চীনে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়লেও চিকিৎসা ও পরামর্শসেবা এখনো সবার নাগালের মধ্যে আসেনি। দীর্ঘদিনের সামাজিক সংকোচ, চিকিৎসকের ঘাটতি, অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারি পরামর্শসেবা এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার কারণে দেশটির কোটি কোটি মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগলেও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না।
চীনের দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং কর্মজীবনের চাপ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালে দেশটিতে প্রায় ১৯ কোটি ১০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় প্রতি সাতজনের একজন মানসিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছিলেন।
গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের তুলনায় মানসিক রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি হিসাবের মধ্যে রাখলেও মানসিক রোগের প্রকোপ বেড়েছে প্রায় ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ। গবেষকেরা মনে করছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ এই হিসাব অনেক ক্ষেত্রে সীমিত তথ্য ও রোগ নির্ণয়ের ওপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়েছে।
উদ্বেগ ও বিষণ্নতা সবচেয়ে বেশি
চীনে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে গত কয়েক দশকে খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক সমস্যার দ্রুত বিস্তারও বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করছে। মানসিক রোগ নিয়ে সামাজিক লজ্জা ও অস্বস্তি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নেওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে ছিল।
৩৩ বছর বয়সী মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতা শিয়াও ইয়াও জানান, তার প্রায় অর্ধেক রোগী—যাদের বেশির ভাগই ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারী—পরিবারের কাছে পরামর্শ নেওয়ার কথা গোপন রাখেন। কারণ বয়স্ক প্রজন্মের অনেকেই মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। তারা মনে করেন, এটি হয়তো সাময়িক মন খারাপ কিংবা অতিরিক্ত চিন্তার ফল।
তবে এই মানসিকতার পরিবর্তন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে করোনাভাইরাস মহামারির সময় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চীনা সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অনিশ্চয়তার কারণে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা বেড়ে যায়। একই সঙ্গে মানুষ নিজের মানসিক সমস্যাকে স্বীকার করা এবং অন্যের সমস্যার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার দিকেও এগিয়ে যায়।
মহামারির পর অনলাইন পরামর্শসেবার বিস্তার
মহামারির সময় অনেক চীনা নাগরিক জীবনে প্রথমবারের মতো মানসিক পরামর্শ নেন। সরাসরি চিকিৎসকের কাছে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় অনলাইনভিত্তিক পরামর্শ ও স্বনির্ভর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এখন কোটি কোটি মানুষ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে মানসিক পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও স্বনির্ভরতার নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি সরকারি বিনামূল্যের সহায়তাও বাড়ছে। ২০২৫ সালে মানসিক সহায়তার জন্য চালু করা সরকারি হটলাইনে সাত লাখের বেশি ফোন আসে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই সেই সংখ্যা প্রায় নয় লাখে পৌঁছেছে।
তারপরও চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, বিষণ্নতায় আক্রান্ত চীনা নাগরিকদের মাত্র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো ধরনের চিকিৎসা পেয়েছেন। পর্যাপ্ত ও মানসম্মত চিকিৎসা পেয়েছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।

২০৩০ সালের মধ্যে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা
চীন সরকার এখন দেশজুড়ে মানসিক সহায়তা ও সংকট মোকাবিলার একটি জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে আরও বেশি মানুষের কাছে ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা ও মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই পরিকল্পনার আওতায় প্রতিটি স্কুলে পরামর্শকক্ষ স্থাপন, প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং আরও বেশি মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের উদ্বেগের পেছনে শুধু জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাধারণ মানুষের ওপর গাড়ি উঠিয়ে দেওয়া বা ছুরিকাঘাতের মতো কয়েকটি সহিংস ঘটনায় কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন হয়েছে। এসব ঘটনার কিছু ক্ষেত্রে হামলাকারীদের আর্থিক দুরবস্থা, সামাজিক অবিচারের অনুভূতি ও ব্যক্তিগত ব্যর্থতার সঙ্গে মানসিক সমস্যার সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসক কম, নিয়ন্ত্রণও দুর্বল
চীনে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো দক্ষ পেশাজীবীর ঘাটতি। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় দেশটিতে জনসংখ্যার অনুপাতে মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতার সংখ্যা অনেক কম।
সাংহাই মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোতেও রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। চাহিদা মেটাতে সেখানে দলভিত্তিক পরামর্শসেবা বাড়ানো হয়েছে।
এর বাইরে বেসরকারি পরামর্শসেবার বড় অংশ এখনো যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। মানসম্মত লাইসেন্সের অভাব, প্রতারণা ও অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতাদের নিয়োগে নিয়ম কঠোর করার চেষ্টা করলেও পুরো খাতকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
চিকিৎসার ব্যয়ও বড় বাধা। যাদের মানসিক সহায়তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের অনেকেই সেই ব্যয় বহন করতে পারেন না। দীর্ঘস্থায়ী আবাসন সংকটের কারণে স্থানীয় সরকারগুলোর আর্থিক সক্ষমতাও কমেছে, ফলে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সামাজিক লজ্জার দেয়াল এখনো শক্ত
মানসিক রোগকে ঘিরে সামাজিক নেতিবাচক ধারণা এখনো চীনে শক্তিশালী। মানসিক অসুস্থ ব্যক্তিকে অপমান করতে ব্যবহৃত কিছু শব্দ এখনো দৈনন্দিন কথাবার্তায় প্রচলিত।
তবে তরুণ প্রজন্ম এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। তাদের কাছে মানসিক পরামর্শ নেওয়া অনেকটা দুর্বল কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত সহায়তা নেওয়ার মতো স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠছে।
কিন্তু সচেতনতা বাড়লেও মানসিক চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশা অনেক সময় বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরামর্শসেবা সাধারণত ধীরগতির একটি প্রক্রিয়া। অথচ অনেক রোগী এক বা দুইবার কথা বললেই সুস্থ হয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করেন।
আবার চাকরি হারানো, বেতন কমে যাওয়া বা আর্থিক সংকট দেখা দিলে অনেকে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন। ফলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো মূলত আর্থিকভাবে স্বচ্ছল মানুষের নাগালে সীমাবদ্ধ।
চীনে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা নিঃসন্দেহে বাড়ছে। কিন্তু মানুষের মানসিক সমস্যাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা, পর্যাপ্ত চিকিৎসক তৈরি করা, সেবার মান নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসার খরচ কমানো—এই চারটি জায়গায় বড় পরিবর্তন না এলে দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা কঠিনই থেকে যাবে।
চীনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মানসিক স্বাস্থ্যকে সামাজিক লজ্জার বিষয় হিসেবে না দেখে নাগরিক অধিকার ও জনস্বাস্থ্যের অপরিহার্য অংশ হিসেবে কত দ্রুত প্রতিষ্ঠা করা যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















