যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের বিগ বেন্ড জাতীয় উদ্যানের ভেতরে সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হওয়ায় নতুন করে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবেশবাদী, সাবেক উদ্যানকর্মী, স্থানীয় শেরিফ এবং রাজনীতিকদের একটি অংশ বলছেন, সীমান্তের এই দুর্গম ও প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত এলাকায় এমন নির্মাণকাজের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই বড় প্রশ্ন রয়েছে।
কয়েক মাস আগে ট্রাম্প প্রশাসন বিগ বেন্ড জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু সীমান্তপ্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল। চাঁদের পৃষ্ঠের মতো রুক্ষ মরুভূমি, বিশাল পাহাড় আর গভীর গিরিখাতের জন্য বিখ্যাত এই উদ্যানটি টেক্সাসবাসীর কাছে বিশেষ গর্বের জায়গা। কিন্তু দুই দলের রাজনীতিকদের বিরোধিতা বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত সরকারি সীমান্ত নির্মাণের মানচিত্র থেকে সেই প্রাচীরের পরিকল্পনা সরিয়ে নেওয়া হয়।
অনেকে তখন মনে করেছিলেন, পশ্চিম টেক্সাসের এই বন্য ও দুর্গম অঞ্চলটি বড় ধরনের নির্মাণকাজ থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু চলতি মাসে সেখানে বুলডোজার পৌঁছানোর পর সেই স্বস্তি ভেঙে যায়।
সান্তা এলেনা গিরিখাতের কাছে বুলডোজার

বিগ বেন্ডের অন্যতম আকর্ষণ সান্তা এলেনা গিরিখাতের কাছে রিও গ্রান্ডে নদীর তীরবর্তী এলাকায় এখন ভারী নির্মাণযন্ত্র দেখা যাচ্ছে। গাছপালা ও ঝোপঝাড় সরিয়ে এক মাইলেরও বেশি এলাকায় মাটি সমান করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি ভবিষ্যতে নির্মাণের কথা থাকা একটি সড়কের প্রস্তুতিমূলক কাজ বলে মনে হচ্ছে।
বিগ বেন্ড জাতীয় উদ্যান শুধু টেক্সাস নয়, পুরো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চল। প্রতিবছর পাঁচ লাখের বেশি মানুষ সেখানে ভ্রমণ করেন। তবে পর্যটকদের সংখ্যার চেয়েও বড় বিষয় হলো, এটি পশ্চিম টেক্সাসের এমন একটি বিস্তীর্ণ বন্য অঞ্চল যেখানে মানুষ প্রকৃতির বিশালতা ও দুর্গমতা খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন।
এই পরিবেশেই সীমান্ত নির্মাণকাজ শুরু হওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাচীর নেই, তবে হচ্ছে সড়ক ও নিরাপত্তা অবকাঠামো
বিষয়টি নিয়ে কয়েক দিন ধরে পশ্চিম টেক্সাসে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার তাদের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেন। প্রশাসনের বক্তব্য, সেখানে নতুন কোনো সীমান্তপ্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে না। তবে সীমান্ত টহলের জন্য একটি নতুন প্রবেশসড়ক তৈরি করা হবে, বিদ্যমান সড়ক উন্নত করা হবে, নজরদারি প্রযুক্তি বসানো হবে এবং নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় যানবাহন ঠেকাতে প্রতিবন্ধক স্থাপন করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থার কমিশনার রডনি স্কট জানিয়েছেন, বিগ বেন্ড এলাকায় চলতি মাসের খনন ও মাটি কাটার কাজ মূলত জরিপ ও নকশা তৈরির অংশ।
বিগ বেন্ড জাতীয় উদ্যানের প্রায় ১১৮ মাইল এলাকা যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত। পরিকল্পনা অনুযায়ী এর বড় একটি অংশের পাশে টহল সড়ক থাকবে। কিছু এলাকায় প্রায় চার থেকে ছয় ফুট উঁচু যানবাহন প্রতিরোধক বসানো হতে পারে।
সীমান্তে অবৈধ পারাপার অত্যন্ত কম
নির্মাণকাজের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পুরো বিগ বেন্ড সীমান্ত টহল এলাকায়—যার মধ্যে জাতীয় উদ্যান ছাড়াও সীমান্তের আরও কয়েক শ মাইল এলাকা রয়েছে—মেক্সিকো থেকে প্রতিদিন গড়ে ছয়জনেরও কম অভিবাসীকে পারাপারের সময় আটক বা শনাক্ত করা হয়েছে।

অর্থাৎ, বর্তমানে সেখানে অবৈধ সীমান্ত পারাপারের ঘটনা অত্যন্ত কম।
সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, এখন পারাপার রেকর্ড পরিমাণ কম হলেও ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তাদের যুক্তি, মাদক চোরাকারবারি বা অপরাধী চক্র যেন সীমান্তের অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশ খুঁজে নতুন পথ ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য আগেভাগেই অবকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
এই যুক্তির অংশ হিসেবেই একটি কোম্পানিকে প্রায় ১৭০ কোটি ডলারের নির্মাণচুক্তি দেওয়া হয়েছে।
টেক্সাসের রাজনীতিতেও বিভাজন
বিগ বেন্ডে নির্মাণকাজ নিয়ে টেক্সাসের রাজনীতিতেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। অঙ্গরাজ্যের বিদায়ী রিপাবলিকান সিনেটর জন কর্নিন এবং তাকে সিনেট নির্বাচনে প্রতিস্থাপন করতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তারালিকো—দুজনই চলতি মাসে নির্মাণ শুরুর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
কর্নিন ৭ আগস্ট স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী মার্কওয়েন মুলিনকে লেখা এক চিঠিতে বলেন, রিও গ্রান্ডের প্রায় এক হাজার ফুট উঁচু নদীতীরবর্তী খাড়া পাথুরে দেয়াল এবং বিগ বেন্ডের দুর্গম ভূপ্রকৃতিই স্থানীয় মানুষের কাছে বড় ধরনের প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করে।
তার ভাষায়, স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, এই প্রাকৃতিক বাধাই সীমান্ত পারাপার ঠেকাতে যথেষ্ট কার্যকর।
তবে টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এবং অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন এখন পর্যন্ত সরাসরি নির্মাণকাজের বিষয়ে অবস্থান জানাননি।
আদালতের দ্বারস্থ বিরোধীরা
শুক্রবার স্থানীয় একটি অলাভজনক সংগঠন এবং একটি বহিরাঙ্গন বিনোদন ব্যবসা নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে। ডেমোক্র্যাট অঙ্গরাজ্য সিনেটর রোলান্ড গুতিয়েরেজ তাদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন।

এর এক দিন আগে দুই দলের একদল টেক্সাস আইনপ্রণেতা গভর্নর অ্যাবটকে চিঠি দিয়ে ফেডারেল সরকারের কাছে নির্মাণকাজ বন্ধের অনুরোধ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বিগ বেন্ডের সাবেক পর্যটন কর্মকর্তা টেক্স টলার বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মানুষ এখন রাস্তায় মশাল নিয়ে প্রতিবাদে নামার কথা বলছে। তার মতে, এটি টেক্সাস এবং পুরো যুক্তরাষ্ট্রের শেষ অবশিষ্ট বন্য অঞ্চলগুলোর একটি।
স্থানীয় শেরিফের প্রশ্ন, ‘কোন নিরাপত্তা সমস্যা সমাধান করছি?’
প্রাচীর নির্মাণের বিরোধিতা করা অনেকেই এখন টহল সড়ক ও অন্যান্য সীমান্ত অবকাঠামোরও বিরোধিতা করছেন। তাদের মধ্যে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
কাছের টেরেল কাউন্টির রিপাবলিকান শেরিফ থ্যাডিয়াস ক্লিভল্যান্ড নিজেও সাবেক সীমান্ত টহল কর্মকর্তা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—আসলে কোন নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করতে এই নির্মাণকাজ করা হচ্ছে? একই নিরাপত্তা লক্ষ্য কি অন্য কোনো উপায়ে আরও কার্যকরভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়?
বিরোধীদের যুক্তি, সীমান্তের এই অংশে মানুষের অবৈধ চলাচল এতটাই কম যে বড় ধরনের সড়ক, যানবাহন প্রতিরোধক কিংবা অন্যান্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের পরিবেশগত ক্ষতি এর সম্ভাব্য নিরাপত্তা লাভের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।
প্রকৃতি ধ্বংসের আশঙ্কায় প্রতিবাদ
বুধবার সান্তা এলেনা গিরিখাতের কাছে নির্মাণকাজের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা। তাদের হাতে ছিল নির্মাণ বন্ধের দাবিতে লেখা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড। কেউ কেউ স্থানীয় বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে জ্যাভেলিনা নামের বন্য প্রাণীর হাতে আঁকা ছবি নিয়ে প্রতিবাদে অংশ নেন।
বিক্ষোভকারীদের আশঙ্কা, পরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে ভবিষ্যতে সেতু তৈরি এবং মারিসকাল পর্বতের মতো দুর্গম এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির প্রয়োজন হতে পারে।
বিগ বেন্ড জাতীয় উদ্যানের সাবেক রেঞ্জার মাইকেল রায়ানও বিক্ষোভে অংশ নেন। তার আশঙ্কা, একবার এই ধরনের নির্মাণ শুরু হলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ আর আগের অবস্থায় ফিরবে না। তার মতে, করদাতাদের অর্থ ব্যয় করে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যানকে নষ্ট করা হচ্ছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা বনাম প্রকৃতি সংরক্ষণ
বিগ বেন্ডের ঘটনাটি এখন যুক্তরাষ্ট্রে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্তে অবকাঠামো জোরদার করে নিরাপত্তা বাড়াতে চাইছে। অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী এবং কিছু রাজনীতিকের প্রশ্ন—যেখানে অবৈধ পারাপারের ঘটনা অত্যন্ত কম, সেখানে এমন দুর্গম ও সংবেদনশীল প্রাকৃতিক এলাকায় ব্যাপক নির্মাণকাজ কতটা যুক্তিসঙ্গত?
বিরোধীদের ভয়, আজ প্রাচীর না হলেও সড়ক, নজরদারি ব্যবস্থা ও যানবাহন প্রতিরোধক দিয়ে শুরু হওয়া কাজ ভবিষ্যতে আরও বড় অবকাঠামো নির্মাণের পথ খুলে দিতে পারে। আর একবার জাতীয় উদ্যানের প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য বদলে গেলে সেই ক্ষতি আর সহজে পূরণ করা সম্ভব হবে না।
বিগ বেন্ডের মানুষ তাই এখন শুধু একটি সড়ক বা সীমান্ত অবকাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন না; তারা প্রশ্ন তুলছেন, দেশের অন্যতম শেষ বন্য প্রাকৃতিক অঞ্চলকে নিরাপত্তার নামে কতটা বদলে ফেলা উচিত।
বিগ বেন্ডের খাড়া পাহাড়, গভীর গিরিখাত ও দুর্গম মরুভূমি যদি নিজেরাই সীমান্তের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক প্রতিরোধ হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রকৃতিকে কেটে নতুন প্রতিরোধ তৈরি করার প্রয়োজন আদৌ আছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন টেক্সাসে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















