দশকের পর দশক ধরে নিজস্ব যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে একের পর এক ব্যর্থতার মুখ দেখেছে ব্রাজিল। বহু পরিকল্পনা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলোর বেশির ভাগই থেমে গেছে মাঝপথে। এমনকি একটি বিমানবাহী রণতরী অকার্যকর হয়ে পড়ার পর সেটিকে ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনাও দেশটির নৌযান নির্মাণের ব্যর্থ ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
তবে সেই দীর্ঘ ব্যর্থতার ধারায় এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। ব্রাজিল নিজেদের ভূখণ্ডে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রতীক তামান্দারে শ্রেণির নতুন যুদ্ধজাহাজ।
চারটি নতুন যুদ্ধজাহাজ, বদলাচ্ছে সক্ষমতা
এপ্রিল মাসে ব্রাজিল তামান্দারে শ্রেণির প্রথম যুদ্ধজাহাজকে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবহরে যুক্ত করেছে। এই শ্রেণির মোট চারটি যুদ্ধজাহাজ ব্রাজিলেই নির্মাণ করা হচ্ছে। আরও চারটি জাহাজ নির্মাণের বিষয়ে প্রাথমিক সমঝোতাও হয়েছে।
নতুন যুদ্ধজাহাজগুলো শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজ শনাক্ত করতে পারে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও টর্পেডো ব্যবহার করে আঘাত হানতে সক্ষম। এতে থাকা হেলিকপ্টার অবতরণস্থল নৌবাহিনীকে আরও বিস্তৃত সমুদ্র এলাকায় নজরদারি চালানোর সুযোগ দেবে।
অর্থাৎ, ব্যয়বহুল বড় আকারের ধ্বংসকারী যুদ্ধজাহাজের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ছাড়াই ব্রাজিল তার সমুদ্রসীমায় নিয়মিত টহল ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রম বাড়াতে পারবে।
বিদেশি সহায়তায় দেশীয় নির্মাণ
এই যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ প্রকল্পে জার্মানির থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমসের সঙ্গে ব্রাজিলের বিমান ও মহাকাশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এমব্রেয়ারের সহযোগিতা রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় সান্তা কাতারিনা রাজ্যের ইতাজাই শহরে জাহাজগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির গুরুত্ব শুধু যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা, দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
এত দিন ব্রাজিলের নৌবাহিনী মূলত বিশ শতকে ইউরোপে নির্মিত পুরোনো ও ব্যবহৃত যুদ্ধজাহাজের ওপর নির্ভর করেছে। নিজ দেশে ছোট আকারের কিছু যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের অভিজ্ঞতা থাকলেও তামান্দারে শ্রেণির জাহাজ সেই সক্ষমতাকে অনেক উঁচু স্তরে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ব্যয়েও বড় পরিবর্তন
যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের পাশাপাশি ব্রাজিল সামগ্রিকভাবে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় দেশটির সামরিক ব্যয় প্রায় স্থির ছিল কিংবা কমেছে। বর্তমানে তা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ।
গত বছর ব্রাজিল সশস্ত্র বাহিনীর পেছনে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি।
দেশটির পরিকল্পনা আরও উচ্চাভিলাষী। পরমাণু শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ নির্মাণের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এটি সফল হলে পরমাণু অস্ত্রধারী নয়—এমন একটি দেশের জন্য এটি হবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তিগত অর্জন।
২০২২ সালে ব্রাজিল ১৯টি কৌশলগত ও জ্বালানি সরবরাহকারী সামরিক বিমান কেনার নির্দেশ দিয়েছিল। চলতি বছরের মার্চে দেশটি নিজ ভূখণ্ডে সংযোজিত প্রথম অতিধ্বনি গতির যুদ্ধবিমানও প্রদর্শন করেছে। সুইডেনের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে তৈরি এই যুদ্ধবিমান ব্রাজিলের বিমান নির্মাণ সক্ষমতার আরেকটি বড় নিদর্শন।

লাতিন আমেরিকাজুড়েই বাড়ছে সামরিক প্রস্তুতি
ব্রাজিল একা নয়। লাতিন আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশও সামরিক ব্যয় বাড়াচ্ছে।
পেরু ও কলম্বিয়া গত এক বছরে বহু বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি করেছে। পেরু যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নিয়েছে, আর কলম্বিয়া সুইডেনের তৈরি যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পথে এগিয়েছে।
এতে বোঝা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন তুলনামূলক কম সামরিক ব্যয়ের পর লাতিন আমেরিকার দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নতুন করে মূল্যায়ন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কি মূল কারণ?
ব্রাজিলের সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর পেছনে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে কারণ হিসেবে দেখা সহজ। জুলাইয়ে দেশটির সরকার এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল যে ব্রাজিলের ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারে।
ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা এবং মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করা নৌযানের বিরুদ্ধে ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান—এসব ঘটনাও ব্রাজিলের নিরাপত্তা ভাবনায় প্রভাব ফেলেছে।
তবে ব্রাজিলের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর কারণকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
পরিকল্পনার শুরু অনেক আগেই
তামান্দারে শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালে। সুইডেনের সঙ্গে গ্রিপেন যুদ্ধবিমান উন্নয়নের বিষয়ে সমঝোতাও হয়েছিল ২০১৩ সালে। অর্থাৎ বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার বহু আগেই ব্রাজিল নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েছিল।
মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করা এবং বিদেশি অস্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি হয়তো এই উদ্যোগকে আরও জরুরি করে তুলেছে, কিন্তু এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন স্থায়িত্ব নিয়ে
ব্রাজিলের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রতিরক্ষা কর্মসূচিগুলো দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা। আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, ডুবোজাহাজ ও যুদ্ধবিমান নির্মাণ শুধু এককালীন বিনিয়োগের বিষয় নয়; এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্যও বিপুল অর্থ প্রয়োজন।
অক্টোবরের নির্বাচনের পর সরকার পরিবর্তন হলেও বর্তমান প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ নিজস্ব সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা এখন ব্রাজিলের শিল্প ও নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেরই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
দীর্ঘ ব্যর্থতার পর তামান্দারে শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ তাই ব্রাজিলের জন্য শুধু একটি নতুন নৌযান নয়। এটি নিজেদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নিজেরাই তৈরি করার দীর্ঘমেয়াদি আকাঙ্ক্ষার বাস্তব পরীক্ষা। আপাতত সেই যাত্রা স্থিতিশীল পথেই এগোচ্ছে।
ব্রাজিলের নতুন যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ শুধু নৌবাহিনীর শক্তি বাড়ানোর ঘটনা নয়; এটি দেশটির সামরিক শিল্পকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রচেষ্টারও প্রতীক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















