১২:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
অতীত ভুলে নয়, মতপার্থক্য মিটিয়ে সামনে এগোতে হবে: দীনেশ ত্রিবেদী ইরান যুদ্ধেই কি মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপদে পড়ছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল? স্কুলে হামলা চালিয়ে সহপাঠীকে হত্যা, আত্মহত্যার আগে সরাসরি সম্প্রচার করল শিক্ষার্থী ডলার বন্ড তুলতে দৌড়াচ্ছে ভারতের চার বেসরকারি ব্যাংক বন্ডের সুদহার কয়েক দশকের সর্বোচ্চ, কমল স্বর্ণের দাম চেয়ারম্যানের বিদায়ের পরই টাটা সন্সের বার্ষিক সভা স্থগিত মার্কিন সামরিক গবেষণার হাত ধরে চীনের রোবট কুকুরের উত্থান পশ্চিম তীরে অবরুদ্ধ বাড়িতে মার্কিন পতাকা তুলেও রক্ষা পেলেন না ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মুখোমুখি, আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ ট্রাম্পের হারানো ইনকা নগরীর খোঁজে ‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’, ৫৩ বছর পর মিলল সত্যের সন্ধান

মার্কিন সামরিক গবেষণার হাত ধরে চীনের রোবট কুকুরের উত্থান

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল প্রকাশ্যে আসার পর সেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে চীনের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রি রোবোটিক্স দ্রুত বাজার দখল করেছে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিট্রির জনপ্রিয় রোবট কুকুরের নকশার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গবেষণায় তৈরি প্রযুক্তির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে।

সামরিক গবেষণা থেকে বাণিজ্যিক সাফল্য

ইউনিট্রির গো সিরিজের অন্যতম জনপ্রিয় মডেল গো২ ২০২৩ সালে বাজারে আসে। প্রায় ১ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার দামের এই রোবট কুকুর খুব অল্প সময়ের মধ্যে চার পায়ের রোবটের বৈশ্বিক বাজারে প্রতিষ্ঠানটিকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ইউনিট্রির মূল্য প্রায় ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর গবেষণা কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অবদান। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর গবেষণাগার এবং অন্যান্য সামরিক কর্মসূচির অর্থায়নে চার পায়ের রোবটের চলাচল, ভারসাম্য ও ভূখণ্ড বুঝে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা হয়েছে।

গবেষক গ্যাভিন কেনিলির ভাষায়, সেনাবাহিনীর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পটি কার্যত এমন একটি প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে ইউনিট্রির প্রথম বড় পরিসরের রোবট তৈরিতে কাজে লাগে।

মিল রয়েছে মিলিমিটার পর্যন্ত

How US military funding propelled China's robot dogs | Reuters

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির রোবোটিক্স গবেষণাগারে কাজ করা বেন কাটজ জানিয়েছেন, ইউনিট্রির গো সিরিজের রোবটগুলোর আকার ও নকশা তাঁর সহায়তায় তৈরি বিখ্যাত ‘মিনি চিতা’ রোবটের সঙ্গে প্রায় মিলিমিটার পর্যায় পর্যন্ত মিলে যায়।

‘মিনি চিতা’ তৈরি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার ধারাবাহিকতায়। ২০১৯ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকেরা এমন একটি রোবট উপস্থাপন করেন, যা আগের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে আরও শক্তিশালী ছিল এবং এমনকি পেছন দিকে ডিগবাজিও দিতে পারত।

এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রোবটের পায়ে মোটর স্থাপন করা। এতে ভারী কেন্দ্রীয় গিয়ার ব্যবস্থা বাদ দেওয়া সম্ভব হয় এবং রোবট ভূখণ্ডের পরিবর্তন বুঝে আরও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হয়।

প্রযুক্তি গোপন ছিল না

তবে বিষয়টি সরাসরি প্রযুক্তি চুরির ঘটনা—এমন দাবি করেননি গবেষকেরা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রকাশ্যে প্রকাশ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা।

অর্থাৎ, সমস্যাটি গবেষণা প্রকাশের চেয়ে বরং গবেষণাকে দ্রুত বাণিজ্যিক উৎপাদনে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতায়। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরাই বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি গবেষণা গোপন করে রাখার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত গবেষণার ফল দ্রুত শিল্পে রূপান্তরের ব্যবস্থা করা।

চীনের শিল্পনীতির কাছে পিছিয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র

How US military funding propelled China's robot dogs

এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার আরও বড় একটি দুর্বলতা সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র উদ্ভাবন ও সফটওয়্যার উন্নয়নে শক্তিশালী হলেও নতুন প্রযুক্তিকে ব্যাপক উৎপাদনে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি, শিল্পভিত্তি, দক্ষ কর্মী এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে বলে গবেষকেরা মনে করেন।

অন্যদিকে, চীন দীর্ঘদিন ধরে সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ড্রোন, রোবোটিক্সসহ কৌশলগত প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। কম মুনাফায়ও বড় পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা এবং বিস্তৃত সরবরাহব্যবস্থা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত বাজার দখলের সুযোগ দিয়েছে।

রোবট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মোটর, গিয়ার, নিয়ন্ত্রক যন্ত্র, চালনা-ব্যবস্থা এবং চুম্বকের মতো উপাদানের উৎপাদন ও সরবরাহে চীনের বড় সুবিধা রয়েছে। ইউনিট্রির ঘাঁটির আশপাশে এসব যন্ত্রাংশের বিপুলসংখ্যক সরবরাহকারীও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন এখনও ব্যয়বহুল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ঘোস্ট রোবোটিক্স সামরিক ও সরকারি গ্রাহকদের জন্য উন্নত রোবট তৈরি করলেও ইউনিট্রির তুলনায় তাদের উৎপাদনের পরিমাণ অনেক কম এবং খরচও বেশি। প্রতিষ্ঠানটির ভিশন ৬০ রোবটের দাম ১ লাখ ৬৫ হাজার ডলারের বেশি, যেখানে ইউনিট্রির বি সিরিজের একটি রোবট যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১ লাখ ডলারের কম দামে তালিকাভুক্ত।

ইউনিট্রি গত বছর ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি মানবাকৃতির রোবট এবং ১৮ হাজারের বেশি চার পায়ের রোবট বিক্রি করেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির নথিতে উল্লেখ রয়েছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান এখনো এ ধরনের রোবট ব্যাপক হারে উৎপাদন করতে পারেনি।

যুদ্ধক্ষেত্রেও বাড়ছে আগ্রহ

রোবট কুকুর এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত না হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—দুই দেশের সামরিক বাহিনীই এর সম্ভাবনা নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ইউনিট্রির গো২ রোবটকে চীনা সেনাদের সঙ্গে দেখা গেছে। আবার প্রতিষ্ঠানটির বি১ সিরিজের পরিবর্তিত একটি রোবটের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রও প্রদর্শন করা হয়েছে।

How US military funding propelled China’s robot dogs

ইউনিট্রি অবশ্য প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তাদের পণ্য বেসামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি ঘোষণায়ও সই করেছিল, যেখানে রোবটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতা করা হয়েছিল।

তবু রোবটের সামরিক সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী নিজস্ব পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকায় ইউনিট্রির দুটি গো২ রোবট কেনার জন্য বিশেষ অনুমোদন নিয়েছিল বলে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

আসল প্রতিযোগিতা উৎপাদনের সক্ষমতায়

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা মনে করেন, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শুধু আমদানি নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যিক বাধা তৈরি করে সফল হওয়া যাবে না। গবেষণার ফলকে দ্রুত পণ্য বানানো, ব্যাপক উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাই বড় চ্যালেঞ্জ।

রোবোটিক্স গবেষক রেইক নুহটসেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে না পারাকে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, চীনের ওপর শুধু বাণিজ্যিক বাধা আরোপ করলেই যুক্তরাষ্ট্রের রোবট শিল্প শক্তিশালী হবে না।

গ্যাভিন কেনিলির বক্তব্যে প্রতিযোগিতার মূল বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি শুধু দুই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লড়াই নয়; বরং একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি কোম্পানি, অন্যদিকে চীনের সমন্বিত জাতীয় শিল্পকৌশল।

How U.S. military funding propelled China's robot dogs

মিত্রদের নিয়েও নতুন ভাবনা

চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। ঘোস্ট রোবোটিক্স ইতিমধ্যে চীন থেকে মোটর সরবরাহ কমিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সরবরাহ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে চীনা চুম্বক ও কিছু ধাতব উপাদানের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কাটানো এখনও কঠিন বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে রোবট কুকুরের এই গল্প শুধু একটি প্রযুক্তির উত্থানের গল্প নয়। এটি দেখাচ্ছে, কোনো দেশ গবেষণায় এগিয়ে থাকলেই যে সেই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক বাজারও তার দখলে থাকবে, এমন নয়। গবেষণাকে দ্রুত উৎপাদনে রূপ দেওয়া, সস্তায় ব্যাপক পরিসরে পণ্য তৈরি করা এবং শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির বাজার নির্ধারণ করতে পারে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

অতীত ভুলে নয়, মতপার্থক্য মিটিয়ে সামনে এগোতে হবে: দীনেশ ত্রিবেদী

মার্কিন সামরিক গবেষণার হাত ধরে চীনের রোবট কুকুরের উত্থান

১১:২৫:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল প্রকাশ্যে আসার পর সেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে চীনের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রি রোবোটিক্স দ্রুত বাজার দখল করেছে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিট্রির জনপ্রিয় রোবট কুকুরের নকশার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গবেষণায় তৈরি প্রযুক্তির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে।

সামরিক গবেষণা থেকে বাণিজ্যিক সাফল্য

ইউনিট্রির গো সিরিজের অন্যতম জনপ্রিয় মডেল গো২ ২০২৩ সালে বাজারে আসে। প্রায় ১ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার দামের এই রোবট কুকুর খুব অল্প সময়ের মধ্যে চার পায়ের রোবটের বৈশ্বিক বাজারে প্রতিষ্ঠানটিকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ইউনিট্রির মূল্য প্রায় ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর গবেষণা কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অবদান। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর গবেষণাগার এবং অন্যান্য সামরিক কর্মসূচির অর্থায়নে চার পায়ের রোবটের চলাচল, ভারসাম্য ও ভূখণ্ড বুঝে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা হয়েছে।

গবেষক গ্যাভিন কেনিলির ভাষায়, সেনাবাহিনীর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পটি কার্যত এমন একটি প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে ইউনিট্রির প্রথম বড় পরিসরের রোবট তৈরিতে কাজে লাগে।

মিল রয়েছে মিলিমিটার পর্যন্ত

How US military funding propelled China's robot dogs | Reuters

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির রোবোটিক্স গবেষণাগারে কাজ করা বেন কাটজ জানিয়েছেন, ইউনিট্রির গো সিরিজের রোবটগুলোর আকার ও নকশা তাঁর সহায়তায় তৈরি বিখ্যাত ‘মিনি চিতা’ রোবটের সঙ্গে প্রায় মিলিমিটার পর্যায় পর্যন্ত মিলে যায়।

‘মিনি চিতা’ তৈরি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার ধারাবাহিকতায়। ২০১৯ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকেরা এমন একটি রোবট উপস্থাপন করেন, যা আগের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে আরও শক্তিশালী ছিল এবং এমনকি পেছন দিকে ডিগবাজিও দিতে পারত।

এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রোবটের পায়ে মোটর স্থাপন করা। এতে ভারী কেন্দ্রীয় গিয়ার ব্যবস্থা বাদ দেওয়া সম্ভব হয় এবং রোবট ভূখণ্ডের পরিবর্তন বুঝে আরও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হয়।

প্রযুক্তি গোপন ছিল না

তবে বিষয়টি সরাসরি প্রযুক্তি চুরির ঘটনা—এমন দাবি করেননি গবেষকেরা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রকাশ্যে প্রকাশ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা।

অর্থাৎ, সমস্যাটি গবেষণা প্রকাশের চেয়ে বরং গবেষণাকে দ্রুত বাণিজ্যিক উৎপাদনে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতায়। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরাই বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি গবেষণা গোপন করে রাখার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত গবেষণার ফল দ্রুত শিল্পে রূপান্তরের ব্যবস্থা করা।

চীনের শিল্পনীতির কাছে পিছিয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র

How US military funding propelled China's robot dogs

এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার আরও বড় একটি দুর্বলতা সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র উদ্ভাবন ও সফটওয়্যার উন্নয়নে শক্তিশালী হলেও নতুন প্রযুক্তিকে ব্যাপক উৎপাদনে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি, শিল্পভিত্তি, দক্ষ কর্মী এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে বলে গবেষকেরা মনে করেন।

অন্যদিকে, চীন দীর্ঘদিন ধরে সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ড্রোন, রোবোটিক্সসহ কৌশলগত প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। কম মুনাফায়ও বড় পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা এবং বিস্তৃত সরবরাহব্যবস্থা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত বাজার দখলের সুযোগ দিয়েছে।

রোবট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মোটর, গিয়ার, নিয়ন্ত্রক যন্ত্র, চালনা-ব্যবস্থা এবং চুম্বকের মতো উপাদানের উৎপাদন ও সরবরাহে চীনের বড় সুবিধা রয়েছে। ইউনিট্রির ঘাঁটির আশপাশে এসব যন্ত্রাংশের বিপুলসংখ্যক সরবরাহকারীও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন এখনও ব্যয়বহুল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ঘোস্ট রোবোটিক্স সামরিক ও সরকারি গ্রাহকদের জন্য উন্নত রোবট তৈরি করলেও ইউনিট্রির তুলনায় তাদের উৎপাদনের পরিমাণ অনেক কম এবং খরচও বেশি। প্রতিষ্ঠানটির ভিশন ৬০ রোবটের দাম ১ লাখ ৬৫ হাজার ডলারের বেশি, যেখানে ইউনিট্রির বি সিরিজের একটি রোবট যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১ লাখ ডলারের কম দামে তালিকাভুক্ত।

ইউনিট্রি গত বছর ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি মানবাকৃতির রোবট এবং ১৮ হাজারের বেশি চার পায়ের রোবট বিক্রি করেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির নথিতে উল্লেখ রয়েছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান এখনো এ ধরনের রোবট ব্যাপক হারে উৎপাদন করতে পারেনি।

যুদ্ধক্ষেত্রেও বাড়ছে আগ্রহ

রোবট কুকুর এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত না হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—দুই দেশের সামরিক বাহিনীই এর সম্ভাবনা নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ইউনিট্রির গো২ রোবটকে চীনা সেনাদের সঙ্গে দেখা গেছে। আবার প্রতিষ্ঠানটির বি১ সিরিজের পরিবর্তিত একটি রোবটের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রও প্রদর্শন করা হয়েছে।

How US military funding propelled China’s robot dogs

ইউনিট্রি অবশ্য প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তাদের পণ্য বেসামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি ঘোষণায়ও সই করেছিল, যেখানে রোবটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতা করা হয়েছিল।

তবু রোবটের সামরিক সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী নিজস্ব পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকায় ইউনিট্রির দুটি গো২ রোবট কেনার জন্য বিশেষ অনুমোদন নিয়েছিল বলে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

আসল প্রতিযোগিতা উৎপাদনের সক্ষমতায়

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা মনে করেন, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শুধু আমদানি নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যিক বাধা তৈরি করে সফল হওয়া যাবে না। গবেষণার ফলকে দ্রুত পণ্য বানানো, ব্যাপক উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাই বড় চ্যালেঞ্জ।

রোবোটিক্স গবেষক রেইক নুহটসেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে না পারাকে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, চীনের ওপর শুধু বাণিজ্যিক বাধা আরোপ করলেই যুক্তরাষ্ট্রের রোবট শিল্প শক্তিশালী হবে না।

গ্যাভিন কেনিলির বক্তব্যে প্রতিযোগিতার মূল বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি শুধু দুই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লড়াই নয়; বরং একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি কোম্পানি, অন্যদিকে চীনের সমন্বিত জাতীয় শিল্পকৌশল।

How U.S. military funding propelled China's robot dogs

মিত্রদের নিয়েও নতুন ভাবনা

চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। ঘোস্ট রোবোটিক্স ইতিমধ্যে চীন থেকে মোটর সরবরাহ কমিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সরবরাহ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে চীনা চুম্বক ও কিছু ধাতব উপাদানের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কাটানো এখনও কঠিন বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে রোবট কুকুরের এই গল্প শুধু একটি প্রযুক্তির উত্থানের গল্প নয়। এটি দেখাচ্ছে, কোনো দেশ গবেষণায় এগিয়ে থাকলেই যে সেই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক বাজারও তার দখলে থাকবে, এমন নয়। গবেষণাকে দ্রুত উৎপাদনে রূপ দেওয়া, সস্তায় ব্যাপক পরিসরে পণ্য তৈরি করা এবং শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির বাজার নির্ধারণ করতে পারে।