যুক্তরাষ্ট্রে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার জনপ্রিয় পদ্ধতি সীমিত করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়েছে। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই পদ্ধতির নিয়মে বড় কোনো পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা এখন ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মার্কিন ভোটার ডাকযোগে ভোট দিয়েছিলেন। রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তারপরও ট্রাম্প ডাকযোগে ভোট বন্ধ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বারবার দাবি করেছেন, ২০২০ সালের নির্বাচনে ডাকযোগে ভোটে জালিয়াতির কারণে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। তবে এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আদালতে বড় ধাক্কা
ডাকযোগে ভোটের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেস ও আদালত—দুই জায়গাতেই নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেগুলোর কোনোটিই বড় সাফল্য পায়নি।
গত ৩১ মার্চ ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে ডাক বিভাগের মাধ্যমে ডাকযোগে ও অনুপস্থিত ভোটের ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ওই আদেশ অনুযায়ী ভোটের ব্যালট গ্রহণ ও বিতরণের ক্ষেত্রে নতুন তালিকা, নির্দিষ্ট খাম এবং নানা প্রশাসনিক যাচাই চালুর কথা বলা হয়।
কিন্তু ১১ আগস্ট ম্যাসাচুসেটসের একটি ফেডারেল আদালত নির্বাহী আদেশটির প্রধান অংশ আটকে দেন। বিচারক ইন্দিরা টালওয়ানি বলেন, নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এমন নজিরবিহীন নির্দেশনা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্বাহী বিভাগের হাতে নির্বাচনের নিয়ম সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করার সাংবিধানিক ক্ষমতাও নেই।
জটিল তালিকা ও নতুন নিয়ম
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ভোটারদের যাচাই করতে একাধিক সরকারি তালিকা তৈরির কথা রয়েছে। স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগকে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের নিয়ে অঙ্গরাজ্যভিত্তিক নাগরিক তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর অঙ্গরাজ্যগুলোকে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার যোগ্য ভোটারদের তালিকা ডাক বিভাগের কাছে পাঠাতে হবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্দিষ্ট নকশার খাম ও বিশেষ চিহ্ন এবং বারকোড ব্যবহারের নিয়ম। অনুমোদিত খাম ছাড়া পাঠানো ব্যালট কিংবা সংশ্লিষ্ট তালিকায় নাম না থাকা ভোটারের ব্যালট ডাক বিভাগ গ্রহণ বা বিতরণ করতে পারবে না—এমন ব্যবস্থাও প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই জটিল যে নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন তালিকা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করবে, তা স্পষ্ট নয়। উপরন্তু, ফেডারেল সরকার ও অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে তালিকা আদান-প্রদানের সময়সীমা নিয়েও অসামঞ্জস্য রয়েছে।
সংবিধান নিয়েও প্রশ্ন
আইনি বিতর্কের মূল জায়গা অবশ্য শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়। মার্কিন সংবিধান কংগ্রেস নির্বাচন পরিচালনার সময়, স্থান ও পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যগুলোকে দিয়েছে এবং কংগ্রেসকে এসব নিয়ম পরিবর্তনের ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্টকে নির্বাচনের নিয়ম সরাসরি নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়ার কথা সেখানে নেই।
এই কারণেই আদালত মনে করছেন, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থায় এত বড় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টে এখন সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। ২৭ জুলাই প্রশাসন আগের একটি আদালতের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আবেদন করে। পরে ১২ আগস্ট দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত আবেদনও করা হয়।
কিন্তু নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, আদালতের নীরবতা প্রশাসনের জন্য ততটাই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নির্বাচনী সময়সীমা সামনে থাকায় শেষ মুহূর্তে এত বড় পরিবর্তন কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন।
এর ওপর নতুন আরেকটি মামলায় আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তও প্রশাসনের পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এই মামলাটি করেছে।
সব অঙ্গরাজ্যেই ডাকযোগে ভোটের সুযোগ
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সব ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই কোনো না কোনোভাবে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আটটি অঙ্গরাজ্যে পুরো নির্বাচনই ডাকযোগে পরিচালিত হয়।
ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু একটি নির্বাচনী পদ্ধতিতে সামান্য পরিবর্তন নয়, বরং বহু অঙ্গরাজ্যের দীর্ঘদিনের ভোট ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।
নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞ রিক হাসেনের মতে, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ বাস্তবায়নের দিক থেকে অত্যন্ত অকার্যকর এবং চলতি শরতেই এটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
ভোটার নিবন্ধন আইনও আটকে গেছে
ডাকযোগে ভোটের পাশাপাশি ট্রাম্প নির্বাচনী ব্যবস্থায় আরও কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনও এর অংশ। তবে আগস্টের অবকাশের আগে বিলটি সিনেটে পাস হয়নি এবং এর পক্ষে সমর্থনও খুব সীমিত।
ট্রাম্প জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচন ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে নিয়ে আসার মতো আরও কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। কিন্তু এমন ব্যবস্থার কোনো সুস্পষ্ট সাংবিধানিক ভিত্তি বা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কার্যকর নজির নেই।
নিয়ম বদলের চেয়ে বড় হতে পারে অবিশ্বাস
ট্রাম্পের ডাকযোগে ভোটবিরোধী প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের নিয়ম কতটা বদলাতে পারবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আদালত, সংবিধান, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সময়ের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে চলতি নির্বাচনী চক্রে বড় পরিবর্তন আনা কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগের আরেকটি প্রভাব ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। নির্বাচনী নিয়ম নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক ও প্রেসিডেন্টের ধারাবাহিক অভিযোগ ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আরও সন্দেহ তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ, ডাকযোগে ভোট বন্ধ বা সীমিত করার উদ্যোগ সফল না হলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। নির্বাচনের নিয়ম বদলানোর পরিবর্তে মানুষের মনে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অবিশ্বাস আরও গভীর হওয়াই হয়তো এই প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় পরিণতি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















