চীনের অর্থনৈতিক ইতিহাসে ঝু রোংজির নাম উচ্চারিত হয় এক বিশেষ সময়ের প্রতীক হিসেবে। তিনি ছিলেন বাস্তববাদী, স্পষ্টভাষী এবং পরিবর্তনের পক্ষে দৃঢ় এক নেতা। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি দেশটির অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার করেন এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে চীনের সম্পর্ক গভীর করার পথে বড় ভূমিকা রাখেন। ২০০১ সালে চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যুক্ত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঝু রোংজির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়। তাঁর সময়ের চীন ছিল এমন একটি দেশ, যেখানে অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরেই তুলনামূলকভাবে বেশি বিতর্ক, মতপার্থক্য ও সম্মিলিত নেতৃত্বের জায়গা ছিল। সেই চিত্র আজকের চীনের সঙ্গে অনেকটাই আলাদা। শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে ক্ষমতা অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং বেসরকারি খাতের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণও বেড়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির দরজা খুলে দিয়েছিলেন ঝু
ঝু রোংজির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি ছিল চীনকে বিশ্ব অর্থনীতির মূল প্রবাহে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা। তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘ আলোচনার পর ২০০১ সালে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয়। এর ফলে চীনা পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক বাজার আরও উন্মুক্ত হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগও দ্রুত বাড়তে থাকে। পরবর্তী দুই দশকে চীনের বাণিজ্য বিস্ফোরক গতিতে বৃদ্ধি পায়।
ঝু মনে করতেন, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া শুধু বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয় নয়। এর মাধ্যমে দেশের ভেতরেও এমন সংস্কারের চাপ তৈরি হবে, যা অর্থনীতিকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের প্রক্রিয়াকে তিনি তাই অভ্যন্তরীণ সংস্কারের একটি হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেছিলেন।
তাঁর সময়ে চীনের অর্থনীতি উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, করব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি প্রশাসন ছোট করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়।
সংস্কারের মূল্যও কম ছিল না
তবে ঝু রোংজির সংস্কার ছিল কঠিন এবং এর সামাজিক মূল্যও ছিল ব্যাপক। লোকসানে থাকা বহু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয়। এর ফলে বিপুলসংখ্যক রাষ্ট্রীয় কর্মী চাকরি হারান। ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান নাটকীয়ভাবে কমে যায়। অর্থনীতিকে দক্ষ করার জন্য নেওয়া এই পদক্ষেপ লাখো পরিবারের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। কিন্তু ঝু মনে করতেন, অকার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কেবল রাজনৈতিক কারণে টিকিয়ে রাখলে চীনের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারবে না।
তিনি দুর্নীতি ও অদক্ষ আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। যোগ্য অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়ে আসেন। তাঁর চারপাশে তৈরি হওয়া এই বিশেষজ্ঞদের একটি প্রজন্ম পরবর্তী সময়েও চীনের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে প্রভাব রেখেছিল।
সাংহাই থেকে বেইজিংয়ের ক্ষমতার কেন্দ্রে
ঝু রোংজির রাজনৈতিক উত্থানও ছিল নাটকীয়। বৈদ্যুতিক প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করার পর তিনি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ব্যবস্থায় কাজ শুরু করেন। কিন্তু মাও সে তুংয়ের আমলে রাজনৈতিকভাবে বিপাকে পড়েন এবং একসময় তাঁকে ‘ডানপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দীর্ঘ সময় তিনি রাজনৈতিক জীবনের মূল স্রোত থেকে দূরে ছিলেন এবং এমনকি খামারেও শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর তিনি পুনর্বাসিত হন। এরপর তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দ্রুত এগিয়ে যায়। ১৯৮৮ সালে তিনি সাংহাইয়ের মেয়র হন। সেখানে তিনি জিয়াং জেমিনের সঙ্গে কাজ করেন এবং নগর ও অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য নিজের সক্ষমতা দেখান।
১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন আন্দোলনের পর জিয়াং জেমিন যখন জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন, ঝু রোংজিকেও বেইজিংয়ে ডেকে নেওয়া হয়। প্রথমে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন।
একজন নেতা, যিনি নিজের মতো করে কথা বলতেন
ঝু রোংজির ব্যক্তিত্বও তাঁকে অন্য নেতাদের তুলনায় আলাদা করে তুলেছিল। তিনি আমলাতান্ত্রিক ভাষার বদলে সরাসরি কথা বলতেন। কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করতেন না এবং দুর্নীতি কিংবা অদক্ষতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতেন।
এই কারণেই সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘বস ঝু’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন চীনের নেতৃত্বে একাধিক শক্তিশালী ব্যক্তির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ছিল এবং অর্থনৈতিক নীতিতে মতবিনিময়ের সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
আজকের চীনে কেন ঝু রোংজির মতো নেতা অচিন্তনীয়
ঝু রোংজির উত্তরাধিকারকে আজকের চীনের সঙ্গে তুলনা করলে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি দেখা যায় নেতৃত্বের কাঠামোয়।
ঝু যে সময়ে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি ছিল বেশি দৃশ্যমান। প্রধানমন্ত্রীও অর্থনৈতিক নীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন।
শি জিনপিংয়ের আমলে সেই কাঠামো অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে। শি নিজের হাতে দলের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সামরিক ক্ষমতারও বড় অংশ কেন্দ্রীভূত করেছেন। তাঁর সময়ে ঝু রোংজির সময়কার অনেক অর্থনৈতিক সংস্কারের উত্তরাধিকারী কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বেসরকারি ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণও জোরদার হয়েছে।
ফলে আজ এমন একজন প্রধানমন্ত্রীর কথা কল্পনা করা কঠিন, যিনি ঝু রোংজির মতো স্বাধীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রাখবেন। বর্তমান ব্যবস্থায় চূড়ান্ত কর্তৃত্ব এক ব্যক্তির কাছেই কেন্দ্রীভূত—এটাই ঝু রোংজির যুগের সঙ্গে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
ঝু রোংজির উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বৈত মূল্যায়ন
ঝু রোংজির সংস্কারকে একদিকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। বিশ্ব বাণিজ্যে চীনের প্রবেশ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তাঁর নীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
অন্যদিকে, তাঁর সংস্কারের কিছু সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে নতুন সমস্যার ভিত্তিও তৈরি করেছে। রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যাপক পুনর্গঠন, আঞ্চলিক সরকারের অর্থনৈতিক চাপ এবং রপ্তানি ও বৈদেশিক বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেল ভবিষ্যতে চীনের অর্থনীতিতে নানা ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে।
তবু ঝু রোংজিকে বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁর বাস্তববাদ। তিনি অর্থনীতিকে মতাদর্শের চেয়ে বাস্তব ফলাফলের দিক থেকে দেখতেন। বিশ্ব অর্থনীতির দরজা খুলে দিলে চীন লাভবান হবে—এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
আজকের চীন অনেক বেশি শক্তিশালী, ধনী এবং বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাবশালী। কিন্তু সেই চীনের নেতৃত্বের ধরন ঝু রোংজির সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত। তাই ঝু রোংজির জীবন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর গল্প নয়; এটি চীনের অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের দীর্ঘ যাত্রারও প্রতিচ্ছবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















