০৮:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
ইউরোপকে এক করার অদৃশ্য কারিগর কারা? লেবার ও ব্যবসা: অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে সম্পর্ক মেরামতের নতুন সুযোগ শান্তির কথা বলাই এখন রাশিয়ায় অপরাধ, নির্বাচনের দৌড় থেকে বাদ উদারপন্থী ইয়াব্লোকো বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার আশঙ্কা: জার্মানিকে নতুন ধরনের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে শুকিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের প্রধান নদী, জ্বালানি ও শিল্পে বাড়ছে বিপদের শঙ্কা ব্যর্থতার দীর্ঘ ইতিহাস পেরিয়ে সমুদ্রশক্তি বাড়াচ্ছে ব্রাজিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক অস্ত্র হাতে ট্রাম্প, চাপে পড়তে পারে মস্কোর জ্বালানি অর্থনীতি পাঁচ বছরে আফগানিস্তান: যুদ্ধ কমেছে, কিন্তু সংকুচিত হয়েছে মানুষের জীবন বিশেষজ্ঞের ভিড়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার প্রজ্ঞাবান মানুষ আমেরিকার বিজ্ঞানব্যবস্থায় বড় সংস্কারের ডাক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন পথের খোঁজ

চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার হুমকিতে জাপানের গোয়েন্দা ব্যবস্থায় বড় সংস্কার

জাপান অবশেষে তার দীর্ঘদিনের দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন গোয়েন্দা কাঠামো বদলানোর পথে হাঁটছে। ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি, চীনের সামরিক উত্থান, রাশিয়ার আগ্রাসী তৎপরতা এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার মধ্যে টোকিও বুঝতে পারছে—অন্যের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এই বাস্তবতায় ৩১ জুলাই জাপান নতুন ‘জাতীয় গোয়েন্দা ব্যুরো’ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর মাধ্যমে দেশটির গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, সমন্বিত ও কার্যকর করার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উদ্যোগ শুরু হলো। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে এই ব্যুরো প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নতুন জাতীয় গোয়েন্দা পরিষদ গঠনকে বৃহত্তর গোয়েন্দা সংস্কারের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন।

যুদ্ধের পর যে গোয়েন্দা কাঠামো ছড়িয়ে পড়েছিল

জাপানের গোয়েন্দা সক্ষমতার ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। বিশ শতকের শুরুতে রুশ-জাপান যুদ্ধের সময় জাপানি গোয়েন্দারা গোপন সংকেত ভাঙতে, দূরপ্রাচ্যে গুপ্তচর নিয়োগ করতে এবং ইউরোপে রুশ সাম্রাজ্যবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সহায়তা করতে সক্ষম হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জাপানের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিটগুলো গোপন অভিযান পরিচালনা করেছিল।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর সেই সাম্রাজ্যিক গোয়েন্দা কাঠামো কার্যত ভেঙে দেওয়া হয়। যুদ্ধকালীন গোপন পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের স্মৃতি সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছিল। ফলে যুদ্ধের পর একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা গড়ে তোলার যেকোনো উদ্যোগ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বাস্তবতা। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যেমন জাপান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, গোয়েন্দা ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ফলে জাপানের নিজস্ব গোয়েন্দা কার্যক্রম পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বিচার মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।

দেশটির মন্ত্রিসভা গোয়েন্দা ও গবেষণা দপ্তরকে সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল সীমিত। ফলে গোয়েন্দা তথ্য থাকলেও সেগুলো এক জায়গায় এনে দ্রুত বিশ্লেষণ করে জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহার করার সক্ষমতা ছিল দুর্বল।

এবার তথ্য এক জায়গায় এনে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায় টোকিও

নতুন জাতীয় গোয়েন্দা ব্যুরোর মূল লক্ষ্যই হলো এই বিচ্ছিন্নতা দূর করা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে সেগুলোর সমন্বিত বিশ্লেষণ তৈরি করবে নতুন প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থাৎ কোনো একটি সংস্থা আলাদা করে তথ্য সংগ্রহ করবে আর অন্য সংস্থা আলাদাভাবে তার বিশ্লেষণ করবে—এমন ব্যবস্থার পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্যকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি জাতীয় গোয়েন্দা পরিষদ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ করবে। এর ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশের গোয়েন্দা অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারবে এবং গোয়েন্দা বিশ্লেষণকে পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে।

শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, বিদেশেও বাড়বে গোয়েন্দা তৎপরতা

জাপানের পরিকল্পনা এখানেই থেমে নেই। সংস্কারের পরবর্তী ধাপে একটি শক্তিশালী গুপ্তচরবিরোধী আইন প্রণয়নের কথা ভাবা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হবে দেশের ভেতরে বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো।

একই সঙ্গে বিদেশে গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনার জন্য নতুন একটি বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ জাপান শুধু দেশের ভেতরে তথ্য সংগ্রহ ও পাল্টা গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে চায় না, বিদেশের মাটিতেও নিজস্ব মানব গোয়েন্দা সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে।

Japan's long-overdue revamp of its intelligence services

চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া বদলে দিয়েছে হিসাব

দশকের পর দশক ধরে আলোচনায় থাকা এই সংস্কার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেন এত দ্রুত এগোচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে বদলে যাওয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

চীনের সামরিক শক্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতা জাপানের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন এবং উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতাও টোকিওর নিরাপত্তা হিসাবকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে জাপানের উদ্বেগ। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করা টোকিও এখন বুঝতে পারছে, জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা শক্তিশালী করাও জরুরি।

এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে গোয়েন্দা সংস্কারকে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে সামনে এনেছেন।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমলাতন্ত্র

তবে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই জাপানের গোয়েন্দা ব্যবস্থার সব দুর্বলতা দূর হবে না। সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হতে পারে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যকার দীর্ঘদিনের কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব।

কে তথ্য সংগ্রহ করবে, কার হাতে তথ্য থাকবে, কোন সংস্থা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি প্রভাব রাখবে—এসব প্রশ্নকে ঘিরে আমলাতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা রয়েছে। এই দ্বন্দ্ব দূর করতে না পারলে নতুন কাঠামোও পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের অভ্যাস। জাপানের রাজনীতিকরা এখনো নীতিনির্ধারণে গোয়েন্দা বিশ্লেষণকে যথেষ্ট সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করেন না। ফলে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি সেই তথ্যকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে।

জাপানের ক্ষমতাসীন দল সংসদ সদস্যদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্যের অর্থ হলো, রাজনীতিকদের শুধু গোয়েন্দা তথ্য গ্রহণ করে বসে থাকলে চলবে না; দেশের নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণে সেই তথ্যকে নিজেদের সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

নতুন জাপানের নিরাপত্তা দর্শনের শুরু?

জাপানের এই উদ্যোগকে তাই কেবল একটি নতুন গোয়েন্দা সংস্থা তৈরির ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে দেশটি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন অত্যন্ত সতর্ক এবং সীমিত কাঠামোর মধ্যে ছিল, সেই জাপান এখন নিজের গোয়েন্দা সক্ষমতাকে নতুন করে সাজাতে চাইছে।

চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার অনিশ্চয়তা টোকিওকে আরও আত্মনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নতুন জাতীয় গোয়েন্দা ব্যুরো সেই পরিবর্তনের প্রথম দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

তবে এই সংস্কার কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান ও আইনের ওপর নয়। তথ্যের সমন্বয়, আমলাতান্ত্রিক দ্বন্দ্ব দূর করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদেশে কার্যকর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপরই নির্ভর করবে জাপানের নতুন গোয়েন্দা শক্তির ভবিষ্যৎ।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউরোপকে এক করার অদৃশ্য কারিগর কারা?

চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার হুমকিতে জাপানের গোয়েন্দা ব্যবস্থায় বড় সংস্কার

০৬:৫৫:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

জাপান অবশেষে তার দীর্ঘদিনের দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন গোয়েন্দা কাঠামো বদলানোর পথে হাঁটছে। ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি, চীনের সামরিক উত্থান, রাশিয়ার আগ্রাসী তৎপরতা এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার মধ্যে টোকিও বুঝতে পারছে—অন্যের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এই বাস্তবতায় ৩১ জুলাই জাপান নতুন ‘জাতীয় গোয়েন্দা ব্যুরো’ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর মাধ্যমে দেশটির গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, সমন্বিত ও কার্যকর করার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উদ্যোগ শুরু হলো। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে এই ব্যুরো প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নতুন জাতীয় গোয়েন্দা পরিষদ গঠনকে বৃহত্তর গোয়েন্দা সংস্কারের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন।

যুদ্ধের পর যে গোয়েন্দা কাঠামো ছড়িয়ে পড়েছিল

জাপানের গোয়েন্দা সক্ষমতার ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। বিশ শতকের শুরুতে রুশ-জাপান যুদ্ধের সময় জাপানি গোয়েন্দারা গোপন সংকেত ভাঙতে, দূরপ্রাচ্যে গুপ্তচর নিয়োগ করতে এবং ইউরোপে রুশ সাম্রাজ্যবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সহায়তা করতে সক্ষম হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জাপানের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিটগুলো গোপন অভিযান পরিচালনা করেছিল।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর সেই সাম্রাজ্যিক গোয়েন্দা কাঠামো কার্যত ভেঙে দেওয়া হয়। যুদ্ধকালীন গোপন পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের স্মৃতি সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছিল। ফলে যুদ্ধের পর একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা গড়ে তোলার যেকোনো উদ্যোগ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বাস্তবতা। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যেমন জাপান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, গোয়েন্দা ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ফলে জাপানের নিজস্ব গোয়েন্দা কার্যক্রম পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বিচার মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।

দেশটির মন্ত্রিসভা গোয়েন্দা ও গবেষণা দপ্তরকে সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল সীমিত। ফলে গোয়েন্দা তথ্য থাকলেও সেগুলো এক জায়গায় এনে দ্রুত বিশ্লেষণ করে জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহার করার সক্ষমতা ছিল দুর্বল।

এবার তথ্য এক জায়গায় এনে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায় টোকিও

নতুন জাতীয় গোয়েন্দা ব্যুরোর মূল লক্ষ্যই হলো এই বিচ্ছিন্নতা দূর করা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে সেগুলোর সমন্বিত বিশ্লেষণ তৈরি করবে নতুন প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থাৎ কোনো একটি সংস্থা আলাদা করে তথ্য সংগ্রহ করবে আর অন্য সংস্থা আলাদাভাবে তার বিশ্লেষণ করবে—এমন ব্যবস্থার পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্যকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি জাতীয় গোয়েন্দা পরিষদ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ করবে। এর ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশের গোয়েন্দা অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারবে এবং গোয়েন্দা বিশ্লেষণকে পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে।

শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, বিদেশেও বাড়বে গোয়েন্দা তৎপরতা

জাপানের পরিকল্পনা এখানেই থেমে নেই। সংস্কারের পরবর্তী ধাপে একটি শক্তিশালী গুপ্তচরবিরোধী আইন প্রণয়নের কথা ভাবা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হবে দেশের ভেতরে বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো।

একই সঙ্গে বিদেশে গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনার জন্য নতুন একটি বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ জাপান শুধু দেশের ভেতরে তথ্য সংগ্রহ ও পাল্টা গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে চায় না, বিদেশের মাটিতেও নিজস্ব মানব গোয়েন্দা সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে।

Japan's long-overdue revamp of its intelligence services

চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া বদলে দিয়েছে হিসাব

দশকের পর দশক ধরে আলোচনায় থাকা এই সংস্কার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেন এত দ্রুত এগোচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে বদলে যাওয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

চীনের সামরিক শক্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতা জাপানের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন এবং উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতাও টোকিওর নিরাপত্তা হিসাবকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে জাপানের উদ্বেগ। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করা টোকিও এখন বুঝতে পারছে, জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা শক্তিশালী করাও জরুরি।

এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে গোয়েন্দা সংস্কারকে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে সামনে এনেছেন।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমলাতন্ত্র

তবে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই জাপানের গোয়েন্দা ব্যবস্থার সব দুর্বলতা দূর হবে না। সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হতে পারে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যকার দীর্ঘদিনের কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব।

কে তথ্য সংগ্রহ করবে, কার হাতে তথ্য থাকবে, কোন সংস্থা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি প্রভাব রাখবে—এসব প্রশ্নকে ঘিরে আমলাতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা রয়েছে। এই দ্বন্দ্ব দূর করতে না পারলে নতুন কাঠামোও পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের অভ্যাস। জাপানের রাজনীতিকরা এখনো নীতিনির্ধারণে গোয়েন্দা বিশ্লেষণকে যথেষ্ট সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করেন না। ফলে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি সেই তথ্যকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে।

জাপানের ক্ষমতাসীন দল সংসদ সদস্যদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্যের অর্থ হলো, রাজনীতিকদের শুধু গোয়েন্দা তথ্য গ্রহণ করে বসে থাকলে চলবে না; দেশের নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণে সেই তথ্যকে নিজেদের সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

নতুন জাপানের নিরাপত্তা দর্শনের শুরু?

জাপানের এই উদ্যোগকে তাই কেবল একটি নতুন গোয়েন্দা সংস্থা তৈরির ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে দেশটি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন অত্যন্ত সতর্ক এবং সীমিত কাঠামোর মধ্যে ছিল, সেই জাপান এখন নিজের গোয়েন্দা সক্ষমতাকে নতুন করে সাজাতে চাইছে।

চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার অনিশ্চয়তা টোকিওকে আরও আত্মনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নতুন জাতীয় গোয়েন্দা ব্যুরো সেই পরিবর্তনের প্রথম দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

তবে এই সংস্কার কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান ও আইনের ওপর নয়। তথ্যের সমন্বয়, আমলাতান্ত্রিক দ্বন্দ্ব দূর করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদেশে কার্যকর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপরই নির্ভর করবে জাপানের নতুন গোয়েন্দা শক্তির ভবিষ্যৎ।