ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার মার্কিন উদ্যোগ শুরুতে যতটা অনিশ্চিত মনে হয়েছিল, এখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ততটাই আশাব্যঞ্জক হয়ে উঠছে। দেশটির স্বৈরশাসক নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ নিয়ে বেশি আগ্রহ দেখালেও দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব কমই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মাদুরোর সাবেক সহযোগী দেলসি রদ্রিগেজকে দায়িত্ব দেওয়ায় আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, পুরোনো দমনমূলক শাসনব্যবস্থাই হয়তো নতুন রূপে টিকে থাকবে।
তবে এখন সেই আশঙ্কার বিপরীতে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। লাতিন আমেরিকার বামপন্থী স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে রুবিওর আগ্রহ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন তাঁকে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরির চেষ্টা চলছে।
আলোচনায় প্রথম অগ্রগতি
১২ আগস্ট ভেনেজুয়েলার সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে প্রথম দফার আলোচনা শেষ হয়েছে। সেখানে বিচারব্যবস্থার সংস্কার, বিশেষ করে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের পরিবর্তন নিয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে। এই আলোচনা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সংস্কারের পথ খুলে দিতে পারে।
আলোচনা অব্যাহত থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যে এমন কিছু সংস্কার সম্ভব হতে পারে, যা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করবে। তবে এই অগ্রগতির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রুবিও নিজে বিরোধী পক্ষের প্রধান আলোচক দিনোরাহ ফিগুয়েরার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন। তাঁর দলের সদস্যরা মার্কিন নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করছেন।
গণতন্ত্রে আগ্রহ ভেনেজুয়েলাবাসীর
মাদুরোর শাসনে স্বাধীনতা ও অর্থনীতি—দুই ক্ষেত্রেই সংকটের মুখোমুখি হওয়া ভেনেজুয়েলার বিপুলসংখ্যক মানুষ গণতান্ত্রিক পরিবর্তন চান। সফলভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে সেটি ট্রাম্পের জন্যও লাভজনক হতে পারে।
ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের অবহেলিত তেলক্ষেত্রগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। আর স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া সেই বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন। তাই গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা হলে দেশটির অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
তবে পথে বাধাও কম নয়। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী অতীতে অবাধ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা বাস্তবায়ন করেনি। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতায় পরিচালিত বিরোধী পক্ষকে সাধারণ মানুষের একটি অংশ আমেরিকার অনুগত শক্তি হিসেবে দেখার আশঙ্কাও রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তেল আয়ের বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও সাধারণ মানুষ এখনো সেই অর্থের সুফল খুব বেশি দেখতে পাচ্ছেন না। আলোচনায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে শাসকগোষ্ঠী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ পাবে এবং বিরোধী পক্ষও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
২০২৭ সালেই নির্বাচন চায় যুক্তরাষ্ট্র
এই পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলায় ২০২৭ সালেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ দেওয়া উচিত বলে মত রয়েছে। এর জন্য পর্যাপ্ত সময় রয়েছে। অতীতে পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি সাবেক সোভিয়েত-নিয়ন্ত্রিত দেশও এক বছরের মধ্যে অবাধ নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছিল।
নির্বাচনের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলার তেল থেকে কত অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে, তার কতটা দেশটিতে ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং কোন কোন নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থ বিতরণে বাধা তৈরি হচ্ছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই দেশের তেল আয়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাবে—এমন নিশ্চয়তাও প্রয়োজন।
মারিয়া কোরিনা মাচাদোর প্রত্যাবর্তন জরুরি
বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর দ্রুত দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনায় শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা সহজ করতে তাঁকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন তাঁকে নির্বাসনে রাখা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
কারণ সম্ভাব্য সমঝোতার কিছু শর্ত, যেমন শাসকগোষ্ঠীর সদস্যদের নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ, পরবর্তী সময়ে মাচাদো প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার রাজনীতি চান না বলে জানালেও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দেশে তাঁর উপস্থিতি থাকলে আরেকটি বড় আশঙ্কাও কিছুটা কমবে—ট্রাম্পের নীতির অনিশ্চয়তা। ট্রাম্প কখনো ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন, আবার কখনো দেশটির তেলসম্পদকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গতি
এই মুহূর্তে ট্রাম্প রুবিওকে অপেক্ষাকৃত উদার ও গণতান্ত্রিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু মার্কিন নীতিতে হঠাৎ পরিবর্তন এলে ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক রূপান্তর আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
তাই দ্রুত নির্বাচনী রোডম্যাপ তৈরি, তেল আয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সব গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী শক্তিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করাই হতে পারে ভেনেজুয়েলার স্থায়ী গণতন্ত্রের ভিত্তি। শেষ পর্যন্ত এই পরিবর্তন কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, ভেনেজুয়েলার বিরোধী শক্তির ঐক্য এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















