এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন একক কোনো সংকটকে আলাদা করে বোঝা কঠিন হয়ে উঠেছে। চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য উত্তেজনা, ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার—সবগুলো প্রবাহ একই সময়ে ব্যবসা ও অর্থনীতিকে নতুন করে সাজতে বাধ্য করছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য এর অর্থ আরও জটিল। উৎপাদনব্যবস্থা বদলাচ্ছে, সরবরাহ শৃঙ্খল নতুন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক ঝুঁকি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সামনে প্রশ্নটি এখন শুধু প্রবৃদ্ধি কত হবে তা নয়; বরং পরবর্তী ধাক্কা এলে তারা কত দ্রুত সামলে উঠতে পারবে।
জ্বালানি সংকটের শিক্ষা
হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এই দুর্বলতাকে সবচেয়ে স্পষ্ট করে তুলেছে। অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল ও সার সরবরাহে বাধা শুধু জ্বালানি বাজারকেই প্রভাবিত করে না; এর প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন, কৃষি এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও।
শুরুতে আশঙ্কা ছিল, এই পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিকে জ্বালানি সংকট, খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি, শিল্পে কাঁচামালের সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশঙ্কার তুলনায় এখন পর্যন্ত কিছুটা নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। বাজারের প্রতিক্রিয়া, সরকারি হস্তক্ষেপ এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছে।

চীনের কম খরচের জ্বালানি প্রযুক্তির বিস্তার এবং দেশটির তেল ব্যবহারের তুলনামূলক হ্রাসও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের মজুত থেকে জ্বালানি সরবরাহ, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার শোধনাগারে বিকল্প কাঁচামাল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি রপ্তানি এশিয়ার বাজারকে আগের বড় তেল সংকটগুলোর তুলনায় বেশি স্থিতিস্থাপকতা দিয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ঝুঁকি কেটে গেছে। আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়েছে, জ্বালানি ভর্তুকি নীতির পুনর্মূল্যায়ন চলছে এবং কার্বনের দাম বাড়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো নির্গমন কমানোর দিকে আরও জোর দিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মন্দা না এলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: আসিয়ানকে জ্বালানি নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও প্রযুক্তি বিনিয়োগের বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।
একটি সংযুক্ত জ্বালানি ব্যবস্থা
এই প্রয়োজন থেকেই আসিয়ান পাওয়ার গ্রিডের মতো উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়ছে। ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মধ্যে গ্যাস অবকাঠামো সংযোগ, লাওস-থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া-সিঙ্
ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো একটি দেশের নিজস্ব উৎপাদনক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। বরং প্রয়োজন হবে একাধিক উৎস, আন্তঃদেশীয় সংযোগ এবং এমন প্রযুক্তি, যা সংকটের সময় সরবরাহ দ্রুত পুনর্বিন্যাস করতে পারে।
এআইয়ের দ্বিতীয় ধাক্কা
জ্বালানি সংকটের সঙ্গে একই সময়ে আসিয়ানকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে আরেক ধরনের পরিবর্তনের—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরক অগ্রগতি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ডেটা সেন্টার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আগের শিল্প বিপ্লবগুলোর মতো নয়। এআই মডেলগুলো এত দ্রুত উন্নত হচ্ছে যে আজকের অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত কয়েক বছরের মধ্যেই অপ্রতুল হয়ে যেতে পারে।
এআই কি প্রত্যাশিত মাত্রায় উৎপাদনশীলতা বাড়াবে? শিল্প, সরকার ও সাধারণ মানুষ কীভাবে এর ব্যবহার বদলে দেবে? কোন নতুন পণ্য ও সেবা তৈরি হবে? একই সঙ্গে অফিসভিত্তিক চাকরির যে অংশ ইতোমধ্যে প্রযুক্তির চাপে পড়ছে, সরকারগুলো সেটি কীভাবে সামলাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা কম নয়। এগুলো কি বর্তমান গতিতেই বাড়তে থাকবে? বিপুল বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা কীভাবে পূরণ হবে? ডেটা সেন্টারগুলো কি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কাছে গড়ে উঠবে, নাকি শিল্প ও বড় শহরের কাছে? এগুলোর মালিকানা থাকবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে, নাকি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও বড় ভূমিকা নেবে?
চীনের অভিজ্ঞতা তাই আসিয়ানের জন্য বিশেষ আগ্রহের বিষয়। দেশটির এআই মডেল উন্নয়নের গতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও কম ব্যয়ে নতুন মডেল তৈরির সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। সবুজ প্রযুক্তিতে যে উৎপাদনভিত্তিক দক্ষতা চীন তৈরি করেছে, এআই ও ডেটা অবকাঠামোতেও কি একই ধরনের সুবিধা তৈরি করা সম্ভব হবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ সস্তা এআইয়ের জন্য শুধু সফটওয়্যার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যাপ্ত জমি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা, সেমিকন্ডাক্টর এবং উচ্চগতির তথ্য সংযোগ। এই অবকাঠামো ছাড়া এআইয়ের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।
ডিজিটাল নির্ভরতার নতুন ঝুঁকি
আসিয়ান দেশগুলোর সামনে আরও একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। আঞ্চলিক ডেটা প্রক্রিয়াকরণের বড় কেন্দ্র কি চীন হয়ে উঠবে, নাকি প্রতিটি দেশ নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইবে?
তথ্য সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ কি যথেষ্ট হবে? ব্যবহারকারীরা কি যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের প্রযুক্তি কাঠামোর যেকোনো একটির ওপর নির্ভর করবে, নাকি দুটি ব্যবস্থার সমান্তরাল ব্যবহার চালু রাখবে?
আসিয়ান স্বাভাবিকভাবেই নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করবে। উন্মুক্ত উৎসের চীনা মডেল ব্যবহার করে স্থানীয় প্রযুক্তি গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু মডেল থাকলেই প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা আসে না। দরকার সেমিকন্ডাক্টর, অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকৌশল সহায়তা।
এখানেই আসিয়ান একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মুখোমুখি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনো পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির বাইরে থাকার মূল্যও অনেক বেশি।
অপেক্ষা করার সুযোগ নেই
আসিয়ান অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—পরবর্তী সংকটের জন্য সংকট শুরু হওয়ার পর প্রস্তুতি নিলে চলবে না। জ্বালানি থেকে শুরু করে ডেটা, সেমিকন্ডাক্টর থেকে বিদ্যুৎ গ্রিড—প্রতিটি ক্ষেত্রে স্থিতিস্থাপকতা এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অংশ।
বিশ্ব অর্থনীতি হয়তো একসঙ্গে বড় মন্দার দিকে এগোচ্ছে না। কিন্তু একের পর এক আঞ্চলিক ও প্রযুক্তিগত ধাক্কা অর্থনীতির পুরোনো দুর্বলতাগুলোকে প্রকাশ করে দিচ্ছে। তাই আসিয়ানের কৌশল হওয়া উচিত একই সঙ্গে বৈচিত্র্য, সংযোগ ও নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ডিজিটাল বিভাজন আরও গভীর হলে আসিয়ান কোনো পক্ষের প্রযুক্তিগত উপনিবেশে পরিণত হতে চাইবে না। কিন্তু সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কেবল নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। এখনই অবকাঠামো, দক্ষতা, জ্বালানি এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
কারণ আসিয়ানের সামনে যে ভবিষ্যৎ আসছে, সেখানে ধাক্কা আসবে কি না—এই প্রশ্ন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, ধাক্কা যখন আসবে, তখন কে কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
অ্যালান বলার্ড 



















