বিশ্ববাজারে বন্ডের সুদহার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠায় মঙ্গলবার স্বর্ণের দামে বড় ধরনের পতন হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনা এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। এতে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ কিছুটা কমেছে।
স্বর্ণের দামে পতন
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৩৬৪ দশমিক ৯০ ডলারে নেমে আসে। একই দিনে ডিসেম্বর সরবরাহের জন্য স্বর্ণের আগাম চুক্তির দামও ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪২০ দশমিক ৬০ ডলারে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বন্ডের সুদহার দ্রুত বাড়তে থাকায় স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। কারণ স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ পাওয়া যায় না। ফলে সুদহার বাড়লে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বন্ডের মতো সুদ প্রদানকারী সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

কয়েক দশকের সর্বোচ্চ বন্ড সুদহার
যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও জার্মানিতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যয় কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার ২০০৭ সালের মাঝামাঝির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
বিশ্লেষক পিটার গ্রান্ট বলেন, বন্ডের বিভিন্ন মেয়াদের সুদহারের ব্যবধান বাড়তে থাকায় স্বর্ণের জন্য তা প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিও মঙ্গলবার স্বর্ণের দুর্বলতার অন্যতম কারণ।
তবে তিনি মনে করেন, স্বর্ণের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা এখনো ইতিবাচক। বর্তমান দরপতনের পর বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
তেলের দাম ও ইরান সংকট
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম টানা তৃতীয় দিনের মতো বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার বিষয়টি জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইরান জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। ফলে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা।

জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় উচ্চ সুদহার ধরে রাখতে হতে পারে। এতে স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদের ওপর চাপ বাড়ে।
সুদহারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ফেডের নথির অপেক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্যে জুলাইয়ে কর্মসংস্থান কমেছে, মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল এবং খুচরা বিক্রিও দুর্বল হয়েছে। এসব তথ্য সুদহার কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করলেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সেই সম্ভাবনাকে জটিল করে তুলেছে।
এখন বিনিয়োগকারীদের নজর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ নীতিনির্ধারণী বৈঠকের কার্যবিবরণীর দিকে। বুধবার প্রকাশিতব্য ওই নথি থেকে ভবিষ্যতে সুদহারের গতিপথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়ার আশা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
পাঁচ হাজার ডলারের পথে বড় চ্যালেঞ্জ
একটি বড় মার্কিন ব্যাংকের বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণ কেনার প্রবণতা এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা দামকে প্রায় ৪ হাজার ডলারের কাছাকাছি রাখার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলারে নিতে হলে বিনিয়োগের চাহিদা আরও দ্রুত বাড়তে হবে।
অন্যদিকে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে। প্রতি আউন্স রুপার দাম ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ৬৩ দশমিক ৯৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্লাটিনামের দাম কমেছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং প্যালাডিয়ামের দাম কমেছে ৩ দশমিক ১ শতাংশ।
স্বর্ণের বাজারে সাময়িক চাপ তৈরি হলেও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মূল্যস্ফীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির পরিবর্তন আগামী দিনগুলোতে মূল্যবান ধাতুটির দামের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















