১০:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, দিনে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং ইন্দোনেশিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ৪৭, ধ্বংসস্তূপে চলছে উদ্ধার অভিযান বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট কাটাতে লাগবে অন্তত ২ বছর: অর্থমন্ত্রী বংশালে হেলমেটের গুদামে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৬ ইউনিট সুদ কমার মূল্য দিচ্ছেন সঞ্চয়কারীরা মালদ্বীপের সামুদ্রিক গবেষণা: সমুদ্রের মালিকানা যখন জ্ঞানের মালিকানায় রূপ নেয় বাজারকে অমান্য করে অর্থনীতি চালানো যায় না অব্যবহৃত জলাশয় বেকার তরুণদের ব্যবহারে দেওয়ার উদ্যোগ, মৎস্য খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনা নওগাঁয় লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত শিল্প-সেচ, কমছে চালকলের উৎপাদন ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৭০, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ৮০৫ রোগী

নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ: মানুষ স্বস্তি চায়, কিন্তু ভোগান্তি নয়

চীনের জিনান শহরের নতুন মেট্রো স্টেশনে চলন্ত সিঁড়িতে উঠলেই মনে হতে পারে, যাত্রীরা যেন ভয়ংকর কোনো ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে যাচ্ছেন। সিঁড়ির পাশে টাঙানো সতর্কবার্তায় নিষেধ করা হয়েছে ১৪ ধরনের কাজ। চলন্ত সিঁড়িতে হাঁটা যাবে না, উল্টো দিকে মুখ করা যাবে না, খেলাধুলা তো একেবারেই নয়। এর পাশাপাশি রয়েছে সাতটি নির্দেশনা—হাতল ধরে চলতে হবে, ছোট শিশুদের শক্ত করে ধরে রাখতে হবে, নরম জুতা পরলে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।

বাস্তবে অবশ্য সিঁড়িটি অন্য যেকোনো চলন্ত সিঁড়ির মতোই স্বাভাবিক। যাত্রীরা নির্বিঘ্নে ওঠানামা করছেন, আর বেশির ভাগ মানুষ সতর্কবার্তাটির দিকেও বিশেষ নজর দিচ্ছেন না। মেট্রোর প্রবেশপথের নিরাপত্তাব্যবস্থাও অনেকটা একই রকম। ধাতু শনাক্তকারী ফটক, ব্যাগ পরীক্ষা করার যন্ত্র, হাতে স্ক্যানার নিয়ে নিরাপত্তাকর্মী—সবই আছে। সন্দেহজনক কোনো বস্তু পাওয়া গেলে রাখার জন্য রয়েছে বিশাল বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী পাত্রও। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ বেশ স্বাভাবিক। এমনকি একজন হাসতে হাসতে জানিয়েছেন, ওই পাত্র কখনো ব্যবহারই করতে হয়নি।

নিরাপত্তা যখন স্বস্তি, তখন আপত্তি কম

চীনের মেট্রো ব্যবস্থায় এমন কঠোর নিরাপত্তা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। যাত্রীরা সাধারণত দ্রুত পরীক্ষা পেরিয়ে নিজেদের গন্তব্যে চলে যান। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় যখন নিরাপত্তাব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের বাধা তৈরি করে।

জুলাইয়ের শেষ দিকে দক্ষিণ চীনের শেনঝেন শহরে এমন ঘটনাই ঘটে। মেট্রো কর্তৃপক্ষ হঠাৎ নিরাপত্তা পরীক্ষা কঠোর করে দেয়। আগে যেভাবে দায়সারা হাতে স্ক্যানার চালিয়ে যাত্রীদের ছেড়ে দেওয়া হতো, এবার প্রায় প্রত্যেক যাত্রীকে সতর্কভাবে পরীক্ষা করা হয়। ব্যাগের পরীক্ষায় নির্ধারিত সীমার বেশি সিগারেটের লাইটার বা সুগন্ধির বোতল পাওয়া গেলে সেগুলো জব্দ করা হয়। ফলে স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয় এবং অনেক যাত্রীকে প্রায় আধা ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

এই কঠোরতার পেছনে ছিল বছরের শেষ দিকে শেনঝেনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোটের শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের উপস্থিত থাকার কথা। ফলে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা যেন না ঘটে, সেটিই ছিল কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।

কিন্তু মানুষের অসন্তোষ দ্রুত সামনে চলে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, সন্ত্রাসবাদের চেয়ে বরং ভিড়ের চাপে পিষ্ট হওয়ার ভয়ই তাদের বেশি। নাগরিকদের অভিযোগের পর শেনঝেন কর্তৃপক্ষও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। কয়েক দিনের মধ্যেই নিরাপত্তা পরীক্ষা কিছুটা সহজ করা হয় এবং অতিরিক্ত ধাতু শনাক্তকারী যন্ত্র বসানো হয়। ফলে যাত্রীরা আবার তুলনামূলক স্বাভাবিকভাবে মেট্রো ব্যবহার করতে পারেন।

চীনের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের অন্য এক চেহারা

এই ঘটনা চীনে নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যকার এক গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের বিষয়টি সামনে এনেছে। চীনকে বাইরে থেকে দেখলে নজরদারি, ক্যামেরা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নজরদারি এবং নানা ধরনের নিরাপত্তা তল্লাশি খুব সহজেই একটি কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক রাষ্ট্রের ছবি তুলে ধরে।

কিন্তু চীনের ভেতরে অনেক নাগরিক এসব ব্যবস্থাকে নেতিবাচকভাবে দেখেন না। বরং নিরাপত্তার জন্য ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কিছুটা মূল্য দিতে তারা প্রস্তুত। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের মধ্যে এই সমর্থন আরও স্পষ্ট। জিনানের এক বয়স্ক নারী জানিয়েছেন, এত মানুষের ভিড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা তাদের মনে স্বস্তি আনে।

এখানেই চীনের রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। দেশটিকে শুধু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি একই সঙ্গে একটি ‘নিরাপত্তা রাষ্ট্র’—যেখানে দুর্ঘটনা, অপরাধ ও দৈনন্দিন সহিংসতা ঠেকানোকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই প্রবণতার উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন নিরাপত্তার নামে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে কঠিন করে তোলে।

মানুষ নিরাপত্তা চায়, কিন্তু ঝামেলা চায় না

শেনঝেনের ঘটনা দেখিয়েছে, চীনা নাগরিকদের আপত্তি আসলে নিরাপত্তার বিরুদ্ধে নয়। আপত্তি তখনই তৈরি হয়, যখন নিরাপত্তাব্যবস্থা অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা তৈরি করে।

পরীক্ষা যদি কয়েক সেকেন্ডে শেষ হয়, মানুষ সাধারণত তা মেনে নেয়। কিন্তু একই পরীক্ষা যদি দীর্ঘ লাইনে দাঁড় করায়, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র জব্দ করে বা যাতায়াতে বড় ধরনের বিলম্ব ঘটায়, তখন মানুষের মনোভাব বদলে যেতে পারে।

চীনের শূন্য-সংক্রমণ নীতির অভিজ্ঞতাও এই বাস্তবতার বড় উদাহরণ। করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতে মানুষ কঠোর বিধিনিষেধকে অনেকাংশে মেনে নিয়েছিল। উহান শহরের দীর্ঘ অবরুদ্ধ অবস্থা কিংবা নির্দিষ্ট মানুষ ও এলাকাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখাকেও তখন বৃহত্তর নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় মূল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল।

কিন্তু ২০২২ সালের শেষ দিকে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি ও অসন্তোষ জমতে জমতে বিরল প্রতিবাদে রূপ নেয়। বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—মানুষের সমর্থন স্থায়ী ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ একসময় নিরাপত্তার প্রশ্নকে রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রশ্নে পরিণত করতে পারে।

কর্মকর্তাদের জন্য নিরাপত্তা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

চীনের কর্মকর্তাদের ওপর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাপও অত্যন্ত বেশি। দেশটির প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটি দুর্ঘটনা বা বড় ধরনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা কর্মকর্তার পদোন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একে অনেক সময় ‘এক ভোটে ভেটো’ ধরনের ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়।

শি চিনপিংয়ের শাসনামলে এই চাপ আরও বেড়েছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই শুধু কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হয় না; নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হলেও শাস্তি হতে পারে।

ফলে মেট্রো স্টেশনে পরিদর্শক দল এসে এক্স-রে যন্ত্র পরীক্ষা করে। রাস্তায় গিয়ে পুলিশি টহল ঠিকমতো চলছে কি না তা দেখা হয়। শিশুদের পরিচর্যা কেন্দ্রের সামনে হেলমেট পরা নিরাপত্তাকর্মী, কনসার্ট ও ফুটবল ম্যাচে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পুলিশ, ব্যাংক ও বিপণিবিতানে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের ঢাল—সবই এখন দৃশ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ।

জিনানের চলন্ত সিঁড়ির অতিরিক্ত সতর্কবার্তাগুলো এই প্রবণতার কিছুটা হাস্যকর উদাহরণ। যেন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে চায়, কোনো সম্ভাব্য বিপদের দায় তাদের ওপর না আসে।

নিরাপত্তারও আছে বড় অর্থনৈতিক মূল্য

এই অতিরিক্ত নিরাপত্তার আরেকটি মূল্য রয়েছে—অর্থনৈতিক মূল্য। শুধু নিরাপত্তাকর্মীদের পেছনেই মেট্রো পরিচালন বাজেটের প্রায় এক-দশমাংশ ব্যয় হতে পারে। বর্তমানে তাদের মজুরি খুব বেশি নয়। কিন্তু শ্রমশক্তি কমে গেলে ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চীনের স্থানীয় সরকারগুলো যখন ঋণের চাপে রয়েছে, তখন অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা তাদের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

অথচ চীনের মেট্রো ব্যবস্থা এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা। প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি মানুষ দেশটির মেট্রো ব্যবহার করেন, যা বিশ্বের মোট মেট্রো যাত্রীর প্রায় অর্ধেক। অথচ সেখানে বড় বা ছোট অপরাধের ঘটনা অত্যন্ত বিরল।

তাহলে এই নিরাপত্তার স্তরের পর স্তর কতটা প্রয়োজনীয়?

সব নিরাপত্তা কি সত্যিই নিরাপত্তা বাড়ায়?

চীনের মেট্রো ব্যবস্থার নিরাপত্তার কৃতিত্ব শুধু কঠোর তল্লাশি বা নিরাপত্তাকর্মীদের দেওয়া যায় না। সাধারণ মানুষের শৃঙ্খলাবোধ, নিয়ম মেনে চলার সংস্কৃতি এবং সামাজিক আচরণও বড় ভূমিকা রাখে।

অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবসময় বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী ও ব্যাগ তল্লাশি কতটা কার্যকর, সেটিও প্রশ্নের বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তাঘাট, স্টেশন ও ট্রেনে থাকা নজরদারি ক্যামেরা তুলনামূলক কম খরচে বেশি কার্যকরভাবে অপরাধ শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে পারে।

কিন্তু কর্মকর্তাদের কাছে নিরাপত্তার হিসাব কেবল কার্যকারিতার হিসাব নয়। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোনো সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে তারা সবকিছু করেছেন কি না। অর্থাৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দৃশ্যমান প্রমাণও প্রয়োজন।

এ কারণেই চলন্ত সিঁড়ির পাশে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা, স্টেশনে অতিরিক্ত তল্লাশি কিংবা জনসমাগমে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়।

শেষ পর্যন্ত চীনের অভিজ্ঞতা একটি সহজ সত্য সামনে আনে—মানুষ নিরাপত্তা পছন্দ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই নিরাপত্তা তাদের স্বাভাবিক জীবনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। নিরাপত্তা যখন স্বস্তি দেয়, তখন তা জনপ্রিয়। কিন্তু যখন নিরাপত্তার নামে অযথা অপেক্ষা, হয়রানি ও খরচ বাড়ে, তখন সেই সমর্থন দ্রুত কমে যেতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, দিনে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং

নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ: মানুষ স্বস্তি চায়, কিন্তু ভোগান্তি নয়

০৭:০১:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

চীনের জিনান শহরের নতুন মেট্রো স্টেশনে চলন্ত সিঁড়িতে উঠলেই মনে হতে পারে, যাত্রীরা যেন ভয়ংকর কোনো ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে যাচ্ছেন। সিঁড়ির পাশে টাঙানো সতর্কবার্তায় নিষেধ করা হয়েছে ১৪ ধরনের কাজ। চলন্ত সিঁড়িতে হাঁটা যাবে না, উল্টো দিকে মুখ করা যাবে না, খেলাধুলা তো একেবারেই নয়। এর পাশাপাশি রয়েছে সাতটি নির্দেশনা—হাতল ধরে চলতে হবে, ছোট শিশুদের শক্ত করে ধরে রাখতে হবে, নরম জুতা পরলে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।

বাস্তবে অবশ্য সিঁড়িটি অন্য যেকোনো চলন্ত সিঁড়ির মতোই স্বাভাবিক। যাত্রীরা নির্বিঘ্নে ওঠানামা করছেন, আর বেশির ভাগ মানুষ সতর্কবার্তাটির দিকেও বিশেষ নজর দিচ্ছেন না। মেট্রোর প্রবেশপথের নিরাপত্তাব্যবস্থাও অনেকটা একই রকম। ধাতু শনাক্তকারী ফটক, ব্যাগ পরীক্ষা করার যন্ত্র, হাতে স্ক্যানার নিয়ে নিরাপত্তাকর্মী—সবই আছে। সন্দেহজনক কোনো বস্তু পাওয়া গেলে রাখার জন্য রয়েছে বিশাল বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী পাত্রও। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ বেশ স্বাভাবিক। এমনকি একজন হাসতে হাসতে জানিয়েছেন, ওই পাত্র কখনো ব্যবহারই করতে হয়নি।

নিরাপত্তা যখন স্বস্তি, তখন আপত্তি কম

চীনের মেট্রো ব্যবস্থায় এমন কঠোর নিরাপত্তা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। যাত্রীরা সাধারণত দ্রুত পরীক্ষা পেরিয়ে নিজেদের গন্তব্যে চলে যান। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় যখন নিরাপত্তাব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের বাধা তৈরি করে।

জুলাইয়ের শেষ দিকে দক্ষিণ চীনের শেনঝেন শহরে এমন ঘটনাই ঘটে। মেট্রো কর্তৃপক্ষ হঠাৎ নিরাপত্তা পরীক্ষা কঠোর করে দেয়। আগে যেভাবে দায়সারা হাতে স্ক্যানার চালিয়ে যাত্রীদের ছেড়ে দেওয়া হতো, এবার প্রায় প্রত্যেক যাত্রীকে সতর্কভাবে পরীক্ষা করা হয়। ব্যাগের পরীক্ষায় নির্ধারিত সীমার বেশি সিগারেটের লাইটার বা সুগন্ধির বোতল পাওয়া গেলে সেগুলো জব্দ করা হয়। ফলে স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয় এবং অনেক যাত্রীকে প্রায় আধা ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

এই কঠোরতার পেছনে ছিল বছরের শেষ দিকে শেনঝেনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোটের শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের উপস্থিত থাকার কথা। ফলে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা যেন না ঘটে, সেটিই ছিল কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।

কিন্তু মানুষের অসন্তোষ দ্রুত সামনে চলে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, সন্ত্রাসবাদের চেয়ে বরং ভিড়ের চাপে পিষ্ট হওয়ার ভয়ই তাদের বেশি। নাগরিকদের অভিযোগের পর শেনঝেন কর্তৃপক্ষও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। কয়েক দিনের মধ্যেই নিরাপত্তা পরীক্ষা কিছুটা সহজ করা হয় এবং অতিরিক্ত ধাতু শনাক্তকারী যন্ত্র বসানো হয়। ফলে যাত্রীরা আবার তুলনামূলক স্বাভাবিকভাবে মেট্রো ব্যবহার করতে পারেন।

চীনের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের অন্য এক চেহারা

এই ঘটনা চীনে নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যকার এক গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের বিষয়টি সামনে এনেছে। চীনকে বাইরে থেকে দেখলে নজরদারি, ক্যামেরা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নজরদারি এবং নানা ধরনের নিরাপত্তা তল্লাশি খুব সহজেই একটি কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক রাষ্ট্রের ছবি তুলে ধরে।

কিন্তু চীনের ভেতরে অনেক নাগরিক এসব ব্যবস্থাকে নেতিবাচকভাবে দেখেন না। বরং নিরাপত্তার জন্য ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কিছুটা মূল্য দিতে তারা প্রস্তুত। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের মধ্যে এই সমর্থন আরও স্পষ্ট। জিনানের এক বয়স্ক নারী জানিয়েছেন, এত মানুষের ভিড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা তাদের মনে স্বস্তি আনে।

এখানেই চীনের রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। দেশটিকে শুধু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি একই সঙ্গে একটি ‘নিরাপত্তা রাষ্ট্র’—যেখানে দুর্ঘটনা, অপরাধ ও দৈনন্দিন সহিংসতা ঠেকানোকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই প্রবণতার উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন নিরাপত্তার নামে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে কঠিন করে তোলে।

মানুষ নিরাপত্তা চায়, কিন্তু ঝামেলা চায় না

শেনঝেনের ঘটনা দেখিয়েছে, চীনা নাগরিকদের আপত্তি আসলে নিরাপত্তার বিরুদ্ধে নয়। আপত্তি তখনই তৈরি হয়, যখন নিরাপত্তাব্যবস্থা অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা তৈরি করে।

পরীক্ষা যদি কয়েক সেকেন্ডে শেষ হয়, মানুষ সাধারণত তা মেনে নেয়। কিন্তু একই পরীক্ষা যদি দীর্ঘ লাইনে দাঁড় করায়, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র জব্দ করে বা যাতায়াতে বড় ধরনের বিলম্ব ঘটায়, তখন মানুষের মনোভাব বদলে যেতে পারে।

চীনের শূন্য-সংক্রমণ নীতির অভিজ্ঞতাও এই বাস্তবতার বড় উদাহরণ। করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতে মানুষ কঠোর বিধিনিষেধকে অনেকাংশে মেনে নিয়েছিল। উহান শহরের দীর্ঘ অবরুদ্ধ অবস্থা কিংবা নির্দিষ্ট মানুষ ও এলাকাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখাকেও তখন বৃহত্তর নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় মূল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল।

কিন্তু ২০২২ সালের শেষ দিকে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি ও অসন্তোষ জমতে জমতে বিরল প্রতিবাদে রূপ নেয়। বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—মানুষের সমর্থন স্থায়ী ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ একসময় নিরাপত্তার প্রশ্নকে রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রশ্নে পরিণত করতে পারে।

কর্মকর্তাদের জন্য নিরাপত্তা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

চীনের কর্মকর্তাদের ওপর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাপও অত্যন্ত বেশি। দেশটির প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটি দুর্ঘটনা বা বড় ধরনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা কর্মকর্তার পদোন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একে অনেক সময় ‘এক ভোটে ভেটো’ ধরনের ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়।

শি চিনপিংয়ের শাসনামলে এই চাপ আরও বেড়েছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই শুধু কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হয় না; নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হলেও শাস্তি হতে পারে।

ফলে মেট্রো স্টেশনে পরিদর্শক দল এসে এক্স-রে যন্ত্র পরীক্ষা করে। রাস্তায় গিয়ে পুলিশি টহল ঠিকমতো চলছে কি না তা দেখা হয়। শিশুদের পরিচর্যা কেন্দ্রের সামনে হেলমেট পরা নিরাপত্তাকর্মী, কনসার্ট ও ফুটবল ম্যাচে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পুলিশ, ব্যাংক ও বিপণিবিতানে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের ঢাল—সবই এখন দৃশ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ।

জিনানের চলন্ত সিঁড়ির অতিরিক্ত সতর্কবার্তাগুলো এই প্রবণতার কিছুটা হাস্যকর উদাহরণ। যেন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে চায়, কোনো সম্ভাব্য বিপদের দায় তাদের ওপর না আসে।

নিরাপত্তারও আছে বড় অর্থনৈতিক মূল্য

এই অতিরিক্ত নিরাপত্তার আরেকটি মূল্য রয়েছে—অর্থনৈতিক মূল্য। শুধু নিরাপত্তাকর্মীদের পেছনেই মেট্রো পরিচালন বাজেটের প্রায় এক-দশমাংশ ব্যয় হতে পারে। বর্তমানে তাদের মজুরি খুব বেশি নয়। কিন্তু শ্রমশক্তি কমে গেলে ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চীনের স্থানীয় সরকারগুলো যখন ঋণের চাপে রয়েছে, তখন অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা তাদের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

অথচ চীনের মেট্রো ব্যবস্থা এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা। প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি মানুষ দেশটির মেট্রো ব্যবহার করেন, যা বিশ্বের মোট মেট্রো যাত্রীর প্রায় অর্ধেক। অথচ সেখানে বড় বা ছোট অপরাধের ঘটনা অত্যন্ত বিরল।

তাহলে এই নিরাপত্তার স্তরের পর স্তর কতটা প্রয়োজনীয়?

সব নিরাপত্তা কি সত্যিই নিরাপত্তা বাড়ায়?

চীনের মেট্রো ব্যবস্থার নিরাপত্তার কৃতিত্ব শুধু কঠোর তল্লাশি বা নিরাপত্তাকর্মীদের দেওয়া যায় না। সাধারণ মানুষের শৃঙ্খলাবোধ, নিয়ম মেনে চলার সংস্কৃতি এবং সামাজিক আচরণও বড় ভূমিকা রাখে।

অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবসময় বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী ও ব্যাগ তল্লাশি কতটা কার্যকর, সেটিও প্রশ্নের বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তাঘাট, স্টেশন ও ট্রেনে থাকা নজরদারি ক্যামেরা তুলনামূলক কম খরচে বেশি কার্যকরভাবে অপরাধ শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে পারে।

কিন্তু কর্মকর্তাদের কাছে নিরাপত্তার হিসাব কেবল কার্যকারিতার হিসাব নয়। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোনো সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে তারা সবকিছু করেছেন কি না। অর্থাৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দৃশ্যমান প্রমাণও প্রয়োজন।

এ কারণেই চলন্ত সিঁড়ির পাশে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা, স্টেশনে অতিরিক্ত তল্লাশি কিংবা জনসমাগমে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়।

শেষ পর্যন্ত চীনের অভিজ্ঞতা একটি সহজ সত্য সামনে আনে—মানুষ নিরাপত্তা পছন্দ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই নিরাপত্তা তাদের স্বাভাবিক জীবনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। নিরাপত্তা যখন স্বস্তি দেয়, তখন তা জনপ্রিয়। কিন্তু যখন নিরাপত্তার নামে অযথা অপেক্ষা, হয়রানি ও খরচ বাড়ে, তখন সেই সমর্থন দ্রুত কমে যেতে পারে।