হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না এবং শিগগির আলোচনারও পরিকল্পনা নেই। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।
তবে ইরান ট্রাম্পের বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির শীর্ষ আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে।
আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে বিপরীত বক্তব্য
মঙ্গলবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা কথোপকথন চলছে না এবং কোনো আলোচনাও নির্ধারিত হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, নৌ অবরোধ কার্যকর রয়েছে, তবে হরমুজ প্রণালি সচল এবং সেখানকার সব সমুদ্র মাইন সরিয়ে ফেলা হয়েছে অথবা বিস্ফোরিত করা হয়েছে।
এর মাত্র এক দিন আগে অবশ্য ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলমান এবং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় তা আরও জোরালো হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই আলোচনার পরিস্থিতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে।

প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি সোমবার শেষ হয়েছে। এর পর কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ইরান আরও আক্রমণাত্মক সামরিক অবস্থানে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে।
জাহাজ চলাচলে এখনো বড় বাধা
ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকার দাবি করলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে সেখানে জাহাজ চলাচল এখনো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, ইরান থেকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। পরে দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়ে থাকতে পারে। তবে ইরান এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজ অজ্ঞাত একটি নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি একজন নাবিক হতাহত হয়েছেন। ওমানের উপকূলরক্ষী বাহিনী পরে জাহাজটির অন্য সদস্যদের সহায়তা করে।
সাম্প্রতিক নৌযান চলাচলের তথ্যেও দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ পারাপারের সংখ্যা এখনো অত্যন্ত কম।
ইরানের শর্ত কী
ইরানের শীর্ষ আলোচক কালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক হুমকি ও অভিযান বন্ধ করা।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়ার প্রশ্নই নেই।
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল। এতে ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আরও বিস্তৃত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সোমবার সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ওই সময়সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন না।
ইরান এখনো আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি
তবে ইরান যে কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে, এমনটিও নয়। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপে আগ্রহী। তবে তার ভাষায়, আলোচনা মানে আত্মসমর্পণ নয়।
তিনি বলেন, সামরিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে তার অবস্থান থেকে সরানো যাবে না। দেশটি নিজের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মিত্রদের রক্ষায় অটল থাকবে, যদিও তারা যুদ্ধ চায় না।
তেলের বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে এবং তেলের দামও আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল, যা সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। মঙ্গলবারও এর দাম কিছুটা বেড়ে ৯১ ডলারের ওপরে স্থির হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হতো। ফলে এই নৌপথ দীর্ঘ সময় অচল থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি, পণ্য পরিবহন ও মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সংঘাতের কয়েক মাসে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, বিশেষ করে ইরান ও লেবাননে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, আলোচনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না এলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য সামনে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ফলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পরমাণু কর্মসূচি—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরেই এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আলোচনার পথ খুলবে, নাকি সংঘাত আরও তীব্র হবে, তার ওপর নির্ভর করছে শুধু দুই দেশের ভবিষ্যৎ নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতাও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















