দীর্ঘ পাঁচ দশকের মধ্যে আফগানিস্তান এখন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নিরাপদ। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুল দখলের পর দেশটিতে বড় ধরনের যুদ্ধ ও সন্ত্রাসী হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু সেই শান্তির বিনিময়ে আফগানদের দিতে হচ্ছে কঠিন মূল্য। অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা থেকে বঞ্চনা এবং বিশেষ করে নারীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ দেশটিকে ক্রমেই আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলছে।
যুদ্ধ থেমেছে, বদলে গেছে কাবুলের চিত্র
কাবুলের সরকারি এলাকার যে রাস্তাগুলো একসময় মানুষের কোলাহল ও গানের শব্দে মুখর থাকত, এখন সেখানে নীরবতা। পুরুষদের বড় অংশ ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও লম্বা দাড়িতে চলাফেরা করেন। দেয়ালে রঙিন চিত্রের বদলে দেখা যায় ধর্মীয় স্লোগান। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ভারী অস্ত্র নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করছেন।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্তিতে দেশটির বাস্তবতা স্পষ্ট। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তালেবানবিরোধী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। দুই দশকের সংঘাতের পর ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করলে তৎকালীন আফগান সরকার দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং তালেবান আবার ক্ষমতা দখল করে।
এরপর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তালেবানের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হয়েছে। পশ্চিমের হেরাত থেকে দক্ষিণের কান্দাহার হয়ে পূর্বের কাবুল পর্যন্ত প্রায় এক হাজার কিলোমিটার পথজুড়ে তালেবানের পতাকা, চৌকি ও প্রশাসনিক উপস্থিতি চোখে পড়ে।
শান্তির স্বস্তি আছে, কিন্তু স্বাধীনতা কমেছে
যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাওয়াকে অনেক আফগান স্বাগত জানিয়েছেন। আত্মঘাতী হামলা ও বিস্ফোরণে একসময় যেসব শহর কেঁপে উঠত, সেসব এলাকায় এখন তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ। কৃষকরা নিরাপদে পণ্য বাজারে নিতে পারছেন। পরিবার দেখতে দূরে যাওয়া সহজ হয়েছে। শিশুরাও অনেক এলাকায় নিরাপদে বিদ্যালয়ে যেতে পারছে।
তবে এই শান্তির সঙ্গে এসেছে কঠোর দমননীতি। প্রকাশ্যে সরকারের বিরোধিতা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নারীদের বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার অভিযোগও রয়েছে। হেরাতে সাম্প্রতিক এক বিক্ষোভে বহু নারী আহত হন এবং এক কিশোর নিহত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অর্থনীতিতে শান্তির সুফল পৌঁছায়নি
তালেবান সরকার কর ও অন্যান্য রাজস্ব থেকে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার আয় করছে। ২০২০ সালের তুলনায় এই আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। দুর্নীতি ও ঘুষ কমানোর পাশাপাশি শুল্ক বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির চেষ্টা করা হয়েছে।
কিন্তু বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় সেই আয় দেশের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারছে না। ২০২০ সালে মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তা ছিল প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে তা নেমে আসে প্রায় ১২০ কোটি ডলারে। চলতি বছর সহায়তা আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্য ও কল্যাণ খাতে সরকারি ব্যয় কমেছে, অন্যদিকে রাজস্বের প্রায় অর্ধেক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। ফলে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো অর্থসংকটে পড়ছে।
মাথাপিছু আয় নেমেছে, বাড়ছে ক্ষুধা
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তানের মাথাপিছু অর্থনৈতিক উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে মাথাপিছু আয় এখন প্রায় ২৩০০ ডলার, যা প্রায় দুই দশক আগের অবস্থার কাছাকাছি।
দীর্ঘস্থায়ী খরা খাদ্যসংকট আরও বাড়িয়েছে। কাবুলে পানির জন্য দীর্ঘ সারি দেখা যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু পরিবার পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে পারছে না। কারও কারও বেঁচে থাকার জন্য ঋণ করতে হচ্ছে।
পূর্ব কাবুলের পাহাড়ি এলাকার একটি গ্রামে এক প্রবীণ বাসিন্দার কথায়, দেশে শান্তি এসেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের পকেট খালি। বেকারত্ব এখন বহু পরিবারের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
পাকিস্তান ও ইরান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া লাখো মানুষ
পাকিস্তান ও ইরান থেকে প্রায় ৬০ লাখ আফগানকে জোরপূর্বক বা চাপের মুখে দেশে ফিরতে হয়েছে। তাদের অনেকেই প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় ফিরেছেন। এতে আগে থেকেই সংকটে থাকা আফগান অর্থনীতি ও সীমিত সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ইরান থেকে ফিরে আসা অনেক আফগান দেশের উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র গ্রামের বাসিন্দা। তারা বছরের একটি বড় সময় সীমান্তের ওপারে মৌসুমি কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দেশে ফিরে সেই আয়ের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
মেয়েদের শিক্ষা সবচেয়ে বড় ক্ষত
২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছিল। শহরগুলোতে মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়া ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু তালেবান মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়ায় সেই অগ্রযাত্রা থেমে গেছে।
বর্তমানে দেশটির সাক্ষরতার হার মাত্র প্রায় ৩৭ শতাংশ। মেয়েদের শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা আফগান সমাজের বড় অংশের কাছে অজনপ্রিয় হলেও সাধারণ মানুষের তা পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই।
কিছু শহরে অবশ্য ধর্মীয় বিদ্যালয়ের অনুমতির মাধ্যমে ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের পড়াশোনার সীমিত সুযোগ তৈরি হয়েছে। কাবুলের এমন একটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০০ মেয়ে পড়ছে। সেখানে গণিত, বিজ্ঞান, ভূগোল ও ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিদেশি ভাষাও শেখানো হচ্ছে।
তবে এসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রবল। তারা পড়াশোনা করলেও পরবর্তীতে কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ কতটা পাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। এক শিক্ষার্থীর ভাষায়, শুধু ঘরে বসে সন্তান লালন-পালন করা বা ধর্মীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা তাদের স্বপ্ন নয়।
ক্ষমতার কেন্দ্র কান্দাহারে
তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কাবুলের বদলে কান্দাহার থেকে ক্ষমতা পরিচালনা করছেন। তিনি জনসমক্ষে খুব কম আসেন এবং তাঁর সাম্প্রতিক ছবি নিয়েও তথ্য সীমিত।
নারীদের চলাফেরা, পোশাক, শিক্ষা ও কর্মজীবনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ তাঁর নীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর নেতৃত্বে তালেবানের সবচেয়ে রক্ষণশীল অংশের প্রভাব বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে তাঁর অনুগত কর্মকর্তাদের বসানো হয়েছে। নৈতিকতা ও সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর ওপরও তাঁর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। খনিজ সম্পদের কিছু রাজস্বের নিয়ন্ত্রণও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সংকট আরও গভীর
নারী ও পুরুষের চিকিৎসা আলাদা করার নীতি, নারী চিকিৎসকদের ওপর বিধিনিষেধ এবং নারীদের চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। হেরাতে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে মাতৃমৃত্যুর হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পাঁচ গুণ বেড়েছে বলে একটি জরিপে উঠে এসেছে।
শিক্ষিত মানুষদের দেশ ছাড়ার প্রবণতাও বাড়ছে। অনেক পরিবার মনে করছে, বর্তমান নীতিতে ভবিষ্যৎ আরও সংকুচিত হবে। ফলে চিকিৎসক, শিক্ষক, অধ্যাপকসহ দক্ষ জনশক্তির দেশত্যাগ আফগানিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
নিরাপত্তায় বড় সাফল্য তালেবানের
তালেবান সরকার নিজেদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে নিরাপত্তাকে তুলে ধরতে পারে। গত বছর সন্ত্রাসী হামলায় বেসামরিক নিহতের সংখ্যা একশর নিচে নেমে এসেছে বলে একটি তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়। ইসলামিক স্টেটের খোরাসান শাখার বিরুদ্ধে তালেবান কঠোর অভিযান চালিয়েছে। আল-কায়েদাও আফগানিস্তানে তাদের কার্যক্রম অনেকটাই কমিয়েছে।
তবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি নতুন সংকট তৈরি করেছে। পাকিস্তান অভিযোগ করছে, আফগানিস্তানে থাকা পাকিস্তানি তালেবান গোষ্ঠী দেশটিতে হামলা চালাচ্ছে এবং তালেবান সরকার তাদের আশ্রয় দিচ্ছে। এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে এবং দুই দেশের সীমান্তও বন্ধ করেছে।
এর ফলে আফগানিস্তানে খাদ্যের দাম বেড়েছে, রপ্তানি বাজারে প্রবেশ কঠিন হয়েছে এবং চিকিৎসাসেবার সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।
উন্নয়নের কিছু চিহ্নও আছে
সব সংকটের মধ্যেও অবকাঠামো উন্নয়নের কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কাবুলে সড়ক প্রশস্ত করা হচ্ছে। নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণ বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল, গ্যাসের পাইপলাইন ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
সোনা, তামা ও লিথিয়ামের মতো খনিজ সম্পদ উত্তোলনের জন্যও বিভিন্ন অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। সরকার বলছে, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বজায় থাকলে এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আফগানিস্তান ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগের বড় বাধা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা। অধিকাংশ দেশ তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। নিষেধাজ্ঞার কারণে আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
পাঁচ বছর পরও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তানে যুদ্ধ অনেকটাই কমেছে। সাধারণ মানুষের জীবনে এর সুফলও স্পষ্ট। কিন্তু নিরাপত্তার বিনিময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জনজীবনে অংশগ্রহণ প্রায় নজিরবিহীনভাবে সীমিত করা হয়েছে।
একদিকে শান্তি, অন্যদিকে ক্ষুধা, বেকারত্ব ও বিচ্ছিন্নতা—এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই পাঁচ বছর পার করেছে আফগানিস্তান।
দেশটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই শান্তিকে কি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে? নাকি কঠোর নীতি, নারীদের ওপর বিধিনিষেধ এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আফগানিস্তানকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেবে?
আফগানদের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু পাঁচ বছর পর তাদের অনেকেরই আর অপেক্ষা করার ধৈর্য নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















