০৭:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
ফ্লোরিডাকে বদলে দিয়েছেন ডি-স্যান্টিস, এবার বড় পরীক্ষা জীবনযাত্রার ব্যয় গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চাইল পোশাক রপ্তানিকারকরা ট্রাম্পের শুল্কচাপে কানাডা: নরম কৌশলই কি মার্ক কার্নির সবচেয়ে বড় শক্তি? গ্যাস সংকট কাটাতে আরও দুই বছর, শিল্পখাতে স্বস্তি কবে? ওয়াশিংটন বৈঠক: নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ কি সংকটের মুখে? নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ: মানুষ স্বস্তি চায়, কিন্তু ভোগান্তি নয় একের পর এক ধাক্কা: নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আসিয়ান কতটা প্রস্তুত? চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার হুমকিতে জাপানের গোয়েন্দা ব্যবস্থায় বড় সংস্কার ইউক্রেনকে সাহায্যে শুল্ক নয়, দরকার আরও কার্যকর মার্কিন কৌশল ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ফেরানোর পথে আমেরিকার নতুন কৌশল

ইরান যুদ্ধ ও আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষয়: বিশ্ব কেন এখন বিকল্প নিরাপত্তা খুঁজছে

সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এমন এক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও প্রায় অকল্পনীয় মনে হতো। সৌদি আরব ও তুরস্ক—যারা দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক নানা ইস্যুতে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী—এখন পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে এমন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে, যেখানে এক দেশের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

এই পরিবর্তনকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ হিসেবে দেখলে এর গভীর তাৎপর্য ধরা পড়বে না। এর পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বের আস্থা কতটা অবশিষ্ট আছে?

মূল বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক আচরণের চেয়েও বড়। ইরান যুদ্ধ এবং তার আশপাশের ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতা কয়েক দশকে গড়ে তুলেছিল, তা দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। আর মিত্র দেশগুলো যখন কোনো পরাশক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারে না, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে শুরু করে।

বিশ্বাসযোগ্যতা যখন কৌশলগত সম্পদ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় আট দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে বিশ্বব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করেনি। তার শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল পূর্বানুমানযোগ্যতা। মিত্ররা জানত, ওয়াশিংটনের দেওয়া নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি সরকার বদলালেও মোটামুটি স্থায়ী থাকবে। প্রতিপক্ষরাও বুঝত, যুক্তরাষ্ট্র কোনো হুমকি দিলে সেটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা নিরাপদ নয়।

অবশ্যই এই ব্যবস্থা কখনো নিখুঁত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র বহু প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি, ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে নিজের স্বার্থকে মিত্রদের প্রত্যাশার ওপরে স্থান দিয়েছে। তবু একটি মৌলিক ধারণা টিকে ছিল—আমেরিকার কথার একটি মূল্য আছে।

সমস্যা শুরু হয় যখন মিত্র ও প্রতিপক্ষ কেউই নিশ্চিত হতে পারে না, আজকের ঘোষণা আগামীকালও একই অর্থ বহন করবে কি না।

ইরান ইস্যুতে এই অনিশ্চয়তা বিশেষভাবে স্পষ্ট। ট্রাম্প বহুবার বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা খুব কাছাকাছি। এমন ঘোষণার সংখ্যা এত বেড়েছে যে সেগুলোকে আর নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ সাম্প্রতিক এক ইরানি সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনায় কার্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বার্তা শুধু সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি করে না। মিত্র সরকারগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের সময় এসব হিসাবের মধ্যে রাখতে বাধ্য হয়।

ইউরোপের উদ্বেগও একই জায়গায়

ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়েও একই ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। জার্মানি থেকে হাজার হাজার মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা, পোল্যান্ডে নতুন সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা বাতিল, এরপর আবার পোল্যান্ডে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর ঘোষণা—এই ধারাবাহিকতা ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের জন্য সহজ পরিস্থিতি নয়।

একজন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী যদি আগামী দশ বছরের সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করতে চান, তাহলে তাকে জানতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা কোথায় থাকবে, কোন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন মিত্রদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে এবং কোন প্রতিশ্রুতি কতদিন টিকে থাকবে। এসব প্রশ্নের উত্তর যদি রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে দ্রুত বদলে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কঠিন হয়ে পড়ে।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সেখানে ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’-এর কথা বললেও জাহাজ চলাচলের তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন ১৩০টির বেশি জাহাজ চলাচল করত, সাম্প্রতিক এক দিনে সেই সংখ্যা ১৪-তে নেমে আসে।

কথা ও বাস্তবতার এই ব্যবধানই শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন তৈরি করে।

How the Iran war will change the Middle East | Brookings

বিশ্ব এখন নিজের ‘বীমা’ তৈরি করছে

যখন কোনো দেশ মনে করে একটি পরাশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তখন তার সবচেয়ে যুক্তিসংগত প্রতিক্রিয়া হলো বিকল্প তৈরি করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলোকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা যায়।

ডেনমার্ক মার্কিন প্যাট্রিয়টের পরিবর্তে ফ্রান্স ও ইতালির যৌথভাবে তৈরি এসএএমপি/টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেছে নিয়েছে। কানাডা তার এফ-৩৫ কেনার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে। ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের অস্ত্রশিল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ইউরোপীয় ন্যাটো দেশগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে এসেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষাতেও তুলনামূলক কম খরচের ব্যবস্থা সরবরাহ করছে।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নির্ভরতা কমানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ক্লাউড সেবা ইউরোপীয় সরবরাহকারীর কাছে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমে।

আর মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা সমঝোতা এই বৃহত্তর প্রবণতার আরেকটি উদাহরণ।

এর কোনোটিই এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ইঙ্গিত নয়। বরং এগুলো হলো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপ। যে দেশগুলো দীর্ঘদিন আমেরিকার ওপর নির্ভর করেছে, তারা এখন নিজেদের হাতে অতিরিক্ত বিকল্প রাখতে চাইছে।

জোটে অনিশ্চয়তা আনুগত্য বাড়ায় না

পরাশক্তির ধারণা অনেক সময় ভুলভাবে এমনভাবে দেখা হয় যে, ছোট বা মাঝারি শক্তিগুলো তার নির্দেশ মেনে চলবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একটি শক্তিশালী মিত্র যদি নিয়মিতভাবে নিজের অবস্থান বদলায়, তাহলে অন্য দেশগুলো আরও অনুগত হওয়ার বদলে আরও স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করে।

শুল্কনীতির ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। কোনো দেশ যদি মনে করে সমঝোতা করলেই বাণিজ্যিক চাপ শেষ হবে, কিন্তু কিছুদিন পর আবার নতুন শুল্কের হুমকি আসতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে শুধু ছাড় দেওয়ার নীতি অর্থহীন হয়ে পড়ে। তখন তারা নিজেদের বাজার, সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করবে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই মনস্তত্ত্ব কাজ করে। একটি দেশের নিরাপত্তা যদি অন্য দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তবে অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রণোদনাও বাড়ে।

এমনকি ইসরায়েলের মতো ঘনিষ্ঠ মার্কিন মিত্রও ওয়াশিংটনের প্রতিটি প্রস্তাবকে আগের মতো গুরুত্ব দিচ্ছে না। গাজা নিয়ে ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনাকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দ্রুত প্রত্যাখ্যান দেখিয়ে দেয়, অতীতের বহু ঘোষণা ও পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা স্থায়ী হয়েছে, সেটিও মিত্ররা হিসাব করে দেখছে।

পরাশক্তির পতন সবসময় যুদ্ধ দিয়ে আসে না

ইতিহাসে বড় শক্তির দুর্বলতা অনেক সময় কোনো একটি যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে আরেকটি ধীরগতির পতন সম্ভব—যখন অন্য দেশগুলো নীরবে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থেকে সেই পরাশক্তিকে ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে সরিয়ে দিতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিগুলোর শীর্ষে। তার রয়েছে বিশাল পুঁজিবাজার, উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী মিত্রজোট এবং বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের অসাধারণ প্রভাব। এসব ক্ষমতা রাতারাতি হারিয়ে যাবে না।

কিন্তু সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের মতো বিশ্বাসযোগ্যতাও একটি কৌশলগত সম্পদ। পার্থক্য হলো, অস্ত্র কেনা যায়, সেনা মোতায়েন করা যায়, অর্থনৈতিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা যায়; কিন্তু আস্থা তৈরি করতে প্রজন্ম লেগে যেতে পারে। আর সেই আস্থা নষ্ট হতে সময় লাগে অনেক কম।

কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ফ্রান্সে তাঁর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন অ্যাচেসনকে পাঠিয়েছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গলকে কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকার প্রমাণ দেখাতে। অ্যাচেসন ছবি নিয়ে গেলেও দ্য গল সেগুলো দেখার প্রয়োজন মনে করেননি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথাই তাঁর কাছে যথেষ্ট ছিল।

আজকের পৃথিবীতে এমন দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন।

এটাই আসল সতর্কবার্তা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা হয়তো এখনও বিপুল, কিন্তু বিশ্বের দেশগুলো যদি ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেয় যে তাদের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও কূটনীতি এককভাবে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়, তাহলে আমেরিকার প্রভাব কমতে শুরু করবে—কোনো বড় যুদ্ধ বা নাটকীয় পরাজয় ছাড়াই।

পরাশক্তির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত তাই হয়তো তখনই আসে, যখন অন্যরা প্রকাশ্যে তাকে প্রত্যাখ্যান করে না; বরং নীরবে নিজেদের বিকল্প তৈরি করতে শুরু করে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ফ্লোরিডাকে বদলে দিয়েছেন ডি-স্যান্টিস, এবার বড় পরীক্ষা জীবনযাত্রার ব্যয়

ইরান যুদ্ধ ও আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষয়: বিশ্ব কেন এখন বিকল্প নিরাপত্তা খুঁজছে

০৬:১৮:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এমন এক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও প্রায় অকল্পনীয় মনে হতো। সৌদি আরব ও তুরস্ক—যারা দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক নানা ইস্যুতে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী—এখন পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে এমন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে, যেখানে এক দেশের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

এই পরিবর্তনকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ হিসেবে দেখলে এর গভীর তাৎপর্য ধরা পড়বে না। এর পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বের আস্থা কতটা অবশিষ্ট আছে?

মূল বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক আচরণের চেয়েও বড়। ইরান যুদ্ধ এবং তার আশপাশের ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতা কয়েক দশকে গড়ে তুলেছিল, তা দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। আর মিত্র দেশগুলো যখন কোনো পরাশক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারে না, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে শুরু করে।

বিশ্বাসযোগ্যতা যখন কৌশলগত সম্পদ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় আট দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে বিশ্বব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করেনি। তার শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল পূর্বানুমানযোগ্যতা। মিত্ররা জানত, ওয়াশিংটনের দেওয়া নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি সরকার বদলালেও মোটামুটি স্থায়ী থাকবে। প্রতিপক্ষরাও বুঝত, যুক্তরাষ্ট্র কোনো হুমকি দিলে সেটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা নিরাপদ নয়।

অবশ্যই এই ব্যবস্থা কখনো নিখুঁত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র বহু প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি, ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে নিজের স্বার্থকে মিত্রদের প্রত্যাশার ওপরে স্থান দিয়েছে। তবু একটি মৌলিক ধারণা টিকে ছিল—আমেরিকার কথার একটি মূল্য আছে।

সমস্যা শুরু হয় যখন মিত্র ও প্রতিপক্ষ কেউই নিশ্চিত হতে পারে না, আজকের ঘোষণা আগামীকালও একই অর্থ বহন করবে কি না।

ইরান ইস্যুতে এই অনিশ্চয়তা বিশেষভাবে স্পষ্ট। ট্রাম্প বহুবার বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা খুব কাছাকাছি। এমন ঘোষণার সংখ্যা এত বেড়েছে যে সেগুলোকে আর নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ সাম্প্রতিক এক ইরানি সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনায় কার্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বার্তা শুধু সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি করে না। মিত্র সরকারগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের সময় এসব হিসাবের মধ্যে রাখতে বাধ্য হয়।

ইউরোপের উদ্বেগও একই জায়গায়

ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়েও একই ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। জার্মানি থেকে হাজার হাজার মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা, পোল্যান্ডে নতুন সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা বাতিল, এরপর আবার পোল্যান্ডে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর ঘোষণা—এই ধারাবাহিকতা ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের জন্য সহজ পরিস্থিতি নয়।

একজন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী যদি আগামী দশ বছরের সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করতে চান, তাহলে তাকে জানতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা কোথায় থাকবে, কোন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন মিত্রদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে এবং কোন প্রতিশ্রুতি কতদিন টিকে থাকবে। এসব প্রশ্নের উত্তর যদি রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে দ্রুত বদলে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কঠিন হয়ে পড়ে।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সেখানে ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’-এর কথা বললেও জাহাজ চলাচলের তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন ১৩০টির বেশি জাহাজ চলাচল করত, সাম্প্রতিক এক দিনে সেই সংখ্যা ১৪-তে নেমে আসে।

কথা ও বাস্তবতার এই ব্যবধানই শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন তৈরি করে।

How the Iran war will change the Middle East | Brookings

বিশ্ব এখন নিজের ‘বীমা’ তৈরি করছে

যখন কোনো দেশ মনে করে একটি পরাশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তখন তার সবচেয়ে যুক্তিসংগত প্রতিক্রিয়া হলো বিকল্প তৈরি করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলোকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা যায়।

ডেনমার্ক মার্কিন প্যাট্রিয়টের পরিবর্তে ফ্রান্স ও ইতালির যৌথভাবে তৈরি এসএএমপি/টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেছে নিয়েছে। কানাডা তার এফ-৩৫ কেনার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে। ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের অস্ত্রশিল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ইউরোপীয় ন্যাটো দেশগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে এসেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষাতেও তুলনামূলক কম খরচের ব্যবস্থা সরবরাহ করছে।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নির্ভরতা কমানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ক্লাউড সেবা ইউরোপীয় সরবরাহকারীর কাছে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমে।

আর মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা সমঝোতা এই বৃহত্তর প্রবণতার আরেকটি উদাহরণ।

এর কোনোটিই এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ইঙ্গিত নয়। বরং এগুলো হলো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপ। যে দেশগুলো দীর্ঘদিন আমেরিকার ওপর নির্ভর করেছে, তারা এখন নিজেদের হাতে অতিরিক্ত বিকল্প রাখতে চাইছে।

জোটে অনিশ্চয়তা আনুগত্য বাড়ায় না

পরাশক্তির ধারণা অনেক সময় ভুলভাবে এমনভাবে দেখা হয় যে, ছোট বা মাঝারি শক্তিগুলো তার নির্দেশ মেনে চলবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একটি শক্তিশালী মিত্র যদি নিয়মিতভাবে নিজের অবস্থান বদলায়, তাহলে অন্য দেশগুলো আরও অনুগত হওয়ার বদলে আরও স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করে।

শুল্কনীতির ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। কোনো দেশ যদি মনে করে সমঝোতা করলেই বাণিজ্যিক চাপ শেষ হবে, কিন্তু কিছুদিন পর আবার নতুন শুল্কের হুমকি আসতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে শুধু ছাড় দেওয়ার নীতি অর্থহীন হয়ে পড়ে। তখন তারা নিজেদের বাজার, সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করবে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই মনস্তত্ত্ব কাজ করে। একটি দেশের নিরাপত্তা যদি অন্য দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তবে অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রণোদনাও বাড়ে।

এমনকি ইসরায়েলের মতো ঘনিষ্ঠ মার্কিন মিত্রও ওয়াশিংটনের প্রতিটি প্রস্তাবকে আগের মতো গুরুত্ব দিচ্ছে না। গাজা নিয়ে ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনাকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দ্রুত প্রত্যাখ্যান দেখিয়ে দেয়, অতীতের বহু ঘোষণা ও পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা স্থায়ী হয়েছে, সেটিও মিত্ররা হিসাব করে দেখছে।

পরাশক্তির পতন সবসময় যুদ্ধ দিয়ে আসে না

ইতিহাসে বড় শক্তির দুর্বলতা অনেক সময় কোনো একটি যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে আরেকটি ধীরগতির পতন সম্ভব—যখন অন্য দেশগুলো নীরবে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থেকে সেই পরাশক্তিকে ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে সরিয়ে দিতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিগুলোর শীর্ষে। তার রয়েছে বিশাল পুঁজিবাজার, উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী মিত্রজোট এবং বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের অসাধারণ প্রভাব। এসব ক্ষমতা রাতারাতি হারিয়ে যাবে না।

কিন্তু সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের মতো বিশ্বাসযোগ্যতাও একটি কৌশলগত সম্পদ। পার্থক্য হলো, অস্ত্র কেনা যায়, সেনা মোতায়েন করা যায়, অর্থনৈতিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা যায়; কিন্তু আস্থা তৈরি করতে প্রজন্ম লেগে যেতে পারে। আর সেই আস্থা নষ্ট হতে সময় লাগে অনেক কম।

কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ফ্রান্সে তাঁর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন অ্যাচেসনকে পাঠিয়েছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গলকে কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকার প্রমাণ দেখাতে। অ্যাচেসন ছবি নিয়ে গেলেও দ্য গল সেগুলো দেখার প্রয়োজন মনে করেননি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথাই তাঁর কাছে যথেষ্ট ছিল।

আজকের পৃথিবীতে এমন দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন।

এটাই আসল সতর্কবার্তা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা হয়তো এখনও বিপুল, কিন্তু বিশ্বের দেশগুলো যদি ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেয় যে তাদের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও কূটনীতি এককভাবে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়, তাহলে আমেরিকার প্রভাব কমতে শুরু করবে—কোনো বড় যুদ্ধ বা নাটকীয় পরাজয় ছাড়াই।

পরাশক্তির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত তাই হয়তো তখনই আসে, যখন অন্যরা প্রকাশ্যে তাকে প্রত্যাখ্যান করে না; বরং নীরবে নিজেদের বিকল্প তৈরি করতে শুরু করে।