০৮:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
মোগাদিশুতে ফিরছে স্বস্তি, তবে শান্তির আড়ালে রয়ে গেছে বড় শঙ্কা জাম্বিয়ার তামার সমৃদ্ধি, কিন্তু মানুষের ঘরে স্বস্তি কোথায়? মক্কা চুক্তি: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা জোটে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২৬৫ মৃত্যু, উদ্ধার তৎপরতায় বৈষম্যের অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ইসলামের পতন, তবু শেষ হয়ে যায়নি মুসলিম ব্রাদারহুড ইউরোপকে এক করার অদৃশ্য কারিগর কারা? লেবার ও ব্যবসা: অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে সম্পর্ক মেরামতের নতুন সুযোগ শান্তির কথা বলাই এখন রাশিয়ায় অপরাধ, নির্বাচনের দৌড় থেকে বাদ উদারপন্থী ইয়াব্লোকো বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার আশঙ্কা: জার্মানিকে নতুন ধরনের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে শুকিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের প্রধান নদী, জ্বালানি ও শিল্পে বাড়ছে বিপদের শঙ্কা

বিশেষজ্ঞের ভিড়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার প্রজ্ঞাবান মানুষ

আজকের পৃথিবীতে জ্ঞানের ঘাটতি নেই। তথ্য হাতের মুঠোয়, পরামর্শের অভাব নেই, আর প্রায় প্রতিটি বিষয়ে কথা বলার মতো বিশেষজ্ঞও যেন অগণিত। তবু একটি জিনিস ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে—কীভাবে ভাবতে হয়, কখন থামতে হয় এবং অসম্পূর্ণ তথ্যের মধ্যেও কীভাবে ভালো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন ঘুম, খাবার, সন্তান পালন, নেতৃত্ব, শরীরচর্চা কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাপন—প্রায় সবকিছুর জন্যই কেউ না কেউ ‘সঠিক নিয়ম’ বাতলে দিচ্ছেন। একজন বলছেন ভোর সাড়ে চারটায় ওঠাই সাফল্যের চাবিকাঠি, অন্যজন বলছেন মধ্যরাতের আগে ঘুমানোই সবচেয়ে জরুরি। কেউ একটি নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাসকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে তুলে ধরছেন, আবার আরেকজন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ দেখাচ্ছেন।

পরামর্শ বাড়ছে, কিন্তু নিশ্চিততা বাড়ছে না। বরং এত বিপরীতমুখী বক্তব্যের ভিড়ে সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারছেন না কোন কথাটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।

জ্ঞান আর চিন্তা এক জিনিস নয়

সমস্যাটা শুধু বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া নয়। বড় সমস্যা হলো, আমরা বিশেষজ্ঞতা আর চিন্তাশক্তিকে প্রায় একই বিষয় বলে ধরে নিচ্ছি।

কোনো বিষয়ে গভীর, কারিগরি ও নির্ভুল জ্ঞান থাকা অবশ্যই বিশেষজ্ঞতার লক্ষণ। আধুনিক সমাজে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ কিংবা তথ্য বিশ্লেষকদের বিশেষায়িত দক্ষতা ছাড়া এগোনো সম্ভব নয়। কিন্তু জীবনের সব সিদ্ধান্ত এমন নয়, যেখানে আগে থেকেই সব তথ্য সাজানো থাকে এবং একটি নির্ভুল উত্তর বের করে আনা যায়।

বাস্তব জীবনের বড় সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই অসম্পূর্ণ তথ্য, অনিশ্চয়তা এবং পরস্পরবিরোধী পরিস্থিতির মধ্যে নিতে হয়। সেখানে শুধু তথ্য জানা যথেষ্ট নয়; কোন তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কোন প্রশ্নটি আগে করা দরকার এবং কোন বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়—সেটি বোঝার ক্ষমতাই বেশি মূল্যবান।

আমাদের আগের প্রজন্মের জীবনে এই ধরনের জ্ঞান অনেক সময় বই বা সার্টিফিকেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধু কিংবা দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যেও তা পাওয়া যেত। কেউ হয়তো কোনো বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেননি, কিন্তু বহু বছর মানুষ, পরিস্থিতি ও সমস্যার মুখোমুখি হতে হতে এমন এক বিচারবোধ তৈরি করেছিলেন, যা বইয়ের জ্ঞান দিয়ে সবসময় পাওয়া যায় না।

অভিজ্ঞতার আসল মূল্য

একসময় কোনো ব্যক্তি যদি একটি কাজ বিশ বছর ধরে করে থাকতেন, তাহলে ধরে নেওয়া হতো তিনি শুধু কাজটি জানেন না, কাজটির জটিলতাও বুঝতে শিখেছেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা মানুষকে শুধু উত্তর দেয় না; ভুলের ধরন চিনতে শেখায়, পরিস্থিতির পরিবর্তন বুঝতে শেখায় এবং কখন প্রচলিত নিয়ম থেকে সরে আসতে হবে, সেই বোধও তৈরি করে।

আজকের বিশেষজ্ঞতা অনেক বেশি নিখুঁত ও প্রযুক্তিনির্ভর। একজন সার্জন অসাধারণ নির্ভুলতায় অস্ত্রোপচার করতে পারেন। একজন প্রকৌশলী বিপুল জটিলতার অবকাঠামো তৈরি করতে পারেন। একজন বিশ্লেষক মুহূর্তের মধ্যে বিপুল তথ্য পর্যালোচনা করতে পারেন। এসব দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই।

কিন্তু ঝুঁকি তৈরি হয় তখনই, যখন আমরা সঠিক উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাকে সঠিক প্রশ্ন করার ক্ষমতার চেয়ে বেশি মূল্য দিতে শুরু করি।

দ্রুত উত্তর সবসময় ভালো সিদ্ধান্ত নয়

বর্তমান কর্মজীবন ও সামাজিক পরিবেশে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। কোনো প্রশ্ন উঠলেই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে হবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অবস্থান জানাতে হবে। কিছুক্ষণ নীরব থাকা বা বলা যে ‘এখনও বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার নয়’—এসব যেন দুর্বলতার লক্ষণ।

অথচ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনেক সময় প্রথম উত্তর থেকে আসে না। বরং একটু থেমে গেলে, দ্বিতীয় প্রশ্নটি করলে কিংবা নতুন তথ্য পাওয়ার পর আগের ধারণাটি বদলাতে রাজি হলে সিদ্ধান্ত আরও পরিণত হয়।

চিন্তার জন্য সময় প্রয়োজন। কখনো প্রয়োজন নীরবতারও। কিন্তু আমাদের চারপাশের ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যেখানে দ্রুততা প্রায়ই প্রজ্ঞার জায়গা দখল করে নেয়।

The Right Man - The Right Man

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। বিশাল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করা যায়, জটিল বিষয়কে সংক্ষেপ করা যায় এবং সম্ভাব্য সমাধানের তালিকাও তৈরি করা যায়।

কিন্তু উত্তর তৈরি করা আর সেই উত্তরের পরিণতি বহন করা এক বিষয় নয়।

একটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের আবেগ, সম্পর্ক, দায়িত্ব, সামাজিক বাস্তবতা কিংবা এমন কোনো নীরব সংকেত জড়িয়ে থাকতে পারে, যা কেবল তথ্য বিশ্লেষণ করে ধরা কঠিন। প্রযুক্তি উত্তর দিতে পারে; কিন্তু কোন উত্তরটি এই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য, কখন অপেক্ষা করা উচিত এবং কখন সিদ্ধান্ত বদলানো দরকার—সেসব প্রশ্নের জন্য মানুষের বিচারবোধ এখনও অপরিহার্য।

এখানেই প্রজ্ঞার প্রয়োজন।

প্রজ্ঞা কখনো সবচেয়ে জোরে কথা বলা মানুষের মধ্যে থাকে না। বরং তা অনেক সময় দেখা যায় এমন মানুষের মধ্যে, যিনি তাড়াহুড়োর মুহূর্তে সবাইকে একটু থামতে বলেন, অন্যদের কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং নিজের প্রথম ধারণাকেও প্রশ্ন করতে প্রস্তুত থাকেন।

আমাদের বিশেষজ্ঞ দরকার, কিন্তু শুধু বিশেষজ্ঞ দিয়ে চলবে না

বিশেষজ্ঞতা আমাদের সভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি। তাই বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন কমানোর কথা বলা আসলে উদ্দেশ্য নয়। প্রয়োজন হলো বিশেষজ্ঞতার সঙ্গে বিচারবোধ, অভিজ্ঞতা ও চিন্তার গভীরতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া।

আজকের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো তথ্যের অভাব নয়; বরং তথ্যের অতিরিক্ত ভিড়ে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ তা শনাক্ত করার ক্ষমতার সংকট।

আমরা কত বেশি জানি, সেটিই শেষ কথা নয়। আসল প্রশ্ন হলো—সব তথ্য হাতে না থাকলেও আমরা কতটা পরিষ্কারভাবে ভাবতে পারি, অনিশ্চয়তাকে কতটা সহ্য করতে পারি এবং প্রয়োজন হলে নিজের নিশ্চিত ধারণাকেও কতটা সংশোধন করতে পারি।

বিশেষজ্ঞতা উত্তর দিতে পারে। কিন্তু প্রজ্ঞা শেখায়, কোন প্রশ্নটি আসলে করা দরকার।

আর এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে প্রায় সবাই কোনো না কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দাবি করছে, সবচেয়ে মূল্যবান দক্ষতা হয়তো আরও বেশি জানা নয়—বরং আরও ভালোভাবে চিন্তা করতে শেখা।

লেখক: মাইকেল গুজডার, এক্সিকিউটিভ ভাইস-প্রেসিডেন্ট, শিক্ষা বিভাগ, জিইএমএস

জনপ্রিয় সংবাদ

মোগাদিশুতে ফিরছে স্বস্তি, তবে শান্তির আড়ালে রয়ে গেছে বড় শঙ্কা

বিশেষজ্ঞের ভিড়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার প্রজ্ঞাবান মানুষ

০৭:৪১:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

আজকের পৃথিবীতে জ্ঞানের ঘাটতি নেই। তথ্য হাতের মুঠোয়, পরামর্শের অভাব নেই, আর প্রায় প্রতিটি বিষয়ে কথা বলার মতো বিশেষজ্ঞও যেন অগণিত। তবু একটি জিনিস ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে—কীভাবে ভাবতে হয়, কখন থামতে হয় এবং অসম্পূর্ণ তথ্যের মধ্যেও কীভাবে ভালো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন ঘুম, খাবার, সন্তান পালন, নেতৃত্ব, শরীরচর্চা কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাপন—প্রায় সবকিছুর জন্যই কেউ না কেউ ‘সঠিক নিয়ম’ বাতলে দিচ্ছেন। একজন বলছেন ভোর সাড়ে চারটায় ওঠাই সাফল্যের চাবিকাঠি, অন্যজন বলছেন মধ্যরাতের আগে ঘুমানোই সবচেয়ে জরুরি। কেউ একটি নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাসকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে তুলে ধরছেন, আবার আরেকজন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ দেখাচ্ছেন।

পরামর্শ বাড়ছে, কিন্তু নিশ্চিততা বাড়ছে না। বরং এত বিপরীতমুখী বক্তব্যের ভিড়ে সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারছেন না কোন কথাটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।

জ্ঞান আর চিন্তা এক জিনিস নয়

সমস্যাটা শুধু বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া নয়। বড় সমস্যা হলো, আমরা বিশেষজ্ঞতা আর চিন্তাশক্তিকে প্রায় একই বিষয় বলে ধরে নিচ্ছি।

কোনো বিষয়ে গভীর, কারিগরি ও নির্ভুল জ্ঞান থাকা অবশ্যই বিশেষজ্ঞতার লক্ষণ। আধুনিক সমাজে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ কিংবা তথ্য বিশ্লেষকদের বিশেষায়িত দক্ষতা ছাড়া এগোনো সম্ভব নয়। কিন্তু জীবনের সব সিদ্ধান্ত এমন নয়, যেখানে আগে থেকেই সব তথ্য সাজানো থাকে এবং একটি নির্ভুল উত্তর বের করে আনা যায়।

বাস্তব জীবনের বড় সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই অসম্পূর্ণ তথ্য, অনিশ্চয়তা এবং পরস্পরবিরোধী পরিস্থিতির মধ্যে নিতে হয়। সেখানে শুধু তথ্য জানা যথেষ্ট নয়; কোন তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কোন প্রশ্নটি আগে করা দরকার এবং কোন বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়—সেটি বোঝার ক্ষমতাই বেশি মূল্যবান।

আমাদের আগের প্রজন্মের জীবনে এই ধরনের জ্ঞান অনেক সময় বই বা সার্টিফিকেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধু কিংবা দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যেও তা পাওয়া যেত। কেউ হয়তো কোনো বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেননি, কিন্তু বহু বছর মানুষ, পরিস্থিতি ও সমস্যার মুখোমুখি হতে হতে এমন এক বিচারবোধ তৈরি করেছিলেন, যা বইয়ের জ্ঞান দিয়ে সবসময় পাওয়া যায় না।

অভিজ্ঞতার আসল মূল্য

একসময় কোনো ব্যক্তি যদি একটি কাজ বিশ বছর ধরে করে থাকতেন, তাহলে ধরে নেওয়া হতো তিনি শুধু কাজটি জানেন না, কাজটির জটিলতাও বুঝতে শিখেছেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা মানুষকে শুধু উত্তর দেয় না; ভুলের ধরন চিনতে শেখায়, পরিস্থিতির পরিবর্তন বুঝতে শেখায় এবং কখন প্রচলিত নিয়ম থেকে সরে আসতে হবে, সেই বোধও তৈরি করে।

আজকের বিশেষজ্ঞতা অনেক বেশি নিখুঁত ও প্রযুক্তিনির্ভর। একজন সার্জন অসাধারণ নির্ভুলতায় অস্ত্রোপচার করতে পারেন। একজন প্রকৌশলী বিপুল জটিলতার অবকাঠামো তৈরি করতে পারেন। একজন বিশ্লেষক মুহূর্তের মধ্যে বিপুল তথ্য পর্যালোচনা করতে পারেন। এসব দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই।

কিন্তু ঝুঁকি তৈরি হয় তখনই, যখন আমরা সঠিক উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাকে সঠিক প্রশ্ন করার ক্ষমতার চেয়ে বেশি মূল্য দিতে শুরু করি।

দ্রুত উত্তর সবসময় ভালো সিদ্ধান্ত নয়

বর্তমান কর্মজীবন ও সামাজিক পরিবেশে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। কোনো প্রশ্ন উঠলেই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে হবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অবস্থান জানাতে হবে। কিছুক্ষণ নীরব থাকা বা বলা যে ‘এখনও বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার নয়’—এসব যেন দুর্বলতার লক্ষণ।

অথচ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনেক সময় প্রথম উত্তর থেকে আসে না। বরং একটু থেমে গেলে, দ্বিতীয় প্রশ্নটি করলে কিংবা নতুন তথ্য পাওয়ার পর আগের ধারণাটি বদলাতে রাজি হলে সিদ্ধান্ত আরও পরিণত হয়।

চিন্তার জন্য সময় প্রয়োজন। কখনো প্রয়োজন নীরবতারও। কিন্তু আমাদের চারপাশের ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যেখানে দ্রুততা প্রায়ই প্রজ্ঞার জায়গা দখল করে নেয়।

The Right Man - The Right Man

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। বিশাল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করা যায়, জটিল বিষয়কে সংক্ষেপ করা যায় এবং সম্ভাব্য সমাধানের তালিকাও তৈরি করা যায়।

কিন্তু উত্তর তৈরি করা আর সেই উত্তরের পরিণতি বহন করা এক বিষয় নয়।

একটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের আবেগ, সম্পর্ক, দায়িত্ব, সামাজিক বাস্তবতা কিংবা এমন কোনো নীরব সংকেত জড়িয়ে থাকতে পারে, যা কেবল তথ্য বিশ্লেষণ করে ধরা কঠিন। প্রযুক্তি উত্তর দিতে পারে; কিন্তু কোন উত্তরটি এই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য, কখন অপেক্ষা করা উচিত এবং কখন সিদ্ধান্ত বদলানো দরকার—সেসব প্রশ্নের জন্য মানুষের বিচারবোধ এখনও অপরিহার্য।

এখানেই প্রজ্ঞার প্রয়োজন।

প্রজ্ঞা কখনো সবচেয়ে জোরে কথা বলা মানুষের মধ্যে থাকে না। বরং তা অনেক সময় দেখা যায় এমন মানুষের মধ্যে, যিনি তাড়াহুড়োর মুহূর্তে সবাইকে একটু থামতে বলেন, অন্যদের কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং নিজের প্রথম ধারণাকেও প্রশ্ন করতে প্রস্তুত থাকেন।

আমাদের বিশেষজ্ঞ দরকার, কিন্তু শুধু বিশেষজ্ঞ দিয়ে চলবে না

বিশেষজ্ঞতা আমাদের সভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি। তাই বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন কমানোর কথা বলা আসলে উদ্দেশ্য নয়। প্রয়োজন হলো বিশেষজ্ঞতার সঙ্গে বিচারবোধ, অভিজ্ঞতা ও চিন্তার গভীরতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া।

আজকের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো তথ্যের অভাব নয়; বরং তথ্যের অতিরিক্ত ভিড়ে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ তা শনাক্ত করার ক্ষমতার সংকট।

আমরা কত বেশি জানি, সেটিই শেষ কথা নয়। আসল প্রশ্ন হলো—সব তথ্য হাতে না থাকলেও আমরা কতটা পরিষ্কারভাবে ভাবতে পারি, অনিশ্চয়তাকে কতটা সহ্য করতে পারি এবং প্রয়োজন হলে নিজের নিশ্চিত ধারণাকেও কতটা সংশোধন করতে পারি।

বিশেষজ্ঞতা উত্তর দিতে পারে। কিন্তু প্রজ্ঞা শেখায়, কোন প্রশ্নটি আসলে করা দরকার।

আর এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে প্রায় সবাই কোনো না কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দাবি করছে, সবচেয়ে মূল্যবান দক্ষতা হয়তো আরও বেশি জানা নয়—বরং আরও ভালোভাবে চিন্তা করতে শেখা।

লেখক: মাইকেল গুজডার, এক্সিকিউটিভ ভাইস-প্রেসিডেন্ট, শিক্ষা বিভাগ, জিইএমএস