একই মন্ত্রণালয়, একই রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অথচ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক দুই মঞ্চে ভারতের সাংস্কৃতিক উপস্থাপনায় দেখা গেল সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। জাপানের ওসাকা বিশ্বমেলায় ভারতের প্যাভিলিয়ন যেখানে বিশৃঙ্খলা, বিলম্ব ও গতানুগতিকতার কারণে সমালোচিত হয়েছিল, সেখানেই ভেনিসের সমকালীন শিল্প প্রদর্শনীতে ভারতের প্যাভিলিয়ন প্রশংসা কুড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।
ওসাকার বিশ্বমেলায় ভারতের প্যাভিলিয়ন উদ্বোধন হয়েছিল নির্ধারিত সময়ের দুই সপ্তাহেরও বেশি পরে। সেখানে প্রাচীন মন্দির, পুরোনো চিত্রকর্ম এবং নানা প্রদর্শনীকে অনেকটাই গতানুগতিক পর্যটন প্রচারের মতো মনে হয়েছিল। এর সঙ্গে ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিভিন্ন বক্তব্য ও অনুপ্রেরণামূলক আলোচনার আয়োজন। ফলে পুরো ব্যবস্থাপনাকে অনেকেই ভারতের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখেছিলেন।
কিন্তু ভেনিসে এসে সেই একই সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভারতের আয়োজন যেন সম্পূর্ণ অন্য রূপ নিল। চলতি বছরের ভেনিস সমকালীন শিল্প প্রদর্শনীতে ২০১৯ সালের পর প্রথমবারের মতো ভারতের প্যাভিলিয়ন অংশ নিয়েছে। আর এবার আয়োজনটি পরিচালিত হয়েছে এমনভাবে, যা ভারতের শিল্প, ঐতিহ্য ও আধুনিক পরিবর্তনকে একসঙ্গে তুলে ধরেছে।
ভেনিসে শিল্পের সঙ্গে জীবনের গল্প
প্যাভিলিয়নটির শিল্প-পরিকল্পনা করেছেন প্যারিসের আল থানি সংগ্রহশালার পরিচালক আমিন জাফর। ভারতের দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে ‘বাড়ি’ বা ‘নিজের জায়গা’ বলতে কী বোঝায়—মূলত সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে পাঁচজন শিল্পীর কাজ এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এর মধ্যে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে সুমাক্ষী সিংয়ের ‘পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস’। সূক্ষ্ম রেশম, তুলা ও নাইলন ব্যবহার করে শিল্পী তাঁর দিল্লির দাদা-দাদির পুরোনো বাড়িটির পুনর্নির্মাণ করেছেন। বাড়িটি ইতিমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে নতুন নির্মাণের জন্য। ভারতের দ্রুত নগরায়ণের কারণে পুরোনো বাড়ি হারিয়ে যাওয়ার যে অভিজ্ঞতা দেশটির অসংখ্য মানুষের, সেই ব্যক্তিগত স্মৃতিকেই শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তিনি।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ আসিম ওয়াকিফের ‘চাল’। শত শত বিশাল বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি এই শিল্পকর্ম ভারতের সর্বত্র দেখা নির্মাণকাজের দৃশ্যকে মনে করিয়ে দেয়। বাঁশ, যা ভারতের নির্মাণ ও কারুশিল্পের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, এখানে পরিণত হয়েছে বিশাল এক সমকালীন শিল্পকর্মে।
এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—ভারতের ঐতিহ্যকে কেবল অতীতের স্মারক হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং ঐতিহ্যবাহী উপকরণ, স্থানীয় কারুশিল্প ও মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান ভারতের দ্রুত পরিবর্তনকে যুক্ত করা হয়েছে।
সাফল্যের পেছনে সরকারের ‘কম হস্তক্ষেপ’
ওসাকা ও ভেনিসের ব্যবস্থাপনার পার্থক্যের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সরকারের ভূমিকার ধরন।
ওসাকার আয়োজন ছিল অনেক বেশি ওপর থেকে পরিচালিত। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছিল, পরে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব শিল্পসংস্থা আয়োজনের দায়িত্ব নেয়।
ভেনিসে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতি। সরকার সহযোগিতা করেছে ভারতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। মুম্বাইয়ের নীতা মুকেশ আম্বানি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তাদের যোগাযোগ, অর্থ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সহায়তা করেছে। গোয়ায় বার্ষিক শিল্প উৎসবের জন্য পরিচিত সেরেন্ডিপিটি আর্টস অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।
সরকার মূলত প্রশাসনিক অনুমোদন, কাগজপত্র, পরিবহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ ছিল। এমনকি ইরান যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আসিম ওয়াকিফের শিল্পকর্মের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ১২ টন বাঁশ আকাশপথে ভেনিসে পাঠাতে হয়েছে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাই এনে দিল সাফল্য
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব বিবেক আগরওয়ালের ভূমিকা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থনীতি ও অবকাঠামো খাতে তাঁর অভিজ্ঞতা থাকলেও শিল্পের ক্ষেত্রে তিনি নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই শিল্পের সিদ্ধান্ত শিল্পীদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন।
সরকারের প্রধান শর্ত ছিল, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ও ভিন্ন ভিন্ন স্থানীয় শিল্পধারার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এর বাইরে শিল্প-নির্বাচন ও উপস্থাপনায় আমিন জাফরকে প্রায় পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
এই স্বাধীনতাই সম্ভবত ভেনিসের আয়োজনকে প্রাণবন্ত করেছে। একটি সরকারি প্রদর্শনী হয়েও এটি সরকারি প্রচারাভিযানের মতো মনে হয়নি। বরং ভারতের বাস্তব জীবন, স্মৃতি, ঐতিহ্য ও পরিবর্তনের বহুমাত্রিক গল্প সেখানে উঠে এসেছে।
নতুন পথে ভারতীয় সংস্কৃতির আয়োজন
ভেনিসের সাফল্যের পর ভারত সরকার সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আয়োজনের ওপর আরও জোর দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ২০২৮ সালের পরবর্তী ভেনিস শিল্প প্রদর্শনীর জন্য জায়গা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।
এ ছাড়া চলতি বছরের শেষ দিকে দিল্লিতে বড় ধরনের শিল্প আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গ্যালারি ও ফাউন্ডেশনকে সেখানে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারতের শত শত ঐতিহাসিক স্থাপনা কীভাবে পরিচালিত হবে, সেই ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে।
লক্ষ্য শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণ নয়; শিল্প ও ঐতিহ্যকে অর্থনীতির আরও বড় অংশে পরিণত করা।
ভারতের প্রশাসনের একটি পুরোনো সমস্যা হলো—অনেক সময় সীমিত সক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্র অতিরিক্ত দায়িত্ব নিজের হাতে রাখতে চায়। ভেনিসের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সবকিছু নিজে নিয়ন্ত্রণ না করে দক্ষ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের ওপর আস্থা রাখলে ফল অনেক বেশি চমকপ্রদ হতে পারে। ওসাকায় যেখানে সরকারি ব্যবস্থাপনা ভারতের দুর্বলতাকে প্রকাশ করেছিল, ভেনিসে স্বাধীনতা ও সহযোগিতা তুলে ধরেছে ভারতের সৃজনশীল শক্তিকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















