১২:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
অতীত ভুলে নয়, মতপার্থক্য মিটিয়ে সামনে এগোতে হবে: দীনেশ ত্রিবেদী ইরান যুদ্ধেই কি মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপদে পড়ছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল? স্কুলে হামলা চালিয়ে সহপাঠীকে হত্যা, আত্মহত্যার আগে সরাসরি সম্প্রচার করল শিক্ষার্থী ডলার বন্ড তুলতে দৌড়াচ্ছে ভারতের চার বেসরকারি ব্যাংক বন্ডের সুদহার কয়েক দশকের সর্বোচ্চ, কমল স্বর্ণের দাম চেয়ারম্যানের বিদায়ের পরই টাটা সন্সের বার্ষিক সভা স্থগিত মার্কিন সামরিক গবেষণার হাত ধরে চীনের রোবট কুকুরের উত্থান পশ্চিম তীরে অবরুদ্ধ বাড়িতে মার্কিন পতাকা তুলেও রক্ষা পেলেন না ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মুখোমুখি, আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ ট্রাম্পের হারানো ইনকা নগরীর খোঁজে ‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’, ৫৩ বছর পর মিলল সত্যের সন্ধান

হারানো ইনকা নগরীর খোঁজে ‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’, ৫৩ বছর পর মিলল সত্যের সন্ধান

১৯১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিরাম বিংহাম তৃতীয় দাবি করেছিলেন, তিনি পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার গভীরে ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ রাজার হারিয়ে যাওয়া দুর্গনগরীর সন্ধান পেয়েছেন। সেই নগরী ছিল কিংবদন্তির ভিলকাবাম্বা—যেখানে স্প্যানিশ দখলদারদের হাত থেকে বাঁচতে শেষ ইনকা শাসক ও তাঁর অনুসারীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

কিন্তু বিংহামের সেই দাবি পরে ভুল প্রমাণিত হয়। প্রায় ৫৩ বছর পর, ১৯৬৪ সালে জিন সাভয় নামে এক মার্কিন অভিযাত্রী দুর্গম পেরুভিয়ান অরণ্যে পৌঁছে এমন কিছু ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পান, যা গবেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। তাঁর অভিযানের কারণে সাভয় পরিচিতি পান ‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’ নামে।

কিংবদন্তির সেই হারানো নগরী

ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ দখলদাররা ইনকা সাম্রাজ্যের রাজধানী কুসকো দখল করার পর ইনকা শাসক মানকো তাঁর পরাজিত অনুসারীদের নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সরে যান।

সেখানেই গড়ে ওঠে তাঁর নির্বাসিত রাজধানী ভিলকাবাম্বা। কথিত আছে, সেখানে কয়েক হাজার মানুষ প্রাসাদ, মন্দির ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করেছিল। ইনকা শাসকেরা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন বিপুল পরিমাণ সোনা, মূল্যবান অলংকার, দেবদেবীর মূর্তি এবং পূর্বপুরুষদের মমি।

তবে ভিলকাবাম্বা শুধু আশ্রয়স্থল ছিল না। স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অন্যতম কেন্দ্রও হয়ে উঠেছিল এটি। ১৫৭২ সালে স্প্যানিশ বাহিনীর আক্রমণের মুখে ইনকারা নগরীতে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর ঘন জঙ্গলে ঢাকা পড়ে যায় শেষ ইনকা রাজধানী।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নগরীটির অবস্থান রহস্যই থেকে যায়।

ভুল জায়গায় হারানো নগরী খুঁজেছিলেন বিংহাম

১৯০৯ সালে পেরুর স্থানীয় ভূস্বামীরা হিরাম বিংহামকে একটি প্রাচীন স্থাপনা খুঁজে দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানান। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৪ বছর। তিনি ছিলেন লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ববিদ নন।

স্থানীয় কর্মকর্তা হুয়ান হোসে নুনিয়েস তাঁকে বোঝান, তাঁর উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট।

বিংহাম নিজেই পরে স্বীকার করেছিলেন, ইনকা সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান খুবই সীমিত ছিল। তবু ১৯১১ সালে তিনি ইয়েলের একটি অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে হারানো ইনকা রাজধানীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন।

অভিযানের এক পর্যায়ে তিনি এমন একটি অঞ্চলের কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, যেখানে ১৯৬৪ সালে সাভয় ভিলকাবাম্বার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। কিন্তু খারাপ আবহাওয়া, খাবারের সংকট এবং বহনকারীদের ফিরে যাওয়ার হুমকির কারণে বিংহাম দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।

এরপর তিনি মাচু পিচুকে সেই কিংবদন্তির হারানো নগরী বলে দাবি করেন।

১৯৬৪ সালে সাভয়ের অভিযান

১৯৬৪ সালে ৩৭ বছর বয়সী অভিযাত্রী জিন সাভয় পেরুভিয়ান অভিযাত্রী আন্তোনিও সান্তান্দার কাসেল্লির সঙ্গে দুর্গম এসপিরিতু পাম্পা অঞ্চলে পৌঁছান।

স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে তাঁদের পথ দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, দেবতাদের নিষেধ অমান্য করে কেউ ওই স্থানের সন্ধান প্রকাশ করলে তার মৃত্যু হতে পারে।

Alamy Bingham, who was not an archaeologist, mistakenly claimed the ancient site of Machu Picchu as the fabled lost city (Credit: Alamy)

শেষ পর্যন্ত অনেক অনুরোধের পর স্থানীয়রা তাঁদের শ্যাওলায় ঢাকা প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের কাছে নিয়ে যান।

সাভয় সেখানে পৌঁছে বিস্ময়ে বলেছিলেন, তাঁরা নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। প্রতিদিনই তাঁদের কাছে জায়গাটি আরও বিস্ময়কর হয়ে উঠছিল।

পর্বতের তিনটি বিস্তৃত সমতলে ছড়িয়ে ছিল ধ্বংসাবশেষ। সেখানে ছিল প্রাসাদ, গ্রানাইট ও চুনাপাথরের তৈরি স্থাপনা এবং ঝরনা। শুধু প্রথম সমতলটিই মাচু পিচুর তুলনায় প্রায় চার গুণ বড় ছিল।

সাভয়ের ধারণা হয়, এটাই ছিল স্প্যানিশ বিজেতাদের বিরুদ্ধে শেষ লড়াইয়ের সময় ইনকা শাসকদের আশ্রয়স্থল।

জঙ্গলের সঙ্গে লড়াই করে বিবিসির অভিযান

সাভয়ের অভিযানের মাত্র ছয় সপ্তাহ পর একটি বিবিসি দল একই পথে যাত্রা করে। তাঁদের যাত্রা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক।

দলটি রাবারের নৌকায় নদীর খরস্রোতা পাড়ি দেয়। কোথাও নৌকা উল্টে যায়। এরপর খাড়া গিরিখাত বেয়ে খচ্চরের সাহায্যে এগোতে হয়। ঘন পাহাড়ি অরণ্যের মধ্য দিয়ে পথ তৈরি করতে গাছপালা, লতা ও ঝোপঝাড় কেটে এগোতে হয়।

এক সপ্তাহের কঠিন পথচলার পর তারা ঘন, বৃষ্টিভেজা পাহাড়ি অরণ্যের গভীরে পৌঁছে প্রাচীন ইনকা বসতির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায়।

শত শত বছর ধরে অরণ্যটি নগরীটিকে আড়াল করে রেখেছিল। বিশাল গাছের শিকড় প্রাচীর ও সিঁড়ির ওপর শক্তভাবে জড়িয়ে ছিল। লতাগুল্ম অনেক জায়গায় এতটাই মোটা হয়ে উঠেছিল যে সেগুলো সরানো ছিল অত্যন্ত কঠিন।

সাভয় জঙ্গলকে ঘৃণা করতেন বলে জানালেও তিনি বলেছিলেন, অনুসন্ধান না করে ফিরে আসার চেয়ে ওই জঙ্গলে মৃত্যুবরণ করাও তাঁর কাছে শ্রেয়।

ছাদের টালিতে মিলল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র

সাভয় ও সান্তান্দারের আবিষ্কার একাই প্রমাণ করেনি যে এসপিরিতু পাম্পাই শেষ ইনকা রাজধানী ভিলকাবাম্বা।

তবে ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পাওয়া কিছু পোড়ামাটির ছাদঢাকা টালি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে।

ইনকারা সাধারণত ছাদ তৈরিতে খড় ব্যবহার করত। কিন্তু উদ্ধার হওয়া টালিগুলো ছিল স্প্যানিশ নির্মাণরীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আবার তাতে ইনকা সংস্কৃতির স্বতন্ত্র রং ও নকশার ছাপ ছিল।

WATCH: 'The river suddenly grows into a strenuous opponent'

এই আবিষ্কার পরবর্তী গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। ব্রিটিশ ভূগোলবিদ ও ইনকা সভ্যতার বিশেষজ্ঞ জন হেমিং ঐতিহাসিক বিবরণগুলোর সঙ্গে ধ্বংসাবশেষের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে দেখতে শুরু করেন।

ষোড়শ শতকের ধর্মযাজক মার্তিন দে মুরুয়ার লেখা বিবরণেও নির্বাসিত ইনকা রাজধানীর একটি প্রাসাদের কথা বলা হয়েছিল, যার বিভিন্ন স্তরে টালির ছাদ ছিল। সেই বিবরণের সঙ্গে এসপিরিতু পাম্পার আবিষ্কারের মিল গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দেখা দেয়।

বিংহাম কি তাহলে মাত্র কয়েক কদম দূরে ছিলেন?

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ১৯১১ সালে হিরাম বিংহাম যে হারানো নগরীর সন্ধান করছিলেন, তার প্রকৃত অবস্থানের খুব কাছ দিয়েই তিনি হেঁটে গিয়েছিলেন।

কিন্তু তিনি সঠিক জায়গায় থামেননি। পরে মাচু পিচুকেই হারানো ভিলকাবাম্বা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

সাভয়ের অভিযান সেই পুরোনো ভুল ধারণাকে বদলে দেয়। বহু বছর ধরে কিংবদন্তি ও ইতিহাসের মাঝামাঝি অবস্থান করা ভিলকাবাম্বাকে আবার বাস্তব ইতিহাসের আলোচনায় ফিরিয়ে আনে।

সাভয়ের ভাষায়, নগরীটির অস্তিত্বের কথা এত দীর্ঘ সময় ধরে কেবল কিংবদন্তি হিসেবে প্রচলিত ছিল যে তা ইতিহাস থেকে প্রায় মিথে পরিণত হয়েছিল। তাঁর অভিযানের পর সেটি আবার ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

Lost City of the Incas – Machu Picchu ⛰️✨ Hidden high in the Andes Mountains of Peru, Machu Picchu is one of the most breathtaking ancient sites in the world. Surrounded by

হারানো ইনকা সম্পদের রহস্য এখনো অমীমাংসিত

তবে ভিলকাবাম্বার গল্প এখানেই শেষ নয়।

সাভয়ের বিশ্বাস ছিল, স্প্যানিশদের হাতে পড়ার আগে ইনকারা বিপুল পরিমাণ সোনা ও মূল্যবান সম্পদ লুকিয়ে ফেলেছিল। তাঁর ধারণা ছিল, এসব সম্পদের একটি অংশ হ্রদ ও গুহায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

অভিযান চালানোর সময় তিনি এমন কিছু হ্রদের সন্ধান পাওয়ার কথাও বলেছিলেন, যেগুলো মানচিত্রে ছিল না। তাঁর দাবি ছিল, অচিহ্নিত দেয়ালঘেরা সুড়ঙ্গও তিনি খুঁজে পেয়েছেন।

পেরুর প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এলাকাটি দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে অক্ষত থাকায় সেখানে আরও অনেক অজানা তথ্য ও স্থাপনা আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি ঘন অরণ্যের আরও গভীরে অন্য কোনো প্রাচীন নগরীর অস্তিত্ব নিয়েও বিভিন্ন সময়ে ধারণা সামনে এসেছে।

তবে কিংবদন্তির সেই ‘হারানো ইনকা ধনভাণ্ডার’ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ভিলকাবাম্বার ধ্বংসাবশেষ তাই শুধু একটি হারানো নগরীর সন্ধানের গল্প নয়; এটি ইতিহাস, কিংবদন্তি, অভিযাত্রা এবং শতাব্দীজুড়ে টিকে থাকা এক রহস্যের কাহিনি।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

অতীত ভুলে নয়, মতপার্থক্য মিটিয়ে সামনে এগোতে হবে: দীনেশ ত্রিবেদী

হারানো ইনকা নগরীর খোঁজে ‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’, ৫৩ বছর পর মিলল সত্যের সন্ধান

১১:১২:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

১৯১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিরাম বিংহাম তৃতীয় দাবি করেছিলেন, তিনি পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার গভীরে ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ রাজার হারিয়ে যাওয়া দুর্গনগরীর সন্ধান পেয়েছেন। সেই নগরী ছিল কিংবদন্তির ভিলকাবাম্বা—যেখানে স্প্যানিশ দখলদারদের হাত থেকে বাঁচতে শেষ ইনকা শাসক ও তাঁর অনুসারীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

কিন্তু বিংহামের সেই দাবি পরে ভুল প্রমাণিত হয়। প্রায় ৫৩ বছর পর, ১৯৬৪ সালে জিন সাভয় নামে এক মার্কিন অভিযাত্রী দুর্গম পেরুভিয়ান অরণ্যে পৌঁছে এমন কিছু ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পান, যা গবেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। তাঁর অভিযানের কারণে সাভয় পরিচিতি পান ‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’ নামে।

কিংবদন্তির সেই হারানো নগরী

ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ দখলদাররা ইনকা সাম্রাজ্যের রাজধানী কুসকো দখল করার পর ইনকা শাসক মানকো তাঁর পরাজিত অনুসারীদের নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সরে যান।

সেখানেই গড়ে ওঠে তাঁর নির্বাসিত রাজধানী ভিলকাবাম্বা। কথিত আছে, সেখানে কয়েক হাজার মানুষ প্রাসাদ, মন্দির ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করেছিল। ইনকা শাসকেরা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন বিপুল পরিমাণ সোনা, মূল্যবান অলংকার, দেবদেবীর মূর্তি এবং পূর্বপুরুষদের মমি।

তবে ভিলকাবাম্বা শুধু আশ্রয়স্থল ছিল না। স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অন্যতম কেন্দ্রও হয়ে উঠেছিল এটি। ১৫৭২ সালে স্প্যানিশ বাহিনীর আক্রমণের মুখে ইনকারা নগরীতে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর ঘন জঙ্গলে ঢাকা পড়ে যায় শেষ ইনকা রাজধানী।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নগরীটির অবস্থান রহস্যই থেকে যায়।

ভুল জায়গায় হারানো নগরী খুঁজেছিলেন বিংহাম

১৯০৯ সালে পেরুর স্থানীয় ভূস্বামীরা হিরাম বিংহামকে একটি প্রাচীন স্থাপনা খুঁজে দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানান। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৪ বছর। তিনি ছিলেন লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ববিদ নন।

স্থানীয় কর্মকর্তা হুয়ান হোসে নুনিয়েস তাঁকে বোঝান, তাঁর উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট।

বিংহাম নিজেই পরে স্বীকার করেছিলেন, ইনকা সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান খুবই সীমিত ছিল। তবু ১৯১১ সালে তিনি ইয়েলের একটি অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে হারানো ইনকা রাজধানীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন।

অভিযানের এক পর্যায়ে তিনি এমন একটি অঞ্চলের কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, যেখানে ১৯৬৪ সালে সাভয় ভিলকাবাম্বার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। কিন্তু খারাপ আবহাওয়া, খাবারের সংকট এবং বহনকারীদের ফিরে যাওয়ার হুমকির কারণে বিংহাম দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।

এরপর তিনি মাচু পিচুকে সেই কিংবদন্তির হারানো নগরী বলে দাবি করেন।

১৯৬৪ সালে সাভয়ের অভিযান

১৯৬৪ সালে ৩৭ বছর বয়সী অভিযাত্রী জিন সাভয় পেরুভিয়ান অভিযাত্রী আন্তোনিও সান্তান্দার কাসেল্লির সঙ্গে দুর্গম এসপিরিতু পাম্পা অঞ্চলে পৌঁছান।

স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে তাঁদের পথ দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, দেবতাদের নিষেধ অমান্য করে কেউ ওই স্থানের সন্ধান প্রকাশ করলে তার মৃত্যু হতে পারে।

Alamy Bingham, who was not an archaeologist, mistakenly claimed the ancient site of Machu Picchu as the fabled lost city (Credit: Alamy)

শেষ পর্যন্ত অনেক অনুরোধের পর স্থানীয়রা তাঁদের শ্যাওলায় ঢাকা প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের কাছে নিয়ে যান।

সাভয় সেখানে পৌঁছে বিস্ময়ে বলেছিলেন, তাঁরা নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। প্রতিদিনই তাঁদের কাছে জায়গাটি আরও বিস্ময়কর হয়ে উঠছিল।

পর্বতের তিনটি বিস্তৃত সমতলে ছড়িয়ে ছিল ধ্বংসাবশেষ। সেখানে ছিল প্রাসাদ, গ্রানাইট ও চুনাপাথরের তৈরি স্থাপনা এবং ঝরনা। শুধু প্রথম সমতলটিই মাচু পিচুর তুলনায় প্রায় চার গুণ বড় ছিল।

সাভয়ের ধারণা হয়, এটাই ছিল স্প্যানিশ বিজেতাদের বিরুদ্ধে শেষ লড়াইয়ের সময় ইনকা শাসকদের আশ্রয়স্থল।

জঙ্গলের সঙ্গে লড়াই করে বিবিসির অভিযান

সাভয়ের অভিযানের মাত্র ছয় সপ্তাহ পর একটি বিবিসি দল একই পথে যাত্রা করে। তাঁদের যাত্রা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক।

দলটি রাবারের নৌকায় নদীর খরস্রোতা পাড়ি দেয়। কোথাও নৌকা উল্টে যায়। এরপর খাড়া গিরিখাত বেয়ে খচ্চরের সাহায্যে এগোতে হয়। ঘন পাহাড়ি অরণ্যের মধ্য দিয়ে পথ তৈরি করতে গাছপালা, লতা ও ঝোপঝাড় কেটে এগোতে হয়।

এক সপ্তাহের কঠিন পথচলার পর তারা ঘন, বৃষ্টিভেজা পাহাড়ি অরণ্যের গভীরে পৌঁছে প্রাচীন ইনকা বসতির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায়।

শত শত বছর ধরে অরণ্যটি নগরীটিকে আড়াল করে রেখেছিল। বিশাল গাছের শিকড় প্রাচীর ও সিঁড়ির ওপর শক্তভাবে জড়িয়ে ছিল। লতাগুল্ম অনেক জায়গায় এতটাই মোটা হয়ে উঠেছিল যে সেগুলো সরানো ছিল অত্যন্ত কঠিন।

সাভয় জঙ্গলকে ঘৃণা করতেন বলে জানালেও তিনি বলেছিলেন, অনুসন্ধান না করে ফিরে আসার চেয়ে ওই জঙ্গলে মৃত্যুবরণ করাও তাঁর কাছে শ্রেয়।

ছাদের টালিতে মিলল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র

সাভয় ও সান্তান্দারের আবিষ্কার একাই প্রমাণ করেনি যে এসপিরিতু পাম্পাই শেষ ইনকা রাজধানী ভিলকাবাম্বা।

তবে ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পাওয়া কিছু পোড়ামাটির ছাদঢাকা টালি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে।

ইনকারা সাধারণত ছাদ তৈরিতে খড় ব্যবহার করত। কিন্তু উদ্ধার হওয়া টালিগুলো ছিল স্প্যানিশ নির্মাণরীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আবার তাতে ইনকা সংস্কৃতির স্বতন্ত্র রং ও নকশার ছাপ ছিল।

WATCH: 'The river suddenly grows into a strenuous opponent'

এই আবিষ্কার পরবর্তী গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। ব্রিটিশ ভূগোলবিদ ও ইনকা সভ্যতার বিশেষজ্ঞ জন হেমিং ঐতিহাসিক বিবরণগুলোর সঙ্গে ধ্বংসাবশেষের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে দেখতে শুরু করেন।

ষোড়শ শতকের ধর্মযাজক মার্তিন দে মুরুয়ার লেখা বিবরণেও নির্বাসিত ইনকা রাজধানীর একটি প্রাসাদের কথা বলা হয়েছিল, যার বিভিন্ন স্তরে টালির ছাদ ছিল। সেই বিবরণের সঙ্গে এসপিরিতু পাম্পার আবিষ্কারের মিল গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দেখা দেয়।

বিংহাম কি তাহলে মাত্র কয়েক কদম দূরে ছিলেন?

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ১৯১১ সালে হিরাম বিংহাম যে হারানো নগরীর সন্ধান করছিলেন, তার প্রকৃত অবস্থানের খুব কাছ দিয়েই তিনি হেঁটে গিয়েছিলেন।

কিন্তু তিনি সঠিক জায়গায় থামেননি। পরে মাচু পিচুকেই হারানো ভিলকাবাম্বা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

সাভয়ের অভিযান সেই পুরোনো ভুল ধারণাকে বদলে দেয়। বহু বছর ধরে কিংবদন্তি ও ইতিহাসের মাঝামাঝি অবস্থান করা ভিলকাবাম্বাকে আবার বাস্তব ইতিহাসের আলোচনায় ফিরিয়ে আনে।

সাভয়ের ভাষায়, নগরীটির অস্তিত্বের কথা এত দীর্ঘ সময় ধরে কেবল কিংবদন্তি হিসেবে প্রচলিত ছিল যে তা ইতিহাস থেকে প্রায় মিথে পরিণত হয়েছিল। তাঁর অভিযানের পর সেটি আবার ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

Lost City of the Incas – Machu Picchu ⛰️✨ Hidden high in the Andes Mountains of Peru, Machu Picchu is one of the most breathtaking ancient sites in the world. Surrounded by

হারানো ইনকা সম্পদের রহস্য এখনো অমীমাংসিত

তবে ভিলকাবাম্বার গল্প এখানেই শেষ নয়।

সাভয়ের বিশ্বাস ছিল, স্প্যানিশদের হাতে পড়ার আগে ইনকারা বিপুল পরিমাণ সোনা ও মূল্যবান সম্পদ লুকিয়ে ফেলেছিল। তাঁর ধারণা ছিল, এসব সম্পদের একটি অংশ হ্রদ ও গুহায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

অভিযান চালানোর সময় তিনি এমন কিছু হ্রদের সন্ধান পাওয়ার কথাও বলেছিলেন, যেগুলো মানচিত্রে ছিল না। তাঁর দাবি ছিল, অচিহ্নিত দেয়ালঘেরা সুড়ঙ্গও তিনি খুঁজে পেয়েছেন।

পেরুর প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এলাকাটি দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে অক্ষত থাকায় সেখানে আরও অনেক অজানা তথ্য ও স্থাপনা আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি ঘন অরণ্যের আরও গভীরে অন্য কোনো প্রাচীন নগরীর অস্তিত্ব নিয়েও বিভিন্ন সময়ে ধারণা সামনে এসেছে।

তবে কিংবদন্তির সেই ‘হারানো ইনকা ধনভাণ্ডার’ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ভিলকাবাম্বার ধ্বংসাবশেষ তাই শুধু একটি হারানো নগরীর সন্ধানের গল্প নয়; এটি ইতিহাস, কিংবদন্তি, অভিযাত্রা এবং শতাব্দীজুড়ে টিকে থাকা এক রহস্যের কাহিনি।