ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যিক চাপের মুখে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এমন এক কৌশল বেছে নিয়েছেন, যা দেশের ভেতরে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ট্রাম্পের পাল্টা চাপের জবাবে কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে কার্নি আপাতত আলোচনার পথ খোলা রাখতে চাইছেন। বাইরে থেকে এই নীতি দুর্বলতা বলে মনে হলেও বাস্তবতা হলো, কানাডার অর্থনীতির স্বার্থেই হয়তো এই সংযম এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।
ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি কানাডার জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। আগামী ১৯ আগস্ট থেকে নতুন করে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এই রপ্তানির পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট বার্ষিক রপ্তানির প্রায় ৫ শতাংশ।
সেতু থেকে শুরু হওয়া অস্বস্তিকর অধ্যায়
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে ডেট্রয়েট নদীর ওপর নির্মিত গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতুটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের জটিলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
প্রায় ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণে কানাডা একাই প্রায় ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার ব্যয় করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জুলাইয়ের শেষ দিকে সেতুটিতে যান চলাচল শুরু হয়। কিন্তু উদ্বোধনের আগে ট্রাম্প প্রশাসন সেতুটি চালুর বিষয়ে নানা চাপ সৃষ্টি করে।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সেতুর টোল থেকে রাজস্ব পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর পরিস্থিতির সমাধান হয়। কানাডার জন্য বিষয়টি ছিল বিব্রতকর। কারণ, যে অবকাঠামোর পুরো নির্মাণ ব্যয় কানাডা বহন করেছে, সেটির আয়েও যুক্তরাষ্ট্র অংশীদার হয়ে গেল।
কার্নি এই সমঝোতার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেও দেশে সমালোচনা থামেনি। বরং এর পরপরই ট্রাম্প কানাডা থেকে আমদানি করা বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।
ছাড় দিয়েও মিলছে না স্বস্তি
কার্নির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমস্যা এখানেই। ট্রাম্পের সঙ্গে সমঝোতার আশায় কানাডা একের পর এক ছাড় দিয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে ওয়াশিংটন থেকে প্রত্যাশিত নমনীয়তা পাওয়া যায়নি।
কানাডা মূলত মার্কিন প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরোপিত ডিজিটাল সেবা কর প্রত্যাহার করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পণ্যের ওপর পাল্টা আরোপ করা শুল্কও কমিয়েছে। অনলাইন বিনোদন সেবার ওপর আরোপিত আরেক ধরনের করও বাতিল করেছে।
কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও ট্রাম্পের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতা অপরিহার্য নয়; বরং কানাডার জন্যই এই চুক্তির গুরুত্ব বেশি।
এই বক্তব্য কানাডার জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত অস্বস্তিকর। কারণ, গত বছর প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময় কার্নি নিজেকে ট্রাম্পের চাপ মোকাবিলায় সক্ষম নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান উত্তর আমেরিকীয় বাণিজ্যচুক্তির চেয়েও কানাডার জন্য ভালো একটি সমঝোতা আদায় করবেন।
কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীতে একের পর এক ছাড়ই বেশি দৃশ্যমান।
পাল্টা শুল্ক দিলে বিপদ আরও বাড়বে
কানাডার জনগণের বড় একটি অংশ ট্রাম্পের শুল্কের জবাব দিতে চায়। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কানাডীয় নাগরিক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা উচিত।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দাবি উপেক্ষা করা কার্নির জন্য কঠিন। কারণ, জনগণের চোখে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার অর্থ দাঁড়াতে পারে দুর্বলতা। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরও কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। কানাডার গুরুত্বপূর্ণ শিল্প—গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, কাঠ ও তামা—ইতোমধ্যে বিভিন্ন শুল্কের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত। এর ওপর কানাডা যদি ব্যাপক পাল্টা শুল্ক আরোপ করে, তাহলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সংঘাত আরও গভীর হতে পারে।
এর সবচেয়ে বড় মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হবে কানাডার সাধারণ মানুষকেই। আমদানি ব্যয় বাড়বে, উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের যুক্তিও তাই—দাদাগিরির জবাবে পাল্টা আঘাত করা রাজনৈতিকভাবে তৃপ্তিদায়ক হলেও অর্থনৈতিকভাবে তা সবসময় বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
সেতুর রাজস্ব নিয়ে বিতর্কে কার্নির অস্বস্তি
গর্ডি হাও সেতুর ঘটনাটি কার্নির জন্য বিশেষভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
২০১২ সালে কানাডা সেতুটির নির্মাণে অর্থ দিতে রাজি হয়েছিল এই শর্তে যে নির্মাণ ব্যয় উঠে না আসা পর্যন্ত টোল থেকে পাওয়া পুরো আয় কানাডার কাছে থাকবে। কিন্তু নতুন সমঝোতায় সেই কাঠামো বদলে যায়।
নতুন ব্যবস্থায় পরিচালন ব্যয় বাদ দেওয়ার পর ঋণ পরিশোধের আগেই প্রথম ১৫ বছর সেতুর নিট রাজস্বের অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্র পাবে বলে প্রকাশ্যে আসে। এর ফলে কানাডার সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি কানাডীয় ডলার হতে পারে।
এ নিয়ে কার্নির বক্তব্যও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তিনি বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে সেতু নির্মাণে কানাডার ব্যয়ই অগ্রাধিকার দিয়ে ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী মহল থেকে প্রকাশিত তথ্য সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
ফলে কানাডার জনগণের কাছে বিষয়টি শুধু একটি সেতুর অর্থনৈতিক হিসাব নয়, বরং জাতীয় মর্যাদা ও দর-কষাকষির সক্ষমতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কার্নির জনপ্রিয়তায় ধাক্কা
ট্রাম্পের সঙ্গে ভালো সমঝোতা করতে পারবেন—এমন বিশ্বাস কানাডীয়দের মধ্যে কমে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে কার্নি ট্রাম্পের সঙ্গে ভালো চুক্তি করতে পারবেন—এমন আত্মবিশ্বাস প্রকাশকারী মানুষের হার আট শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।
তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্পষ্ট। কানাডীয়রা ট্রাম্পের শুল্কে ক্ষুব্ধ হলেও সবাই যে পাল্টা শুল্কের অর্থনৈতিক পরিণতি সম্পর্কে অজ্ঞ, তা নয়।
কার্নির সামনে তাই দ্বৈত চাপ। একদিকে জনগণের ক্ষোভ সামলাতে হবে, অন্যদিকে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না যা কানাডার অর্থনীতির ওপর আরও বড় আঘাত হানে।
এই অবস্থায় তিনি আলোচনার পথেই এগোচ্ছেন। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনার জন্য নিজেদের প্রতিনিধিদের সক্রিয় করেছে এবং উত্তর আমেরিকার বিদ্যমান বাণিজ্যচুক্তি দীর্ঘায়িত বা নতুনভাবে সমন্বয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রও এখন ব্যবহার করতে চান না কার্নি
কানাডার হাতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেওয়ার একটি শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে—জ্বালানি রপ্তানি।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কানাডার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে কানাডা চাইলে জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কিন্তু কার্নি আপাতত সেই পথেও যেতে চান না। কারণ এমন পদক্ষেপ শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই আঘাত করবে না; কানাডার অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ কার্নির হিসাবটি মূলত এমন—ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে পরাস্ত করার চেষ্টা করতে গিয়ে যদি কানাডার অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই বিজয়ের মূল্য হবে অত্যন্ত বেশি।
ইতিহাসও দিচ্ছে সতর্কবার্তা
কানাডার বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে ১৯৩০ সালের অভিজ্ঞতার দিকে তাকানো জরুরি।
তখন যুক্তরাষ্ট্রে স্মুট-হাওলি শুল্ক আইন পাস করা হয়েছিল। কানাডা অপেক্ষা না করে আগেভাগেই মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল। পরে বিশ্বের বহু দেশ একই পথে হাঁটে।
ফল হয়েছিল ভয়াবহ। কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্ববাণিজ্যের নামমাত্র মূল্য প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে যায় এবং মহামন্দা তার সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
ইতিহাস অবশ্য আজকের পৃথিবীর সঙ্গে হুবহু মেলে না। কিন্তু বাণিজ্যযুদ্ধের একটি মৌলিক শিক্ষা এখনও একই—এক দেশের শুল্কের জবাবে আরেক দেশের শুল্ক পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার বদলে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ট্রাম্পের চাপ যত বাড়বে, কার্নির পরীক্ষাও তত কঠিন হবে
কার্নির কৌশল তাই সহজ কোনো সমাধান নয়। তিনি একদিকে ট্রাম্পের চাপ মেনে নেওয়ার অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে চান, অন্যদিকে এমন সংঘাতেও যেতে চান না যা কানাডার অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
কানাডীয়দের কাছে তাঁর নীতি হয়তো এই মুহূর্তে যথেষ্ট দৃঢ় বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি পাল্টা লড়াইয়ে গেলে পরিস্থিতি যে আরও খারাপ হতে পারে, সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই।
তাই কার্নির সংযমকে শুধু দুর্বলতা হিসেবে দেখা ভুল হতে পারে। কখনো কখনো শক্তিশালী অবস্থান মানে প্রতিপক্ষকে আঘাত করা নয়; বরং কখন কোথায় আঘাত না করাই নিজের দেশের জন্য বেশি লাভজনক, সেটি বুঝতে পারা।
কানাডার জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই সূক্ষ্ম সীমারেখা ধরে রাখা। ট্রাম্প যদি নতুন শুল্ককে অন্য দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবহার করেন, তাহলে কানাডার অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্যান্য নেতাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠবে।
কার্নি যদি চাপের মধ্যেও সংযম ধরে রাখতে পারেন এবং শেষ পর্যন্ত কানাডার স্বার্থ রক্ষা করে একটি কার্যকর সমঝোতা আদায় করতে পারেন, তাহলে আজকের অজনপ্রিয় নীতিই ভবিষ্যতে তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















