যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যখন দেশজুড়ে প্রতারণার বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালানোর কথা বলছে, তখন সেই অভিযানের লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বড় করপোরেট কেলেঙ্কারি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম কিংবা ধনী নির্বাহীদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ মামলায় শিথিলতা দেখানোর পাশাপাশি বিচার বিভাগ এখন কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ ডলারের তুলনামূলক ছোট প্রতারণার মামলায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা আনার একটি ছোট খাবারের গাড়ি। বরফজাত খাবার, ফল ও সবজি বিক্রি করা সেই পুরোনো সাদা খাবারের গাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে সরকারি খাদ্য সহায়তার অর্থ নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে তদন্তকারীরা দেখিয়েছেন, ব্যবসাটির আকারের তুলনায় সেখানে অস্বাভাবিক পরিমাণ খাদ্য সহায়তার লেনদেন হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য, ছোট প্রতারণাকেও উপেক্ষা করা যাবে না। কিন্তু সাবেক ও বর্তমান ফেডারেল প্রসিকিউটরদের একাংশ বলছেন, এর ফলে বিচার বিভাগের সীমিত জনবল ও অভিজ্ঞতা এমন মামলায় ব্যয় হচ্ছে, যেগুলো অতীতে সাধারণত স্থানীয় বা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই সামলাত।
ছোট মামলায় ফেডারেল সরকারের নজর
সান্তা আনার ওই খাবারের গাড়ির মালিক এস্মেরালদা সোরিয়ানোর বিরুদ্ধে অভিযোগটি এসেছে খাদ্য সহায়তার সরকারি সুবিধা নগদে রূপান্তরের সন্দেহ থেকে। তদন্তকারীদের ভাষ্য, এক বছরে ওই ব্যবসা ছয় লাখ ডলারের বেশি খাদ্য সহায়তার সুবিধা নগদায়ন করেছে। একই ধরনের আকারের অন্যান্য ব্যবসার তুলনায় এই পরিমাণ ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি।

তদন্তকারীরা আরও বলেছেন, দোকানে প্রয়োজনীয় স্ক্যানার না থাকা, ধারাবাহিকভাবে বড় অঙ্কের লেনদেন এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর লেনদেন—সব মিলিয়ে সেখানে সম্ভাব্য প্রতারণার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তবে তদন্তে সন্দেহজনক লেনদেনের পরিমাণ আর আদালতে প্রমাণযোগ্য প্রতারণার পরিমাণ এক বিষয় নয়। এ নিয়েই মূলত প্রশ্ন উঠছে, ফেডারেল বিচার বিভাগের এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান কেন ছোট ব্যবসার বিরুদ্ধে এমন মামলা পরিচালনায় নিজেদের শক্তি ব্যয় করছে।
খাদ্য সহায়তার অর্থ নিয়ে প্রতারণা
একই দিনে লস অ্যাঞ্জেলেসের ফেডারেল প্রসিকিউটররা জেসি সার্ভান্তেস-গোমেজ নামে একটি মুদি ও পার্টি সামগ্রীর দোকানের ক্যাশিয়ারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৯ হাজার ৫৫৯ ডলারের সরকারি খাদ্য সহায়তার কার্ড দোকানের পেমেন্ট হিসেবে গ্রহণ করেন এবং এর বিনিময়ে গোপন তদন্তকারীদের প্রায় ৪ হাজার ৮১০ ডলার নগদ দেন।
দুই অভিযুক্তই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। প্রসিকিউটররা শুরুতে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কারাগারে রাখার আবেদন করেছিলেন। তবে বিচারক শেষ পর্যন্ত প্রত্যেককে পাঁচ হাজার ডলারের বন্ডে মুক্তি দেন।
আরও একটি বিষয় এই ঘটনাকে বিশেষভাবে আলোচিত করেছে। দুই মামলাতেই গোপন তদন্ত পরিচালনা করেছে অভিবাসন ও শুল্ক enforcement সংস্থা, যার মূল দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন প্রয়োগ করা।
আগে যেসব মামলা স্থানীয় পর্যায়েই থাকত
সরকারি খাদ্য সহায়তার সুবিধা ব্যবহার করে নগদ অর্থ নেওয়ার এই ধরনের প্রতারণা নতুন নয়। নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যের জন্য বরাদ্দ সুবিধাকে নগদ অর্থে পরিণত করাই এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য। তবে এতদিন ছোট অঙ্কের এসব মামলা সাধারণত অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় তদন্তকারীদের হাতেই থাকত।

ট্রাম্প প্রশাসন এখন বলছে, ছোট প্রতারণা দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকার কারণেই তা বড় আকার ধারণ করেছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা মিনেসোটার একটি ঘটনার উদাহরণও দিচ্ছেন, যেখানে করোনাভাইরাস মহামারির সময় শিশুদের খাবারের জন্য তৈরি একটি সরকারি কর্মসূচি থেকে লাখ লাখ ডলার আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল।
প্রশাসনের যুক্তি হলো, সরকারি অর্থের অপচয় বা প্রতারণা অঙ্কে ছোট হলেও তা উপেক্ষা করা হলে একই ধরনের অপরাধ ক্রমে বড় আকার নিতে পারে।
বড় করপোরেট মামলায় কেন নীরবতা?
সমালোচকদের আপত্তি মূলত এখানেই। তাদের প্রশ্ন, যদি প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াই লক্ষ্য হয়, তাহলে বড় আর্থিক অপরাধের মামলাগুলোতে একই ধরনের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না কেন?
ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে বিচার বিভাগ একদিকে বড় বড় করপোরেট মামলার কয়েকটি থেকে সরে এসেছে, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত কমিয়েছে এবং ধনী নির্বাহীদের বিরুদ্ধে আলোচিত কিছু মামলা প্রত্যাহার করেছে। অন্যদিকে ছোট ব্যবসা কিংবা ব্যক্তির বিরুদ্ধে খাদ্য সহায়তার অর্থ নিয়ে কয়েক হাজার ডলারের অভিযোগে ফেডারেল মামলা করা হচ্ছে।
সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটর জ্যাকুলিন কেলির মতে, এ ধরনের ছোট মামলা সাধারণত ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিপুল সম্পদ ব্যয়ের মতো বিষয় নয়। তার আশঙ্কা, এসব মামলায় সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার অর্থ হতে পারে বড় ধরনের আর্থিক অপরাধ তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সময় কমে যাওয়া।
২৫টি মামলা সামলানোর চাপ
বিচার বিভাগের অভ্যন্তরে প্রসিকিউটরদের কাজের চাপ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তারা অভ্যন্তরীণভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, প্রত্যেক সহকারী মার্কিন অ্যাটর্নির হাতে সবসময় অন্তত ২৫টি সক্রিয় মামলা থাকা উচিত।
সাধারণ অপরাধ, মাদক বা খাদ্য সহায়তা নিয়ে প্রতারণার মতো তুলনামূলক সরল মামলায় এই সংখ্যা হয়তো সামলানো সম্ভব। কিন্তু কোনো অভিজ্ঞ প্রসিকিউটর যদি জটিল সরকারি দুর্নীতি, করপোরেট প্রতারণা কিংবা বড় আর্থিক অপরাধের তদন্ত পরিচালনা করেন, তাহলে একসঙ্গে ২৫টি মামলা তার ওপর বিপুল চাপ তৈরি করতে পারে।
বিচার বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আকাশ সিং এই নীতির সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে প্রসিকিউটরদের বলেছেন, ২৫টি মামলা হলো ন্যূনতম মাত্রা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, একজন প্রসিকিউটরের হাতে এর চেয়ে কম মামলা থাকলে সেটি তার পর্যাপ্ত কাজ না থাকার ইঙ্গিত হতে পারে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, মামলার সংখ্যা বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিলে তদন্তের গভীরতা ও মান কমে যেতে পারে।
আর্থিক অপরাধের মামলা কমেছে
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে আর্থিক অপরাধের মামলা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে কমেছে। এর কারণ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ মনে করেন, সরকার বড় আর্থিক প্রতারণার মামলা নিতে আগের চেয়ে বেশি সতর্ক। কেউ আবার বলছেন, বিচার বিভাগের অভিজ্ঞতা কমেছে। ডিজিটাল যুগে বিপুল পরিমাণ তথ্য ও নথি সংগ্রহ করে একটি আর্থিক অপরাধ প্রমাণ করাও আগের তুলনায় অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
ফেডারেল পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৪ হাজার ৭৪৭টি শ্বেতপোশাক অপরাধের মামলা করা হয়েছে। মোট ফৌজদারি মামলার মধ্যে এগুলোর অংশ প্রায় ৫ শতাংশ।
তবে আগের প্রশাসনগুলোর একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। জো বাইডেনের মেয়াদে একই সময়ে মামলা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৫৪টি। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হয়েছিল ৬ হাজার ৬২৬টি এবং বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদে হয়েছিল ৮ হাজার ৭৮১টি।
‘প্রতারণা নীতিতে বিশৃঙ্খলা’
বিচার বিভাগের সাবেক কর্মকর্তাদের সংগঠন জাস্টিস কানেকশনের প্রতিষ্ঠাতা স্টেসি ইয়ং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতারণাবিরোধী নীতিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সমালোচনা করেছেন।
তার মতে, একদিকে ধনী নির্বাহীদের ক্ষমা করা হচ্ছে, অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্টের তত্ত্বাবধানে নতুন প্রতারণাবিরোধী বিভাগ তৈরি করা হচ্ছে। আবার কোটি কোটি ডলারের প্রতারণার মামলা থেকে সরে এসে কয়েক হাজার ডলারের খাদ্য সহায়তা প্রতারণার অভিযোগে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে।
তার ভাষায়, আইন প্রয়োগের অগ্রাধিকারই মানুষের কাছে সরকারের বার্তা পৌঁছে দেয়। কিন্তু প্রতারণার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সেই বার্তা এখন অত্যন্ত বিশৃঙ্খল।
জনবল কমেছে, বাড়ছে ভুলের আশঙ্কা
সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটর সারাহ ক্রিসফের মতে, বিচার বিভাগের জনবল এরই মধ্যে আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। বিশেষ করে অভিজ্ঞ প্রসিকিউটরদের বড় অংশ চলে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল হয়েছে।
তার আশঙ্কা, যদি মামলার সংখ্যাই সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তাহলে তদন্তের মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ভুল সিদ্ধান্তের সংখ্যা বাড়তে পারে।
বিচার বিভাগ অবশ্য এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। বিভাগের মুখপাত্র ম্যাথিউ ট্র্যাগেসার বলেছেন, প্রতারণার কোনো ঘটনাকেই তারা উপেক্ষা করবে না। তার যুক্তি, শুধু বড় অঙ্কের প্রতারণার মামলা করলে ছোট প্রতারকদের কাছে ভুল বার্তা যাবে—যেন তারা ফেডারেল আইনের আওতার বাইরে। সেটি কোনোভাবেই সত্য নয়।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার অর্থ কি ছোট অপরাধের মামলার সংখ্যা বাড়ানো, নাকি একই সঙ্গে বড় আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধেও শক্ত অবস্থান নেওয়া?
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতিকে ঘিরে এই বিতর্ক এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার একটি বড় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ছোট প্রতারণার বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা করে সংখ্যাগত সাফল্য দেখানো সহজ হতে পারে, কিন্তু এর ফলে যদি জটিল ও বড় আর্থিক অপরাধ তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সময় কমে যায়, তাহলে সেই অভিযান শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















