আজ ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য হত্যাকাণ্ডের ৫১তম বার্ষিকী। তবে এবারও দিনটি ঘিরে নেই কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর টানা তৃতীয় বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে দিনটি পালনের কোনো আয়োজন দেখা যাচ্ছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেদিন তাঁর পরিবারের ১৮ সদস্যও নিহত হন।
নেই সরকারি আয়োজন
শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোতে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। তবে ২০২৪ সালের অন্তর্বর্তী সরকার ১৫ আগস্টের সরকারি ছুটি বাতিল করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণেও এবার দলটির পক্ষ থেকে বড় কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে না। ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ এবং দলটির সহযোগী ও সমমনা সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির নেতাকর্মীদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার কথা বলা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তাঁর সরকারের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে মূল্যায়নের আলোচনা সামনে এসেছে।
পরিবারের ১৮ সদস্য নিহত
১৯৭৫ সালের সেই হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব, তিন ছেলে ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল ও শেখ রাসেল এবং দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল নিহত হন।
এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর স্ত্রী আরজু মনি এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।
বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ওই আন্দোলনে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও শত শত মামলা রয়েছে।
বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। তবে এখন পর্যন্ত ভারত সে বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
ঢাকায় বাড়তি নিরাপত্তা
১৫ আগস্টকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানী ঢাকায় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। প্রবেশপথগুলোতে চেকপোস্ট ও তল্লাশি জোরদার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। গোয়েন্দা শাখা এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটও দায়িত্ব পালন করছে।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনসমাগমের স্থানগুলোতে সোয়াট, বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ও প্রশিক্ষিত কুকুরের ইউনিট দিয়ে নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো হচ্ছে। সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। মেট্রোরেল স্টেশন, বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, রেলস্টেশন, শপিংমল ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থলেও অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৫ মিনিটের দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৫৩ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) নিয়াজ মেহেদী জানান, ১৫ আগস্ট উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা ও ফ্ল্যাশ মিছিল আয়োজনের জন্য তারা সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।
হাসিনার ফেরার ঘোষণা ঘিরে বাড়তি সংবেদনশীলতা
শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনাও এবারের ১৫ আগস্টকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেছেন, দলীয় নেতাদের সঙ্গে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে পারেন।
বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান প্রত্যর্পণ ব্যবস্থার আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতকে বারবার অনুরোধ করেছে। তবে এখনো নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া আসেনি।
বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই ১৫ আগস্ট এবারও এসেছে রাষ্ট্রীয় আয়োজনের বাইরে, তবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়ের স্মৃতি এবং তা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা এখনো দিনটিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষভাবে সংবেদনশীল করে রেখেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















