শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন্য হাতির সংখ্যা বাড়লেও তাদের আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। নির্বিচারে গাছ কাটা, বনভূমি দখল, অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝরনা ও জলধারা শুকিয়ে যাওয়ায় হাতির খাদ্য ও পানির উৎস কমে যাচ্ছে। ফলে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হাতির পাল বন ছেড়ে লোকালয় ও কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে মানুষ ও হাতির সংঘাত যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রাণ হারাচ্ছে উভয় পক্ষই।
হাতি এখন আর শুধু পরিযায়ী নয়
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের বনাঞ্চল থেকে এশীয় হাতির পাল সীমান্ত পেরিয়ে শেরপুরের গারো পাহাড়ে আসত। একসময় তাদের মূলত পরিযায়ী বা মৌসুমি অতিথি হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে। এখন গারো পাহাড়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হাতি স্থায়ীভাবে বসবাস ও প্রজনন করছে বলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন।
প্রায় এক দশক আগে আইইউসিএনের এক জরিপে শেরপুরের বনে ১২০ থেকে ১২৫টি হাতির উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল। তখন সব হাতিকেই ভারত থেকে আসা পরিযায়ী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। বর্তমানে বন বিভাগের হিসাবে গারো পাহাড়ে হাতির সংখ্যা বেড়ে ১৮০ থেকে ২০০-তে দাঁড়িয়েছে। গত তিন বছরে এলাকায় অন্তত ৫৫টি হাতিশাবক জন্মেছে বলে কর্মকর্তাদের ধারণা। সাম্প্রতিক একটি ড্রোন জরিপে ৩৪টি হাতির একটি পালে আট থেকে ১০টি শাবকও দেখা গেছে।
শেরপুরের শ্রীবরদীর বালিজুড়ি রেঞ্জে তিনটি পালে হাতির বিচরণ দেখা গেছে। প্রতিটি পালে রয়েছে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫টি হাতি, যার মধ্যে সাত-আটটি করে শাবক রয়েছে। নালিতাবাড়ীর বাতকুচি, দাওধারা কাটাবাড়ি, বুরুংগা, কালাপানি ও মধুটিলার বিভিন্ন পালেও হাতিশাবকের উপস্থিতি মিলেছে।
১৬ বছরে ৪৭ মানুষের মৃত্যু
হাতির সংখ্যা বাড়ার ইতিবাচক দিক থাকলেও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় মানুষ ও হাতির সংঘাত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীর পাহাড়ি এলাকায় হাতি-মানুষের সংঘাতে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাতির হামলায় ঘরবাড়ি, গাছপালা, ফসলসহ কয়েক কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে ৩৫টি হাতিও মারা গেছে। অধিকাংশ হাতি গুলিতে, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কিংবা বৈদ্যুতিক ফাঁদে আটকে প্রাণ হারিয়েছে। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি শ্রীবরদীর বালিজুড়ি পাহাড়ের নিউয়াটিলা এলাকায় জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক ব্যক্তি হাতির আক্রমণে নিহত হন। এর আগে গত বছরের ৫ জুলাই নালিতাবাড়ীর কাটাবাড়ি পাহাড়ে বৈদ্যুতিক ফাঁদে মারা যায় ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী একটি মাদি হাতি।

খাদ্য-পানির সংকটেই লোকালয়ে হাতি
শেরপুর বার্ড ক্লাবের সভাপতি সুজয় মাকার জানান, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রায় ১৪০ থেকে ২৭০ কেজি খাবার এবং ২০০ থেকে ৩০০ লিটার পানি প্রয়োজন। কিন্তু বন উজাড়, জলধারা শুকিয়ে যাওয়া এবং হাতির ঐতিহ্যবাহী চলাচলের পথ দখল হয়ে যাওয়ায় প্রাণীগুলো প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বন বিভাগের হিসাবে, ৮ হাজার ৩৩০ একর আয়তনের বালিজুড়ি রেঞ্জেই বর্তমানে প্রায় ১২০টি হাতি বিচরণ করছে। তবে এতসংখ্যক হাতি টিকিয়ে রাখার মতো পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা বনটিতে নেই।
সংরক্ষণে নতুন উদ্যোগ
প্রকৃতি ও পরিবেশকর্মীরা শেরপুরের পাহাড়ি এলাকায় একটি আলাদা হাতি অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, হাতি রক্ষা করতে হলে গারো পাহাড়ের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করতে হবে।
বন বিভাগও বন পুনরুদ্ধার ও হাতির খাদ্যের জোগান বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে। বালিজুড়ি রেঞ্জে প্রায় ১১৫ হেক্টর বনভূমিতে হাতির উপযোগী খাদ্যসমৃদ্ধ বনায়ন করা হচ্ছে। হাতির গতিবিধি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা এবং সংঘাতের সময় দ্রুত সাড়া দিতে গঠন করা হয়েছে ৫৩টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম। কোথাও কোথাও সৌরবিদ্যুৎচালিত ও জৈব বেড়া ব্যবহার করা হচ্ছে।
পাহাড়ি বনে পানির সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশজুড়ে প্রায় ৪০টি কৃত্রিম জলাধার বা লেক নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়া বনভূমি উদ্ধারের কাজ চলছে।
বিশ্ব হাতি দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য, ‘হাতির জীবন রক্ষায় বিশ্বজুড়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া’। সংরক্ষণকর্মীদের বার্তা স্পষ্ট—হাতিকে শুধু মানুষের হাত থেকে রক্ষা করলেই হবে না, মানুষ ও হাতি পাশাপাশি টিকে থাকতে পারে এমন আবাসস্থলও নিশ্চিত করতে হবে।
গারো পাহাড়ের হাতির ভবিষ্যৎ তাই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে বন, খাদ্য, পানি ও তাদের প্রাচীন চলাচলের পথ কতটা রক্ষা করা যায় তার ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















