ফ্লোরিডার রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন গভর্নর রন ডি-স্যান্টিস। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম দোদুল্যমান বা ‘সুইং স্টেট’ হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডা এখন রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। তবে আগামী গভর্নরের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর সংস্কৃতি-যুদ্ধ নয়, বরং সাধারণ মানুষের বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়।
১৮ আগস্ট ফ্লোরিডার ভোটাররা গভর্নর পদে লড়াইয়ের জন্য রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বেছে নেবেন। রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে কংগ্রেস সদস্য বায়রন ডোনাল্ডসের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। নভেম্বরে তিনি গভর্নর নির্বাচিত হলে এমন এক ফ্লোরিডার দায়িত্ব নেবেন, যা এক দশক আগের রাজ্যটির সঙ্গে অনেকটাই ভিন্ন।
মহামারির সময় বড় রাজনৈতিক মোড়
ডি-স্যান্টিসের উত্থানের পেছনে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তাঁর নিজের রাজনৈতিক কৌশল। একসময় ট্রাম্প তাঁকে ‘রন ডি-স্যাঙ্কটিমোনিয়াস’ বলে বিদ্রূপ করেছিলেন। পরে অবশ্য দুজনের সম্পর্ক অনেকটাই ঘনিষ্ঠ হয়। ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রশাসনে ফ্লোরিডার অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেয়েছেন এবং তাঁর মার-আ-লাগো অবকাশকেন্দ্র কার্যত হোয়াইট হাউসের অনানুষ্ঠানিক দক্ষিণাঞ্চলীয় সম্প্রসারণে পরিণত হয়েছে।
তবে ফ্লোরিডাকে বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডি-স্যান্টিসের নিজস্ব ভূমিকা ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ।
করোনাভাইরাস মহামারির আগে ফ্লোরিডায় ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যা রিপাবলিকানদের চেয়ে বেশি ছিল এবং নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা যেত। কিন্তু মহামারির সময় ডি-স্যান্টিস দেশের অধিকাংশ রাজ্যের বিপরীত পথে হাঁটেন। তিনি ফ্লোরিডাকে ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত রাখেন।
এরপর মাত্র দুই বছরে রাজ্যটিতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় হাজার নতুন মানুষ ফ্লোরিডায় আসছিলেন।
তবে এই সিদ্ধান্তের মূল্যও ছিল। ২০২১ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত করোনার একটি বড় ঢেউয়ের সময় ফ্লোরিডায় মাথাপিছু মৃত্যুহার জাতীয় গড়ের তিন গুণেরও বেশি ছিল। তারপরও ডি-স্যান্টিসের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়নি।
বরং নতুন বাসিন্দাদের বড় অংশই রিপাবলিকান হিসেবে নিবন্ধিত হন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা প্রার্থী সংগ্রহ ও অর্থদাতা আকর্ষণে দুর্বল হয়ে পড়ে।
একদলীয় শাসনে নীতির ঝড়
২০২২ সালে ডি-স্যান্টিস ১৯ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হন। ফ্লোরিডার ইতিহাসে কোনো রিপাবলিকান গভর্নরের জন্য এটি ছিল সবচেয়ে বড় বিজয়। একই নির্বাচনে তাঁর দল রাজ্যের সব গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচিত পদে জয় পায় এবং আইনসভায় বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
এরপর শুরু হয় ব্যাপক নীতিগত পরিবর্তন।
ডি-স্যান্টিস ছয় সপ্তাহের গর্ভপাত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেন। শিশুদের জন্য লিঙ্গ পরিবর্তনসংক্রান্ত চিকিৎসা নিষিদ্ধ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় স্কুল ভাউচার কর্মসূচিগুলোর একটি চালু করেন। রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যক্রমেও বড় পরিবর্তন আনেন।
যৌন অভিমুখ ও লিঙ্গপরিচয় নিয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করায় বিনোদন প্রতিষ্ঠান ডিজনির সঙ্গেও সংঘাতে জড়ান তিনি। এর জেরে ডিজনির বিশেষ কর-সুবিধা বাতিল করা হয়। এই সংঘাত সারা দেশের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে।
রাজ্যের রাজনৈতিক পরিচয় আরও দৃঢ় করতে ডি-স্যান্টিস আইনসভার তৈরি কংগ্রেশনাল মানচিত্র প্রত্যাখ্যান করে নিজের মানচিত্র তৈরি করেন। দুই নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট প্রসিকিউটরকে পদ থেকে সরান এবং নিজের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে আইনসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকেন।
রাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির মধ্যে ছয়জন এবং প্রায় ২০০ জন অন্যান্য বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থাতেও তাঁর ব্যাপক প্রভাব তৈরি হয়েছে।
ফ্লোরিডার এক রাজনৈতিক কৌশলবিদের ভাষায়, ডি-স্যান্টিস রাজনীতিতে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন যে কেউই তাঁর বিরাগভাজন হতে চান না।

অর্থনীতি শক্তিশালী, কিন্তু মানুষের খরচও বাড়ছে
ডি-স্যান্টিসের আমলে ফ্লোরিডার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জাতীয় গড়কে ছাড়িয়েছে। চলতি বছর রাজ্যের অর্থনীতির আকার প্রায় ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে বিশ্বের ১৪তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতির আকারে ফ্লোরিডা অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সিটাডেল ও পালান্টিরের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও তাদের সদর দপ্তর ফ্লোরিডায় স্থানান্তর করেছে।
ডি-স্যান্টিসের জনপ্রিয়তাও খুব একটা খারাপ নয়। তাঁর অনুমোদন হার ৫০ শতাংশের কিছু বেশি, যা ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের অনুমোদন হারের চেয়েও বেশি।
তবে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি বায়রন ডোনাল্ডস একেবারেই ভিন্ন ধরনের রাজনীতিক।
ব্রুকলিনে একক মায়ের কাছে বেড়ে ওঠা ডোনাল্ডস কিশোর বয়সে গাঁজা রাখার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ক্র্যাকার ব্যারেল রেস্তোরাঁর গাড়ি পার্কিং এলাকায় যিশুর প্রতি নিজেকে সমর্পণের পর তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। এরপর ব্যাংকিং খাতে কাজ করেন এবং পরে কংগ্রেসে নির্বাচিত হন।
২০২৩ সালে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের একটি বিদ্রোহের সময় কেভিন ম্যাকার্থিকে স্পিকার পদ থেকে সরানোর প্রচেষ্টায় ডোনাল্ডসের জনপ্রিয়তা বাড়ে। ট্রাম্পও তাঁর সমর্থক। গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প তাঁকে গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সংস্কৃতি-যুদ্ধের বদলে এখন মানুষের পকেট
ডি-স্যান্টিস ও ডোনাল্ডসের মধ্যে ব্যক্তিত্বের পার্থক্য থাকলেও নীতিগতভাবে তাঁদের অবস্থানে বড় কোনো ফারাক নেই। আফ্রিকান-আমেরিকান ইতিহাসের পাঠ্যক্রম সংশোধনের একটি বিষয় নিয়ে শুধু ডোনাল্ডস প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছিলেন। ওই পাঠ্যক্রমে দাসদের কিছু দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়েছিল, যা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজে লাগতে পারে—ডোনাল্ডস এই বক্তব্যকে ভুল বলে অভিহিত করেন।
তবে নতুন গভর্নরের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সংস্কৃতি বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি নয়, অর্থনৈতিক চাপ।
২০২০ সালের পর ফ্লোরিডায় বাড়ির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ এবং বিমার প্রিমিয়াম প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই বৃদ্ধি দেশের অধিকাংশ রাজ্যের তুলনায় দ্রুত। অথচ একই সময়ে মানুষের আয় বেড়েছে মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ।
ফলে ফ্লোরিডার সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ দ্রুত বাড়ছে। এই চাপের কারণে রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
ডোনাল্ডস বলছেন, তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার হবে মানুষের জন্য জীবনযাত্রাকে আরও সাশ্রয়ী করা।
এখন প্রশ্ন হলো, তিনি শুধু এই প্রতিশ্রুতি দেবেন, নাকি বাস্তবেই আবাসন, বিমা ও অন্যান্য ব্যয় কমানোর কার্যকর পথ দেখাতে পারবেন। সেটি করতে পারলে ফ্লোরিডার ওপর তাঁর প্রভাব ডি-স্যান্টিসের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















