ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামে বসতবাড়ি ঘিরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের অবরোধের মধ্যে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক লুই রিদি। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বসতিস্থাপনকারীরা তাঁর বাড়িসহ গ্রামের তিনটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ঘিরে রেখেছে। পরিস্থিতি থেকে নিজেদের রক্ষায় রিদি বাড়ির ছাদে বিশাল মার্কিন পতাকা তুললেও মঙ্গলবার এক বসতিস্থাপনকারী তাঁর জমিতে ঢুকে পড়েন।
বাড়িতে ফিরেই উত্তেজনার মুখে রিদি
যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘ যাত্রা শেষে সোমবার রাতে কুসরায় পৌঁছান রিদি। তাঁর আশঙ্কা ছিল, বাড়ি ও জমি বসতিস্থাপনকারীদের দখলে চলে যেতে পারে। গ্রামে পৌঁছানোর পর মঙ্গলবার সকালে তিনি নিজের বাড়ির আশপাশে থাকা চেরি ও ডুমুরগাছের মধ্যে হাঁটছিলেন।
এ সময় ওপরের পাহাড়ের দিক থেকে এক ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী এগিয়ে এসে তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি হন। ওই ব্যক্তি এক হাতে ধর্মীয় গ্রন্থের মতো একটি বই ধরে ছিলেন এবং অন্য হাতে মুঠোফোনে রিদির ছবি ধারণ করছিলেন।
বসতিস্থাপনকারী রিদিকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন করেন, তিনি সেখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এসেছেন কি না। জবাবে রিদি তাঁকে সন্ত্রাসী বসতিস্থাপনকারী বলে অভিহিত করেন। দুজনই নিজেদের মুঠোফোনে পুরো ঘটনার দৃশ্য ধারণ করছিলেন।

সেনারা এসে বসতিস্থাপনকারীকে সরে যেতে বলে
উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে একটি ইসরায়েলি সামরিক যান কয়েকবার ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে যায়। পরে কয়েকজন সেনা এসে বসতিস্থাপনকারীর সঙ্গে কথা বলেন এবং জানান, এলাকাটি সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও প্রবেশ-নিষিদ্ধ এলাকা।
তখন ওই বসতিস্থাপনকারী সেনাদের বলেন, ফিলিস্তিনিরা চলে গেলে তিনিও চলে যাবেন। তাঁর দাবি ছিল, তাঁরা নিজেদের এলাকা পাহারা দিচ্ছেন।
একপর্যায়ে তিনি রাস্তা ধরে সরে যান। পরে আরও দুই বসতিস্থাপনকারী তাঁর সঙ্গে যোগ দেন এবং তিনজনই পাহাড়ের দিকে চলে যান।
এরপর এক ইসরায়েলি সেনা রিদিকে বাড়ির ভেতরে চলে যেতে বলেন। তিনি রিদিকে জানান, বসতিস্থাপনকারীরা চলে গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
তবে রিদির বক্তব্য ছিল, তাঁর ব্যক্তিগত জমিতে ওই বসতিস্থাপনকারীর প্রবেশ অবৈধ। তাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা উচিত।
নিরাপত্তার আশায় বাড়িতে মার্কিন পতাকা
বসতিস্থাপনকারীদের অবরোধের মধ্যে বাড়ির ছাদে মার্কিন পতাকা তোলার সিদ্ধান্ত নেন রিদি। তাঁর আশা ছিল, মার্কিন পতাকা দেখে বসতিস্থাপনকারীরা হয়তো সেখানে প্রবেশের সাহস করবে না।
রিদির ভাষ্য, কোনো কারণে তিনি যদি নিজের বাড়ি রক্ষা করতে ব্যর্থ হন এবং বসতিস্থাপনকারীরা সেখানে ঢুকে পড়ে, তাহলে একসময় তারা নিজেদের পতাকা তুলবে। তার আগে তাদের মার্কিন পতাকা সরাতে হবে—এটাই ছিল তাঁর প্রতীকী বার্তা।

পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে বসতি সম্প্রসারণের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই বিভিন্ন এলাকায় চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
প্রতিবেশীর বাড়িতে হামলার অভিযোগ
রিদির প্রতিবেশী ইব্রাহিম হাসানও বসতিস্থাপনকারীদের হামলার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, গত মাসে সামরিক পোশাক পরা কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে থাকা বসতিস্থাপনকারীরা তাঁর বাড়ির জানালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাঁকে মারধর করেন। পরে বাধ্য হয়ে তাঁকে নিজের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়।
এ ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মার্কিন নাগরিকদের জন্য পতাকা যেন নিরাপত্তার প্রতীক
পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক বসবাস করেন। কুসরার কাছের তুরমুস আয়া গ্রামে স্থানীয় কর্মকর্তাদের দাবি, সেখানকার বাসিন্দাদের বড় একটি অংশই মার্কিন নাগরিক।
গ্রামের ফিলিস্তিনি-মার্কিন সম্প্রদায়ের মুখপাত্র ইয়াসের আলকাম বলেন, অনেক পরিবার নিজেদের বাড়িতে মার্কিন পতাকা ওড়ায় নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে। তাঁর মতে, এটি শুধু বসতিস্থাপনকারীদের নয়, ইসরায়েলি সেনাদেরও কিছুটা সতর্ক রাখার উদ্দেশ্যে করা হয়।
তিনি আরও বলেন, এর মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের কাছেও সরাসরি বার্তা দেওয়া হয়—মার্কিন নাগরিকরা পশ্চিম তীরে হামলার মুখে পড়ছেন এবং সেই সংঘাতের সঙ্গে মার্কিন অর্থ ও অস্ত্রেরও সম্পর্ক রয়েছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কঠোর মন্তব্য
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি গত বৃহস্পতিবার কুসরায় রিদির বাড়ি ঘিরে রাখা বসতিস্থাপনকারীদের কঠোর ভাষায় নিন্দা করেন এবং তাদের ‘ইসরায়েলি সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করেন।
এরপর মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর প্রকাশ্যে বসতিস্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন।

তবে কুসরায় চলমান অবরোধ নিয়ে নেতানিয়াহু এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
ঘটনাটি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ঘিরে বসতিস্থাপনকারীদের তৎপরতা এবং এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান চাপকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
পশ্চিম তীরে নিজের বাড়ি রক্ষায় লুই রিদির মার্কিন পতাকা উত্তোলন তাই শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেষ্টা নয়, বরং অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর অসহায়ত্ব এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সুরক্ষার প্রত্যাশারও প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















