০৯:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
সাগরে ১৬ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর বাবা ও দুই ছেলেকে জীবিত উদ্ধার ব্রিটিশ ব্যবসার নীরবতা: রাজনীতিতে কথা না বলার খেসারত দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা মোগাদিশুতে ফিরছে স্বস্তি, তবে শান্তির আড়ালে রয়ে গেছে বড় শঙ্কা জাম্বিয়ার তামার সমৃদ্ধি, কিন্তু মানুষের ঘরে স্বস্তি কোথায়? মক্কা চুক্তি: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা জোটে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২৬৫ মৃত্যু, উদ্ধার তৎপরতায় বৈষম্যের অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ইসলামের পতন, তবু শেষ হয়ে যায়নি মুসলিম ব্রাদারহুড ইউরোপকে এক করার অদৃশ্য কারিগর কারা? লেবার ও ব্যবসা: অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে সম্পর্ক মেরামতের নতুন সুযোগ শান্তির কথা বলাই এখন রাশিয়ায় অপরাধ, নির্বাচনের দৌড় থেকে বাদ উদারপন্থী ইয়াব্লোকো

শুকিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের প্রধান নদী, জ্বালানি ও শিল্পে বাড়ছে বিপদের শঙ্কা

ইউরোপে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরায় রাইন ও দানিয়ুব নদীর পানি নেমে গেছে নজিরবিহীনভাবে। ১৮৮০ সালে সরকারি রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর এবার এই দুই নদীর পানির স্তর সবচেয়ে নিচে নেমেছে। এর প্রভাব শুধু নৌপরিবহনেই সীমাবদ্ধ নেই; বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, কৃষি ও ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।

রাইনের পানি নামছে বিপজ্জনক স্তরে

জার্মানির রাইনল্যান্ড-প্যালাটিনেট অঞ্চলের মধ্যযুগীয় শহর কাউবে নদীর গভীরতা মাপার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মধ্য রাইনের সবচেয়ে অগভীর অংশের কাছে হওয়ায় এখানকার পানির স্তর পুরো ১ হাজার ২৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাইনের নৌচলাচলের পরিস্থিতি বোঝার অন্যতম প্রধান সূচক।

১২ আগস্ট সেখানে সর্বোচ্চ পানির গভীরতা ছিল মাত্র ১২ সেন্টিমিটার। এর আগে ২০১৮ সালের ভয়াবহ খরার সময় সর্বনিম্ন গভীরতা নেমেছিল ২৫ সেন্টিমিটারে। জার্মানির অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিনে পানির গভীরতা এক অঙ্কের সংখ্যায় নেমে যেতে পারে। তখন রাইনের নৌচলাচল কার্যত দুই ভাগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

দানিয়ুবেও একই সংকট

ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী দানিয়ুবের পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো নয়। বুদাপেস্টে নদীর পানির গভীরতা মাপার একটি কেন্দ্রে তা নেমে এসেছে ২৬ সেন্টিমিটারে। ২০১৮ সালে সর্বনিম্ন রেকর্ড ছিল ৩৩ সেন্টিমিটার।

এ পরিস্থিতি হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বড় হুমকি তৈরি করেছে। বুদাপেস্টের কাছে পাকশ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে হাঙ্গেরির প্রায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। নদীর পানি কমে যাওয়ায় কেন্দ্রটির কার্যক্রম আংশিকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে। রোমানিয়ার চেরনাভোদা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রেও একই কারণে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে উৎপাদন বন্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

দুই দেশের সরকারই শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে যতটা সম্ভব বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। এরই মধ্যে হাঙ্গেরিতে অডি এবং রোমানিয়ায় ডাচিয়া গাড়ি তৈরির মতো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

খরার নিচে উঠে আসছে ইতিহাসের চিহ্ন

নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে নেমে যাওয়ায় শুধু অর্থনৈতিক সংকটই দৃশ্যমান হচ্ছে না, শত শত বছরের পুরোনো ইতিহাসও পানির নিচ থেকে ভেসে উঠছে।

রাইন ও দানিয়ুবের তীরে বিভিন্ন সময়ে পাথরের ওপর খোদাই করা ‘ক্ষুধার পাথর’ দেখা যাচ্ছে। ১৫ থেকে ১৯ শতকের মধ্যে এসব পাথরে নদীর নিম্ন পানির স্তর চিহ্নিত করা হতো। একই সঙ্গে এগুলো ছিল ফসলহানি ও দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্কবার্তা।

বুদাপেস্টে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জার্মান সামরিক বাহিনীর একটি মোটরসাইকেল নদীর তলদেশ থেকে দৃশ্যমান হয়েছে। বুলগেরিয়ার রিয়াহোভো গ্রামের কাছে পানির নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে একটি ম্যামথের দেহাবশেষ।

সার্বিয়ার দানিয়ুব অংশে আরও নাটকীয় দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনীর ডুবিয়ে রাখা কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ দৃশ্যমান হয়েছে। ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে সোভিয়েত বাহিনী যাতে নদীপথ ব্যবহার করতে না পারে, সে উদ্দেশ্যে জার্মানরা প্রায় ২০০টি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছিল।

Europe's rivers are running dry, and the knock-on effects are disastrous |  Yiannis Baboulias | The Guardian

ইউরোপের বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা

রাইন ইউরোপের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রাইনের ওপর নির্ভরশীল। জলপথে পরিবাহিত পণ্যবাহী কনটেইনারেরও ৯৯ শতাংশের বেশি এই নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

দানিয়ুবও ইউরোপীয় পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পণ্য পরিবহনের প্রায় ৮ শতাংশ এই নদীপথে হয়।

কিন্তু পানি কমে যাওয়ায় বড় বড় পণ্যবাহী নৌযান এখন স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পণ্য নিয়ে চলাচল করছে। এতে পরিবহন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।

জার্মানির একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা খ্রিস্টিয়ান লোরেঞ্জের উদাহরণটি পরিস্থিতির তীব্রতা বোঝায়। সাধারণত হাইলব্রন থেকে একটি নৌযান ২ হাজার ২০০ টন পাথরলবণ বহন করতে পারে। কিন্তু এখন একই নৌযান মাত্র ২৮০ টন নিয়ে পৌঁছাচ্ছে। তারপরও নদীপথ পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না, কারণ এত কম পণ্য বহন করেও একটি নৌযান একটি বড় পণ্যবাহী ট্রাকের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি পণ্য পরিবহন করতে পারে।

জার্মানির শিল্পখাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানির জন্য রাইন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন প্রায় ৬০০টি নৌযান জার্মানি-নেদারল্যান্ডস সীমান্ত অতিক্রম করে। এসব নৌযানের অনেকগুলোতেই ইউরোপের বৃহত্তম বন্দর রটারডাম থেকে আসা রপ্তানিমুখী পণ্য থাকে।

কয়লা, ইস্পাত, অপরিশোধিত তেল, রাসায়নিক পদার্থ ও বিভিন্ন খনিজের মতো ভারী পণ্য নদীপথে পরিবহন করা সড়ক বা রেলপথের তুলনায় সস্তা এবং তুলনামূলকভাবে কম দূষণকারী। উনিশ শতক থেকেই রাইনের তীরে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছিল নদীপথে সহজে পণ্য পরিবহন এবং শিল্পকার্যে পানি ব্যবহারের সুবিধার কারণে। সেই শিল্পভিত্তি এখনো টিকে আছে।

রাইনের তীরে অবস্থিত লেভারকুজেনে ওষুধশিল্পের বড় প্রতিষ্ঠান বেয়ারের প্রধান কার্যালয়। লুডভিগশাফেন শহরে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাসায়নিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএএসএফ। নদীর পানির এই সংকট তাই কেবল পরিবহন সমস্যা নয়; এটি ইউরোপের শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থার জন্যও সরাসরি ঝুঁকি।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুতি নিলেও সংকট কাটছে না

গত এক দশকে ইউরোপের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বারবার কম পানির পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে নিজেদের কিছুটা মানিয়ে নিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বেশি পরিমাণে মজুত পণ্য রাখছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান অগভীর নদীতে চলাচলের উপযোগী নৌযান ব্যবহার করছে। অনেকেই নদীপথের বদলে সড়ক ও রেলপথে পণ্য পরিবহন শুরু করেছে।

জার্মানিতে অভ্যন্তরীণ জলপথে পরিবাহিত মোট পণ্যের অংশ ২০১৭ সালে ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

তবে এবারের খরা পরিস্থিতি আরও কঠিন। রাইন ও দানিয়ুবের জনপ্রিয় পর্যটনভিত্তিক নৌভ্রমণ কার্যত থমকে গেছে। কৃষকেরা ফসল নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর নদীর ওপর নির্ভরশীল জেলেরা ভাবছেন তাদের জীবিকা কতটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

জার্মান অর্থনীতিতে কতটা ক্ষতি হতে পারে

২০১৮ সালের খরার সময় জার্মানির মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল বলে অর্থনৈতিক গবেষণায় উঠে এসেছিল। এবার পানির স্তর সেই সময়ের চেয়েও নিচে নেমেছে।

অর্থনীতিবিদ কার্স্টেন ব্রজেস্কির ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতি যদি অক্টোবর পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তাহলে জার্মানির মোট দেশজ উৎপাদন আরও প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। তবে মধ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান খরার পূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষতি এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

ইউরোপের ইতিহাসে নজিরবিহীন খরা এখনো অব্যাহত। নদীগুলোর পানি যত কমছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে ইউরোপের অর্থনীতি শুধু আকাশের তাপমাত্রার ওপর নয়, নদীর পানির স্তরের ওপরও ক্রমশ বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাগরে ১৬ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর বাবা ও দুই ছেলেকে জীবিত উদ্ধার

শুকিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের প্রধান নদী, জ্বালানি ও শিল্পে বাড়ছে বিপদের শঙ্কা

০৮:০৪:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

ইউরোপে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরায় রাইন ও দানিয়ুব নদীর পানি নেমে গেছে নজিরবিহীনভাবে। ১৮৮০ সালে সরকারি রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর এবার এই দুই নদীর পানির স্তর সবচেয়ে নিচে নেমেছে। এর প্রভাব শুধু নৌপরিবহনেই সীমাবদ্ধ নেই; বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, কৃষি ও ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।

রাইনের পানি নামছে বিপজ্জনক স্তরে

জার্মানির রাইনল্যান্ড-প্যালাটিনেট অঞ্চলের মধ্যযুগীয় শহর কাউবে নদীর গভীরতা মাপার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মধ্য রাইনের সবচেয়ে অগভীর অংশের কাছে হওয়ায় এখানকার পানির স্তর পুরো ১ হাজার ২৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাইনের নৌচলাচলের পরিস্থিতি বোঝার অন্যতম প্রধান সূচক।

১২ আগস্ট সেখানে সর্বোচ্চ পানির গভীরতা ছিল মাত্র ১২ সেন্টিমিটার। এর আগে ২০১৮ সালের ভয়াবহ খরার সময় সর্বনিম্ন গভীরতা নেমেছিল ২৫ সেন্টিমিটারে। জার্মানির অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিনে পানির গভীরতা এক অঙ্কের সংখ্যায় নেমে যেতে পারে। তখন রাইনের নৌচলাচল কার্যত দুই ভাগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

দানিয়ুবেও একই সংকট

ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী দানিয়ুবের পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো নয়। বুদাপেস্টে নদীর পানির গভীরতা মাপার একটি কেন্দ্রে তা নেমে এসেছে ২৬ সেন্টিমিটারে। ২০১৮ সালে সর্বনিম্ন রেকর্ড ছিল ৩৩ সেন্টিমিটার।

এ পরিস্থিতি হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বড় হুমকি তৈরি করেছে। বুদাপেস্টের কাছে পাকশ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে হাঙ্গেরির প্রায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। নদীর পানি কমে যাওয়ায় কেন্দ্রটির কার্যক্রম আংশিকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে। রোমানিয়ার চেরনাভোদা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রেও একই কারণে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে উৎপাদন বন্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

দুই দেশের সরকারই শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে যতটা সম্ভব বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। এরই মধ্যে হাঙ্গেরিতে অডি এবং রোমানিয়ায় ডাচিয়া গাড়ি তৈরির মতো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

খরার নিচে উঠে আসছে ইতিহাসের চিহ্ন

নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে নেমে যাওয়ায় শুধু অর্থনৈতিক সংকটই দৃশ্যমান হচ্ছে না, শত শত বছরের পুরোনো ইতিহাসও পানির নিচ থেকে ভেসে উঠছে।

রাইন ও দানিয়ুবের তীরে বিভিন্ন সময়ে পাথরের ওপর খোদাই করা ‘ক্ষুধার পাথর’ দেখা যাচ্ছে। ১৫ থেকে ১৯ শতকের মধ্যে এসব পাথরে নদীর নিম্ন পানির স্তর চিহ্নিত করা হতো। একই সঙ্গে এগুলো ছিল ফসলহানি ও দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্কবার্তা।

বুদাপেস্টে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জার্মান সামরিক বাহিনীর একটি মোটরসাইকেল নদীর তলদেশ থেকে দৃশ্যমান হয়েছে। বুলগেরিয়ার রিয়াহোভো গ্রামের কাছে পানির নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে একটি ম্যামথের দেহাবশেষ।

সার্বিয়ার দানিয়ুব অংশে আরও নাটকীয় দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনীর ডুবিয়ে রাখা কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ দৃশ্যমান হয়েছে। ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে সোভিয়েত বাহিনী যাতে নদীপথ ব্যবহার করতে না পারে, সে উদ্দেশ্যে জার্মানরা প্রায় ২০০টি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছিল।

Europe's rivers are running dry, and the knock-on effects are disastrous |  Yiannis Baboulias | The Guardian

ইউরোপের বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা

রাইন ইউরোপের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রাইনের ওপর নির্ভরশীল। জলপথে পরিবাহিত পণ্যবাহী কনটেইনারেরও ৯৯ শতাংশের বেশি এই নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

দানিয়ুবও ইউরোপীয় পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পণ্য পরিবহনের প্রায় ৮ শতাংশ এই নদীপথে হয়।

কিন্তু পানি কমে যাওয়ায় বড় বড় পণ্যবাহী নৌযান এখন স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পণ্য নিয়ে চলাচল করছে। এতে পরিবহন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।

জার্মানির একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা খ্রিস্টিয়ান লোরেঞ্জের উদাহরণটি পরিস্থিতির তীব্রতা বোঝায়। সাধারণত হাইলব্রন থেকে একটি নৌযান ২ হাজার ২০০ টন পাথরলবণ বহন করতে পারে। কিন্তু এখন একই নৌযান মাত্র ২৮০ টন নিয়ে পৌঁছাচ্ছে। তারপরও নদীপথ পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না, কারণ এত কম পণ্য বহন করেও একটি নৌযান একটি বড় পণ্যবাহী ট্রাকের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি পণ্য পরিবহন করতে পারে।

জার্মানির শিল্পখাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানির জন্য রাইন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন প্রায় ৬০০টি নৌযান জার্মানি-নেদারল্যান্ডস সীমান্ত অতিক্রম করে। এসব নৌযানের অনেকগুলোতেই ইউরোপের বৃহত্তম বন্দর রটারডাম থেকে আসা রপ্তানিমুখী পণ্য থাকে।

কয়লা, ইস্পাত, অপরিশোধিত তেল, রাসায়নিক পদার্থ ও বিভিন্ন খনিজের মতো ভারী পণ্য নদীপথে পরিবহন করা সড়ক বা রেলপথের তুলনায় সস্তা এবং তুলনামূলকভাবে কম দূষণকারী। উনিশ শতক থেকেই রাইনের তীরে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছিল নদীপথে সহজে পণ্য পরিবহন এবং শিল্পকার্যে পানি ব্যবহারের সুবিধার কারণে। সেই শিল্পভিত্তি এখনো টিকে আছে।

রাইনের তীরে অবস্থিত লেভারকুজেনে ওষুধশিল্পের বড় প্রতিষ্ঠান বেয়ারের প্রধান কার্যালয়। লুডভিগশাফেন শহরে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাসায়নিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএএসএফ। নদীর পানির এই সংকট তাই কেবল পরিবহন সমস্যা নয়; এটি ইউরোপের শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থার জন্যও সরাসরি ঝুঁকি।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুতি নিলেও সংকট কাটছে না

গত এক দশকে ইউরোপের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বারবার কম পানির পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে নিজেদের কিছুটা মানিয়ে নিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বেশি পরিমাণে মজুত পণ্য রাখছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান অগভীর নদীতে চলাচলের উপযোগী নৌযান ব্যবহার করছে। অনেকেই নদীপথের বদলে সড়ক ও রেলপথে পণ্য পরিবহন শুরু করেছে।

জার্মানিতে অভ্যন্তরীণ জলপথে পরিবাহিত মোট পণ্যের অংশ ২০১৭ সালে ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

তবে এবারের খরা পরিস্থিতি আরও কঠিন। রাইন ও দানিয়ুবের জনপ্রিয় পর্যটনভিত্তিক নৌভ্রমণ কার্যত থমকে গেছে। কৃষকেরা ফসল নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর নদীর ওপর নির্ভরশীল জেলেরা ভাবছেন তাদের জীবিকা কতটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

জার্মান অর্থনীতিতে কতটা ক্ষতি হতে পারে

২০১৮ সালের খরার সময় জার্মানির মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল বলে অর্থনৈতিক গবেষণায় উঠে এসেছিল। এবার পানির স্তর সেই সময়ের চেয়েও নিচে নেমেছে।

অর্থনীতিবিদ কার্স্টেন ব্রজেস্কির ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতি যদি অক্টোবর পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তাহলে জার্মানির মোট দেশজ উৎপাদন আরও প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। তবে মধ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান খরার পূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষতি এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

ইউরোপের ইতিহাসে নজিরবিহীন খরা এখনো অব্যাহত। নদীগুলোর পানি যত কমছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে ইউরোপের অর্থনীতি শুধু আকাশের তাপমাত্রার ওপর নয়, নদীর পানির স্তরের ওপরও ক্রমশ বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।