে যাচ্ছে দুই দেশের অবস্থান
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো সেই পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি তুলে ধরেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ১৫ জুলাই প্রকাশিত ৩৬টি দেশ ও অঞ্চলের ৪২ হাজার ১৫১ জনের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, ২৭টি দেশে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি। তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশও রয়েছে।
জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মধ্যম মানের ইতিবাচক মনোভাব ৫৮ শতাংশ থেকে নেমে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬ শতাংশ হয়েছে। ২০০২ সাল থেকে পিউ যখন ধারাবাহিকভাবে দুই দেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি পরিমাপ করছে, তখন থেকে এমন উল্টো চিত্র আগে দেখা যায়নি।
গ্যালাপের ২০২৫ সালের ‘রেটিং ওয়ার্ল্ড লিডার্স’ জরিপেও একই প্রবণতা ধরা পড়ে। সেখানে বৈশ্বিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে চীনের অনুমোদন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যায়। চীনের পক্ষে ৩৬ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ৩১ শতাংশ সমর্থন পাওয়া যায়—প্রায় দুই দশকের জরিপ ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় ব্যবধান।
প্রশ্ন তাই শুধু চীনের যোগাযোগ কৌশল কতটা কার্যকর, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কেন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব বয়ান আগের মতো গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে পারছে না?
প্রচারের পরিধি বাড়ালেই কি আস্থা ফেরে?
ওয়াশিংটন যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন, তার আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় মার্কিন কূটনৈতিক তৎপরতায়। ৩০ মার্চ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্বাক্ষরিত একটি কূটনৈতিক নির্দেশনার বিষয় প্রকাশ্যে আসে, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোকে সমন্বিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী জনমত জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এর মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, শিক্ষাবিদ ও কমিউনিটি নেতাদের কাজে লাগানো, মার্কিন অর্থায়নে তৈরি বিষয়বস্তুকে স্বতঃস্ফূর্ত জনসম্পৃক্ততার মতো উপস্থাপন করা এবং সামরিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনাকারী ইউনিটগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মতো বিষয়ও ছিল। বিশ্বের শত শত মার্কিন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকেও তথ্য প্রচারের আরও সক্রিয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
এসব উদ্যোগ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: জনমত এখন আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্রীয় সম্পদ। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রচারের পরিমাণ বাড়ানো যায়, নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়; কিন্তু মানুষের আস্থা কেবল প্রচার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্জন করা যায় না।
একটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শেষ পর্যন্ত তার কাজের ওপরই দাঁড়ায়। সে দেশ অন্যদের সম্পর্কে কী বলছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে নিজে কী করছে এবং তার ঘোষিত মূল্যবোধ ও বাস্তব আচরণের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে।
নিজেকে উজ্জ্বল করতে অন্যকে অন্ধকার দেখানোর কৌশল
চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং বিশ্ববাসীর সামনে নিজের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রেরও একই কাজ করার অধিকার রয়েছে। প্রতিটি দেশই নিজের নীতি, সাফল্য ও দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চাইবে—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু প্রতিযোগিতার আসল প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। একটি দেশ কি প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল দেখিয়ে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করবে, নাকি নিজের অর্থনীতি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও পররাষ্ট্রনীতিকে এমনভাবে উন্নত করবে যাতে অন্যরা স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়?
স্বল্পমেয়াদে আক্রমণাত্মক প্রচারণা হয়তো সংবাদচক্রে প্রভাব ফেলতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বয়ান দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেও পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় ধারাবাহিক নীতি, বাস্তব ফলাফল এবং বিশ্বাসযোগ্য আচরণ থেকে।
এ কারণেই চীনের একটি প্রাচীন প্রবাদ এখানে প্রাসঙ্গিক: গাছ নিজে নিজের প্রশংসা করে না; তার ফুল ও ফলই মানুষকে কাছে টানে, আর মানুষের চলাচলেই পথ তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও একই যুক্তি কাজ করে। একটি দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী গল্প হতে পারে তার বাস্তব অর্জন। অন্যকে ছোট করার জন্য যত বেশি শক্তি ব্যয় করা হয়, নিজের ভিত শক্ত করার জন্য তত কম শক্তি অবশিষ্ট থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তাই মূল চ্যালেঞ্জ কেবল ইউএসএজিএমকে নতুন প্রযুক্তি, পডকাস্ট বা স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো—বিশ্ব কেন আবার যুক্তরাষ্ট্রের কথায় আস্থা রাখবে?
এর উত্তর প্রচারের ভাষায় নয়, কাজের মধ্যেই খুঁজতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রভাব কোনো বিজ্ঞাপন প্রচারণার স্থায়ী ফল নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে অর্জিত বিশ্বাসের ফসল। আর সেই বিশ্বাস অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো অন্যের গল্প বদলানোর চেষ্টা না করে নিজের গল্পটিকে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা।
লি শিয়াওইয়াং 



















