দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আবারও ভয়াবহ ধোঁয়াশা বা বিষাক্ত কুয়াশার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এ বছরের ধোঁয়াশা এক দশক আগের ভয়াবহ সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।
২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বন ও পিটভূমিতে ভয়াবহ আগুনের কারণে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়েছিল যে ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট জুসুফ কাল্লা প্রতিবেশীদের উদ্দেশে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, বছরের ১১ মাস ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে তারা ভালো বাতাস উপভোগ করেন, অথচ কখনো ধন্যবাদ জানান না। সেই মন্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছিল একটি ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট, যেখানে ইন্দোনেশিয়াকে ধন্যবাদ জানানোর নামে কোটি কোটি মানুষ বিদ্রূপাত্মক ভোট দিয়েছিলেন।
আগুনের বিস্তার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
এবারও পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগস্টের প্রথম ১২ দিনেই বোর্নিও দ্বীপজুড়ে শনাক্ত হওয়া আগুনের সংখ্যা গত সাত বছরের প্রতিটি আগস্ট মাসের পুরো সময়ের তুলনায় বেশি বলে আবহাওয়া পর্যবেক্ষকেরা জানিয়েছেন।
ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম কালিমান্তান প্রদেশের রাজধানী পন্টিয়ানাকে ইতোমধ্যে আগুনের ধোঁয়ার প্রভাব পড়েছে। সেখানে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশের দেশ মালয়েশিয়ার সারাওয়াকে বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুরও সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি সাড়া দেওয়ার দল প্রস্তুত রেখেছে।
আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি সামনে আরও ভয়াবহ হতে পারে। এর অন্যতম কারণ এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তুলনামূলক শুষ্ক পরিবেশ তৈরি করে। ফলে বনভূমি ও কৃষিজমিতে আগুন লাগার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
পিটভূমিতে আগুন নেভানো কঠিন
ইন্দোনেশিয়ার পিটভূমি নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকায় মাটির নিচে বিপুল পরিমাণ কার্বনসমৃদ্ধ জৈব পদার্থ জমে থাকে, যা অত্যন্ত দাহ্য। আগুন একবার পিটের গভীরে ঢুকে গেলে তা মাটির নিচে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে পারে এবং সহজে নেভানো যায় না।
জলবায়ুবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, এ বছরের এল নিনো সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি হতে পারে। সে কারণে ২০১৫ সালের মতো বড় ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
২০১৫ সালের ক্ষত এখনো শুকায়নি
এক দশক আগের ধোঁয়াশা ছিল শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটও। একটি গবেষণার হিসাবে, ২০১৫ সালের ধোঁয়ায় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রায় এক লাখ অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
অর্থনীতিতেও পড়েছিল ভয়াবহ প্রভাব। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ইন্দোনেশিয়াতেই ওই সংকটে প্রায় ১৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় দুই শতাংশের সমান।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আশঙ্কা আরও বেশি, কারণ ইন্দোনেশিয়াসহ এ অঞ্চলের অর্থনীতিগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটের ধাক্কা সামলাচ্ছে।
জ্বালানি সংকটও বাড়াতে পারে আগুনের ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবও এবার পরোক্ষভাবে ধোঁয়াশা সংকটকে আরও তীব্র করতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের কারণে জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয় বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্দোনেশিয়া জৈব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর ফলে পাম তেলের চাহিদা বাড়ছে। পাম তেল উৎপাদনের জন্য নতুন জমির প্রয়োজন তৈরি হলে কৃষক ও বাগান মালিকদের ওপর জমি পরিষ্কার করার চাপ বাড়তে পারে। আর জমি পরিষ্কারে আগুন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়লে দাবানলের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

আগের চেয়ে প্রস্তুতি কি ভালো?
তবে এবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ২০১৫ সালের তুলনায় কিছুটা বেশি প্রস্তুত। উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তির কারণে কোথায় আগুন লাগছে, কতটা দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং ধোঁয়া কোন দিকে যাচ্ছে—এসব তথ্য আগের চেয়ে দ্রুত পাওয়া যাচ্ছে।
সিঙ্গাপুরে একটি আঞ্চলিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নিয়মিতভাবে পুরো অঞ্চলের আগুন ও ধোঁয়ার গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে এবং আগাম সতর্কতা দেয়। এর ফলে সরকারগুলো স্কুল বন্ধ, স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি এবং জরুরি চিকিৎসা প্রস্তুতির মতো পদক্ষেপ দ্রুত নিতে পারে।
এপ্রিল মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ান ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় নতুন ধোঁয়াশা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সচিবালয় চালু করেছে। এর লক্ষ্য হলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা।
আঞ্চলিক সহযোগিতা আছে, কিন্তু ক্ষমতা সীমিত
তবে শুধু প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। ২০০২ সাল থেকেই আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সীমান্তপারের ধোঁয়াশা নিয়ন্ত্রণে একটি চুক্তি রয়েছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন ও আইন প্রয়োগ মূলত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজস্ব সরকারের ওপর নির্ভরশীল।
ধোঁয়াশা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় জলবাহী বিমান, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামসহ বিভিন্ন সম্পদের জন্য যে তহবিল রয়েছে, সেটিও অনেকাংশে সদস্য দেশগুলোর স্বেচ্ছা অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগের ক্ষমতা এখনো সীমিত।
আসল পরীক্ষা ইন্দোনেশিয়ার
শেষ পর্যন্ত এ বছরের সংকট কতটা ভয়াবহ হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ইন্দোনেশিয়ার পরিস্থিতির ওপর। ২০১৫ সালের বিপর্যয়ের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো দাবানল প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোও সেই নীতির বড় অংশ ধরে রেখেছেন।
গত বছর তিনি দাবানল মোকাবিলায় নতুন একটি বিভাগ গঠন করেন। একই সঙ্গে বাড়ানো হয় বনাঞ্চলে টহল, আকাশপথে নজরদারি এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার দল।
এখন সেই প্রস্তুতির বাস্তব পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ায় আগুন কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশ কতটা পরিষ্কার থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















