০৮:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
জাম্বিয়ার তামার সমৃদ্ধি, কিন্তু মানুষের ঘরে স্বস্তি কোথায়? মক্কা চুক্তি: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা জোটে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২৬৫ মৃত্যু, উদ্ধার তৎপরতায় বৈষম্যের অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ইসলামের পতন, তবু শেষ হয়ে যায়নি মুসলিম ব্রাদারহুড ইউরোপকে এক করার অদৃশ্য কারিগর কারা? লেবার ও ব্যবসা: অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে সম্পর্ক মেরামতের নতুন সুযোগ শান্তির কথা বলাই এখন রাশিয়ায় অপরাধ, নির্বাচনের দৌড় থেকে বাদ উদারপন্থী ইয়াব্লোকো বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার আশঙ্কা: জার্মানিকে নতুন ধরনের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে শুকিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের প্রধান নদী, জ্বালানি ও শিল্পে বাড়ছে বিপদের শঙ্কা ব্যর্থতার দীর্ঘ ইতিহাস পেরিয়ে সমুদ্রশক্তি বাড়াচ্ছে ব্রাজিল

আমেরিকার বিজ্ঞানব্যবস্থায় বড় সংস্কারের ডাক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন পথের খোঁজ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট বিজ্ঞান উপদেষ্টা ভ্যানেভার বুশকে যুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার বিজ্ঞানব্যবস্থা পুনর্গঠনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বুশের সেই প্রতিবেদন ‘সায়েন্স: দ্য এন্ডলেস ফ্রন্টিয়ার’ পরবর্তী কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক গবেষণায় সরকারি সহায়তার ভিত্তি তৈরি করে। এর ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর মার্কিন অগ্রযাত্রার একটি শক্তিশালী কাঠামো।

কিন্তু প্রায় আট দশক পর সেই কাঠামোই এখন নতুন বাস্তবতার মুখে পড়েছে। মার্কিন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনীতি নিয়ে কাজ করা হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি দপ্তরের পরিচালক মাইকেল ক্রাটসিওস মনে করেন, ১৯৪৫ সালের বাস্তবতায় তৈরি গবেষণাব্যবস্থাকে একবিংশ শতকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।

বদলে গেছে বৈশ্বিক বাস্তবতা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্প ও বৈজ্ঞানিক শক্তি। ইউরোপের বড় অংশ যুদ্ধের ধ্বংসে বিপর্যস্ত হওয়ায় আমেরিকার শিল্প ও গবেষণাক্ষেত্র অভূতপূর্ব সুবিধা পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিযোগিতা সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি শিল্পকে একই লক্ষ্যে একত্র করে। এরই ফল হিসেবে চাঁদে মানুষ পাঠানোর মতো উচ্চাভিলাষী বৈজ্ঞানিক সাফল্য অর্জিত হয়।

কিন্তু সেই যুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকা এখন আর নেই। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী উন্মুক্ত বিশ্বের প্রত্যাশার জায়গা নিয়েছে তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে চীনের দ্রুত বাড়তে থাকা বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

গবেষণায় বাড়ছে ব্যয়, কমছে বড় সাফল্য

আমেরিকার বর্তমান গবেষণাব্যবস্থার আরেকটি দুর্বলতা হলো ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সাফল্যের গতি কমে যাওয়া। ১৯৯০-এর দশক থেকে জীববৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও যুগান্তকারী আবিষ্কারের হার কমেছে এবং নতুন ওষুধ অনুমোদনের সংখ্যাও অনেকটা স্থবির হয়ে আছে।

গবেষকদের একটি বড় অংশ গবেষণার পরিবর্তে প্রশাসনিক কাগজপত্র সামলাতেই বিপুল সময় ব্যয় করছেন। ফলে যে ব্যবস্থা বিজ্ঞানীদের সহায়তা করার কথা, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে নিজের প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে গবেষণার অর্থায়ন

পুরোনো ব্যবস্থায় সরকার বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে মৌলিক গবেষণার অর্থ দিত এবং পরে শিল্প খাত সেই গবেষণাকে বাণিজ্যিক প্রয়োগে রূপ দিত। কিন্তু এখন বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই মৌলিক গবেষণায় ক্রমবর্ধমান অর্থ বিনিয়োগ করছে। গত দুই দশকে মৌলিক গবেষণায় বেসরকারি অর্থায়নের অংশ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। বর্তমানে শিল্প খাত বছরে প্রায় ৩৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার মৌলিক গবেষণায় ব্যয় করছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক মৌলিক গবেষণায় সরকারি অর্থায়নের চেয়েও বেশি।

এ পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো প্রোটিনের গঠন নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বড় অগ্রগতি, যেখানে শিল্প খাতের সম্পদ ও দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিচ্ছে গবেষণার ভবিষ্যৎ

বিজ্ঞান গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারও পুরোনো কাঠামোকে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি করেছে। সঠিক গবেষণা পরিবেশের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতাকে যুক্ত করা গেলে এটি মানব ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে।

তবে পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে। তাই গবেষণায় দ্রুত অর্থায়ন, দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা এবং নতুন ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

Americans Want AI Controlled Before It Reshapes The Economy

অর্থায়নে আসছে নতুন পদ্ধতি

নতুন ব্যবস্থায় বিজ্ঞানীদের কাজের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদের অর্থায়ন চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানমূলক গবেষণার জন্য দ্রুত অনুদানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার জন্য স্থায়ী সহায়তার কথাও বলা হচ্ছে।

উদ্ভাবনী পণ্য তৈরিতে পুরস্কারভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং আগাম বাজার তৈরির নিশ্চয়তার মতো পদ্ধতিও ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে এমন গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি চালুর কথা বলা হচ্ছে, যেগুলো প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রচলিত গবেষণাগার দিয়ে যেসব প্রযুক্তিগত সমস্যা সহজে সমাধান করা যায় না, সেগুলোর জন্য নতুন ধরনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

তরুণ গবেষকদের স্বাধীনতার ওপর জোর

গবেষণাক্ষেত্রে তরুণদের দ্রুত স্বাধীনতা দেওয়ার বিষয়টিও সংস্কার পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহনযোগ্য স্নাতকোত্তর বৃত্তি এবং চার বছরের পিএইচডি কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রস্তাব রয়েছে।

একই সঙ্গে বিজ্ঞান কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণের জন্য ‘বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা’ বা মেটাসায়েন্সকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গবেষণা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও এ ধরনের বিশেষ ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন যুগের জন্য নতুন বৈজ্ঞানিক কাঠামো

জাতীয় পর্যায়ে বড় বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ সমন্বয়ের জন্য অ্যাপোলো কর্মসূচির মতো সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ‘জেনেসিস মিশন’ চালু করেন। এর লক্ষ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক পরিবেশকে প্রস্তুত করা।

ভ্যানেভার বুশের উত্তরাধিকার, কিন্তু নতুন যুগের জন্য

ক্রাটসিওসের মতে, এই পরিবর্তনের লক্ষ্য ভ্যানেভার বুশের ধারণাকে বাতিল করা নয়; বরং তাঁর মূল উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া।

সম্প্রতি তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে ‘সায়েন্স: আ নিউ গোল্ডেন এজ’ নামে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন। এটি বুশের ঐতিহাসিক প্রতিবেদনের উত্তরসূরি ও শ্রদ্ধার্ঘ্য—তবে একই সঙ্গে নতুন যুগের জন্য একটি নতুন বৈজ্ঞানিক কাঠামোর প্রস্তাব।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন প্রশ্ন শুধু কত অর্থ বিজ্ঞান গবেষণায় ব্যয় করা হবে, তা নয়। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বেসরকারি গবেষণা এবং চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানের যুগে কীভাবে সেই অর্থ, প্রতিষ্ঠান ও মেধাকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাবে—সেটিই হয়ে উঠছে ভবিষ্যৎ বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বের মূল চ্যালেঞ্জ।

জনপ্রিয় সংবাদ

জাম্বিয়ার তামার সমৃদ্ধি, কিন্তু মানুষের ঘরে স্বস্তি কোথায়?

আমেরিকার বিজ্ঞানব্যবস্থায় বড় সংস্কারের ডাক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন পথের খোঁজ

০৭:৩৫:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট বিজ্ঞান উপদেষ্টা ভ্যানেভার বুশকে যুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার বিজ্ঞানব্যবস্থা পুনর্গঠনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বুশের সেই প্রতিবেদন ‘সায়েন্স: দ্য এন্ডলেস ফ্রন্টিয়ার’ পরবর্তী কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক গবেষণায় সরকারি সহায়তার ভিত্তি তৈরি করে। এর ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর মার্কিন অগ্রযাত্রার একটি শক্তিশালী কাঠামো।

কিন্তু প্রায় আট দশক পর সেই কাঠামোই এখন নতুন বাস্তবতার মুখে পড়েছে। মার্কিন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনীতি নিয়ে কাজ করা হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি দপ্তরের পরিচালক মাইকেল ক্রাটসিওস মনে করেন, ১৯৪৫ সালের বাস্তবতায় তৈরি গবেষণাব্যবস্থাকে একবিংশ শতকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।

বদলে গেছে বৈশ্বিক বাস্তবতা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্প ও বৈজ্ঞানিক শক্তি। ইউরোপের বড় অংশ যুদ্ধের ধ্বংসে বিপর্যস্ত হওয়ায় আমেরিকার শিল্প ও গবেষণাক্ষেত্র অভূতপূর্ব সুবিধা পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিযোগিতা সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি শিল্পকে একই লক্ষ্যে একত্র করে। এরই ফল হিসেবে চাঁদে মানুষ পাঠানোর মতো উচ্চাভিলাষী বৈজ্ঞানিক সাফল্য অর্জিত হয়।

কিন্তু সেই যুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকা এখন আর নেই। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী উন্মুক্ত বিশ্বের প্রত্যাশার জায়গা নিয়েছে তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে চীনের দ্রুত বাড়তে থাকা বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

গবেষণায় বাড়ছে ব্যয়, কমছে বড় সাফল্য

আমেরিকার বর্তমান গবেষণাব্যবস্থার আরেকটি দুর্বলতা হলো ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সাফল্যের গতি কমে যাওয়া। ১৯৯০-এর দশক থেকে জীববৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও যুগান্তকারী আবিষ্কারের হার কমেছে এবং নতুন ওষুধ অনুমোদনের সংখ্যাও অনেকটা স্থবির হয়ে আছে।

গবেষকদের একটি বড় অংশ গবেষণার পরিবর্তে প্রশাসনিক কাগজপত্র সামলাতেই বিপুল সময় ব্যয় করছেন। ফলে যে ব্যবস্থা বিজ্ঞানীদের সহায়তা করার কথা, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে নিজের প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে গবেষণার অর্থায়ন

পুরোনো ব্যবস্থায় সরকার বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে মৌলিক গবেষণার অর্থ দিত এবং পরে শিল্প খাত সেই গবেষণাকে বাণিজ্যিক প্রয়োগে রূপ দিত। কিন্তু এখন বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই মৌলিক গবেষণায় ক্রমবর্ধমান অর্থ বিনিয়োগ করছে। গত দুই দশকে মৌলিক গবেষণায় বেসরকারি অর্থায়নের অংশ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। বর্তমানে শিল্প খাত বছরে প্রায় ৩৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার মৌলিক গবেষণায় ব্যয় করছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক মৌলিক গবেষণায় সরকারি অর্থায়নের চেয়েও বেশি।

এ পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো প্রোটিনের গঠন নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বড় অগ্রগতি, যেখানে শিল্প খাতের সম্পদ ও দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিচ্ছে গবেষণার ভবিষ্যৎ

বিজ্ঞান গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারও পুরোনো কাঠামোকে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি করেছে। সঠিক গবেষণা পরিবেশের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতাকে যুক্ত করা গেলে এটি মানব ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে।

তবে পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে। তাই গবেষণায় দ্রুত অর্থায়ন, দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা এবং নতুন ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

Americans Want AI Controlled Before It Reshapes The Economy

অর্থায়নে আসছে নতুন পদ্ধতি

নতুন ব্যবস্থায় বিজ্ঞানীদের কাজের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদের অর্থায়ন চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানমূলক গবেষণার জন্য দ্রুত অনুদানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার জন্য স্থায়ী সহায়তার কথাও বলা হচ্ছে।

উদ্ভাবনী পণ্য তৈরিতে পুরস্কারভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং আগাম বাজার তৈরির নিশ্চয়তার মতো পদ্ধতিও ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে এমন গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি চালুর কথা বলা হচ্ছে, যেগুলো প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রচলিত গবেষণাগার দিয়ে যেসব প্রযুক্তিগত সমস্যা সহজে সমাধান করা যায় না, সেগুলোর জন্য নতুন ধরনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

তরুণ গবেষকদের স্বাধীনতার ওপর জোর

গবেষণাক্ষেত্রে তরুণদের দ্রুত স্বাধীনতা দেওয়ার বিষয়টিও সংস্কার পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহনযোগ্য স্নাতকোত্তর বৃত্তি এবং চার বছরের পিএইচডি কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রস্তাব রয়েছে।

একই সঙ্গে বিজ্ঞান কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণের জন্য ‘বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা’ বা মেটাসায়েন্সকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গবেষণা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও এ ধরনের বিশেষ ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন যুগের জন্য নতুন বৈজ্ঞানিক কাঠামো

জাতীয় পর্যায়ে বড় বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ সমন্বয়ের জন্য অ্যাপোলো কর্মসূচির মতো সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ‘জেনেসিস মিশন’ চালু করেন। এর লক্ষ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক পরিবেশকে প্রস্তুত করা।

ভ্যানেভার বুশের উত্তরাধিকার, কিন্তু নতুন যুগের জন্য

ক্রাটসিওসের মতে, এই পরিবর্তনের লক্ষ্য ভ্যানেভার বুশের ধারণাকে বাতিল করা নয়; বরং তাঁর মূল উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া।

সম্প্রতি তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে ‘সায়েন্স: আ নিউ গোল্ডেন এজ’ নামে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন। এটি বুশের ঐতিহাসিক প্রতিবেদনের উত্তরসূরি ও শ্রদ্ধার্ঘ্য—তবে একই সঙ্গে নতুন যুগের জন্য একটি নতুন বৈজ্ঞানিক কাঠামোর প্রস্তাব।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন প্রশ্ন শুধু কত অর্থ বিজ্ঞান গবেষণায় ব্যয় করা হবে, তা নয়। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বেসরকারি গবেষণা এবং চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানের যুগে কীভাবে সেই অর্থ, প্রতিষ্ঠান ও মেধাকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাবে—সেটিই হয়ে উঠছে ভবিষ্যৎ বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বের মূল চ্যালেঞ্জ।