বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে অতীতের মতপার্থক্যে আটকে না রেখে পারস্পরিক ও নিঃশর্ত আস্থার ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেছেন, দুই দেশের তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষাই ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশনা হওয়া উচিত।
মঙ্গলবার রাতে ঢাকার একটি হোটেলে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সম্মানে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ভারতের শিল্প ও ব্যবসায়ী সংগঠনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল।
অতীত মনে রাখতে হবে, তবে তাতে আটকে থাকা যাবে না
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশকে নিজেদের অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে সামনে এগোতে হবে। অতীত ভুলে যাওয়ার কথা তিনি বলছেন না; বরং অতীতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধান করে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তার ভাষায়, স্থবির হয়ে থাকলে কোনো সম্পর্ক এগিয়ে যেতে পারে না। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে ভবিষ্যতের দিকে তাকানো জরুরি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশই সম্ভাবনাময়। দুই দেশের তরুণেরা ভালো সুযোগ, সমৃদ্ধি ও উন্নত ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা করছে। তাই তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করা দরকার।

সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক আস্থা
দীনেশ ত্রিবেদীর মতে, দীর্ঘস্থায়ী যেকোনো সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক ও নিঃশর্ত আস্থা। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে একে অপরের সমস্যা ও উদ্বেগ বোঝার মানসিকতা থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কিছু সমস্যা রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, এসব বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠক হলে বিদ্যমান অনেক মতপার্থক্য দূর করার সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে আশাবাদ
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আশ্বাসের কথাও তুলে ধরেন দীনেশ ত্রিবেদী।
তিনি বলেন, ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে নরেন্দ্র মোদি দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
দীনেশ ত্রিবেদী জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গেলে তাকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হবে বলে নরেন্দ্র মোদি আশ্বস্ত করেছেন। তার প্রত্যাশা, এ সফর স্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং এর সুফল দুই দেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় উভয়েই পাবে।
ব্যবসায়ীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান ভারতীয় হাইকমিশনার। তার মতে, কোনো সরকার একা সবকিছু করতে পারে না। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়াতে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো গেলে পারস্পরিক দূরত্বও কমবে। ব্যবসায়ী সমাজ দুই দেশের সম্পর্কের নতুন সেতু গড়ে তুলতে পারে।
প্রতিবেশী নীতিতে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেয় ভারত

ভারতের প্রতিবেশী-প্রথম নীতির কথা উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারত বিশেষ গুরুত্ব দেয়। প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা এবং প্রয়োজনীয়তার সম্পর্ক রয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবারেও নানা সময়ে মতপার্থক্য হয়। তাই কোনো সমস্যা দেখা দিলেই সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়া উচিত নয়।
তার মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের রয়েছে অভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতির দীর্ঘ বন্ধন। এই ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে।
মতপার্থক্য থাকাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে—এ কথা স্বীকার করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, প্রাণবন্ত গণতন্ত্রে মতভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক।
তিনি জানান, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতের কর্মকর্তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন। এর লক্ষ্য হলো মতপার্থক্য কমানো এবং বাংলাদেশের মানুষের উদ্বেগ ও প্রত্যাশাগুলো আরও ভালোভাবে বোঝা।
বাংলাদেশের মানুষের উদ্বেগ ভারত গভীরভাবে উপলব্ধি করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে সমান অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দেখতে হবে। একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও বৈঠকের মাধ্যমেই অনেক উদ্বেগ দূর করা সম্ভব।
নতুন বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের প্রসঙ্গ তুলে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, নতুন প্রজন্ম অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসেছে। তাদের সামনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নত জীবনের সুযোগ তৈরি করা এখন জরুরি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের লক্ষ্য মূলত একই—দুই দেশের মানুষের জন্য শান্তি, উন্নতি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। তাই তরুণদের ভবিষ্যৎ গড়তে দুই দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
দুই দেশের ব্যবসায়ী সমাজকেও এই নতুন যাত্রায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার এই পথচলা দুই পক্ষের একসঙ্গে হওয়া উচিত।
সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। তার প্রত্যাশা, দুই দেশের অভিন্ন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের বন্ধনকে কাজে লাগিয়ে সম্পর্ক আরও গভীর ও স্থায়ী হবে।
তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন সুরে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে সম্পর্কের একটি স্বর্ণালি অধ্যায়।
এদিকে ভারতীয় শিল্প ও ব্যবসায়ী সংগঠনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলটি বুধবার সকালে ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে। সফরকালে বাংলাদেশের সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়েছে। আলোচনায় পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার বিষয়, নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রতিনিধিদলে ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক সংগঠনের ১৪ জন নেতা ছিলেন। তাদের মধ্যে ওষুধ, অবকাঠামো, শিল্প, প্রকৌশল, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য খাতের প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
সফরের মূল লক্ষ্য ছিল দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ খুঁজে বের করা এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ককে আরও সক্রিয় করা।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ তাই শুধু কূটনৈতিক বৈঠকের ওপর নয়, দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও তরুণ প্রজন্মের জন্য তৈরি হওয়া সুযোগের ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশার বার্তা দিয়েছেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















