ইরান যুদ্ধ প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। আর যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় ভোটারদের অসন্তোষ এখন রিপাবলিকান প্রার্থীদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ নিয়ে অস্বস্তিতে রিপাবলিকানরা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে রিপাবলিকান দল। একই সঙ্গে সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও ধরে রাখার চেষ্টা করছে তারা। কিন্তু বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ইরান যুদ্ধের প্রতি ভোটারদের সমর্থন বেশ কম।
তারপরও নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলোর বেশির ভাগ রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের পাশে থাকার পথ বেছে নিয়েছেন। তাদের ধারণা, জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপও ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব হবে।
আইওয়ার রিপাবলিকান প্রতিনিধি জ্যাক নান, যিনি আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেছেন, বলেছেন, বিষয়টি এখনই শেষ করা দরকার। তাঁর মতে, ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধ বন্ধের কথা বলে মূলত হাল ছেড়ে দেওয়ার অবস্থান নিচ্ছে।
জ্বালানির দামই বড় রাজনৈতিক বোঝা

অ্যারিজোনার রিপাবলিকান কৌশলবিদ ব্যারেট মারসনের মতে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ার চাপ রিপাবলিকানদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এমন একজন মানুষ আছেন যিনি জ্বালানির দামের বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত নন, আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই একজনই দলের রাজনৈতিক ভাগ্য অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করেন।
রিপাবলিকানদের জন্য পরিস্থিতিটিকে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। একদিকে ট্রাম্পকে সমর্থন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ যে অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
পশ্চিম ভার্জিনিয়ার সিনেটর জিম জাস্টিসও যুদ্ধের পরিস্থিতিকে বিশৃঙ্খল বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ সম্পর্কে রিপাবলিকানদের আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে।
ট্রাম্পের অবস্থানেও অস্বস্তি
প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন স্বীকার করেছেন, ইরান সংঘাতের কারণেই জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে। তবে তিনি আশাবাদী যে পরিস্থিতি শিগগিরই নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে এবং জ্বালানি ও খাদ্যের দাম কমে আসবে।
কিন্তু ট্রাম্পের বক্তব্য সব সময় তাঁর দলের নির্বাচনী কৌশলকে সহজ করছে না। তিনি জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কাকে গুরুত্ব না দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের জন্য কখনো ক্ষমা চাইবেন না বলে জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে তিনি এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে নভেম্বরে তিনি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রচারণার প্রয়োজনীয়তা খুব বেশি নেই। তবে ঝুঁকিপূর্ণ রিপাবলিকান প্রার্থীদের সহায়তায় তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক তহবিল থেকে বিপুল অর্থ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন।

ডেমোক্র্যাটদের প্রচারণায় যুদ্ধ বড় অস্ত্র
সোমবার প্রকাশিত একটি জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইরান পরিস্থিতি সামলাতে ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি মাত্র ১০ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৩ জনের সমর্থন রয়েছে।
এই দুর্বল জনসমর্থনকে কাজে লাগাতে শুরু করেছে ডেমোক্র্যাটরা। জর্জিয়ার সিনেটর জন অসফ, যিনি নিজেও মধ্যবর্তী নির্বাচনে কঠিন লড়াইয়ের মুখে রয়েছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন।
তিনি অভিযোগ করেছেন, যুদ্ধের কারণে যখন সাধারণ মানুষ ভুগছেন, তখন ট্রাম্প বিষয়টি থেকে বিচ্ছিন্ন ও অন্যমনস্ক হয়ে আছেন।
ডেমোক্র্যাটপন্থী সংগঠনগুলোও বিজ্ঞাপনে রিপাবলিকানদের ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ ও বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়ের দল হিসেবে তুলে ধরছে।
রিপাবলিকান শিবিরে ব্যতিক্রমী কয়েকজন
ঝুঁকিপূর্ণ আসনের কিছু রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের ক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। মিশিগানের প্রতিনিধি টম ব্যারেট এবং পেনসিলভানিয়ার প্রতিনিধি ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
তবে তাঁরা ব্যতিক্রম। দলের অধিকাংশ নেতা মনে করছেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানো এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

ভার্জিনিয়ার প্রতিনিধি জেন কিগ্যান্স অবশ্য সংঘাতের দ্রুত সমাধানের পক্ষে মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পের সামরিক নীতির প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার কথাও বলেছেন।
‘একজন মানুষের হাতেই অনেকটা ভাগ্য’
রিপাবলিকানদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ট্রাম্পের প্রতি দলীয় আনুগত্য ধরে রেখে কীভাবে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষোভ সামলানো যায়।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ তত বাড়তে পারে। আর সেই অসন্তোষ যদি নির্বাচনের দিন পর্যন্ত টিকে থাকে, তাহলে অল্প ব্যবধানে জয়-পরাজয়ের সম্ভাবনা থাকা আসনগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীরাই সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারেন।
ফলে ইরান যুদ্ধ শুধু আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে থাকছে না; এটি ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তাঁর দলের ভেতরে এখনো শক্তিশালী হলেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব যদি সাধারণ ভোটারের অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দেয়, তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ট্রাম্পের প্রতি দলীয় আনুগত্য—এই তিনটি বিষয়ই এখন রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















