০১:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
ক্যানসার কোষেই সক্রিয় হবে নতুন ‘স্মার্ট’ ওষুধ, সুস্থ কোষ থাকবে সুরক্ষিত দিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের সীমানার বাইরে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিল ভারত মন্সটেরা জাদু: বন্ধ হচ্ছে বারবিকানের ‘সবুজ ফুসফুস’, গাছের চারা নিয়ে ফিরলেন ৫০০ মানুষ পশ্চিম তীরের বসতি প্রকল্প বন্ধে ইসরায়েলকে ব্রিটেনের কড়া হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারি: ইরানকে সহায়তা করলেই ভুগতে হবে ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন কিম জং উন, চলতি বছরেই হতে পারে সাক্ষাৎ ঢাকার বায়ু এখনো সংবেদনশীলদের জন্য অস্বাস্থ্যকর ট্রাম্পের ছায়াসঙ্গী নাটালি হার্প: কেন এতটা প্রভাবশালী এই নারী? তালেবান শাসনের পাঁচ বছর: আফগানিস্তানকে ভুলে যাওয়ার মূল্য মাইরিয়াম কুরনাফ-লামবার্ট: নতুন করে ফিরে পাওয়া কনভেন্টের আত্মা

মাইরিয়াম কুরনাফ-লামবার্ট: নতুন করে ফিরে পাওয়া কনভেন্টের আত্মা

মারাকেশ থেকে নিস, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে সাঁ-জার্মাঁ-দে-প্রে, তারপর বে দেজ আঞ্জ—মাইরিয়াম কুরনাফ-লামবার্টের পেশাজীবনের পথ তৈরি হয়েছে ভালোবাসা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া এবং অর্থপূর্ণ কাজের মধ্য দিয়ে। এখন তিনি হোটেল দ্য কুভঁ-এর নেতৃত্বে। নিসের পুরোনো শহরের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি একসময় ছিল সপ্তদশ শতকের পুওর ক্লেয়ার্স সম্প্রদায়ের একটি কনভেন্ট। পারসিয়াস গ্রুপের উদ্যোগে দীর্ঘ ও যত্নশীল সংস্কারের পর জায়গাটি নতুন জীবন পেয়েছে।

রোমানেস্ক স্থাপত্যের খিলানের চারপাশে এখন প্রায় এক হেক্টর ঝুলন্ত বাগান, সাইট্রাস গাছে সাজানো টেরেস, নিসের স্থানীয় মানুষের জন্য উন্মুক্ত বাজার, বেকারি, বিস্ত্রো এবং খোলা আকাশের ক্যাফে—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে শান্ত এক নিজস্ব জগৎ। মাইরিয়ামের মমতাময় নেতৃত্বে এই অসাধারণ হোটেল একসঙ্গে ধারণ করছে আধ্যাত্মিকতা ও আতিথেয়তা, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়। সংযোগ স্থাপনকেই যিনি জীবনযাপনের দর্শন বানিয়েছেন, সেই নারীর সঙ্গে কথোপকথন।

এক দশকের স্বপ্ন থেকে বাস্তবতা

হোটেল দ্য কুভঁ-এর যাত্রা শুরু হয় ২০২৪ সালের ২০ জুন। মাইরিয়ামের কাছে এটি ছিল স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মুহূর্ত।

তিনি বলেন, দশ বছরের পরিশ্রম ও আবেগের পর জায়গাটিকে আবার জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখা ছিল অসাধারণ আনন্দের। এই প্রকল্পে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন দূরদর্শী বিনিয়োগকারী ভ্যালেরি গ্রেগো, স্টুডিও মেডিতেরানে-র স্থপতি লুই-আতোয়াঁ গ্রেগো এবং ফেস্তেন আর্কিটেকচার ও আতেলিয়ে সাঁ-লাজারের দল।

প্রতিদিনই সেই আবেগ নতুন করে ফিরে আসে—অতিথিদের বিস্ময়, কর্মীদের আনন্দ এবং দিনের শেষে কমলাগাছের উঠান ও অ্যাঞ্জেলো স্মানিওত্তোর পরিচর্যায় থাকা কনভেন্টের বাগানের দিকে তাকিয়ে তাঁর নিজের কৃতজ্ঞতার অনুভূতিতে।

ঐতিহ্য রক্ষা করেই নতুন পরিচয়

মাইরিয়ামের কাছে ৪০০ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটি শুধু একটি হোটেল নয়, বরং একটি দায়িত্ব। তাঁর ভাষায়, কনভেন্টকে তার মূল গৌরবে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই সংস্কারের কাজ করা হয়েছে। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত দীর্ঘ সংস্কারকাজে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্থাপনাটির ইতিহাস ও শান্ত পরিবেশকে।

তিনি চান, অতিথিরা এখানে এসে শুধু থাকার অভিজ্ঞতা না নিয়ে একটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির মধ্য দিয়ে যান—যেখানে প্রশান্তি ও কথোপকথনের সঙ্গে মিশে থাকবে আনন্দময় এবং আন্তরিক আতিথেয়তা।

অতিথির অনুভূতিই সবচেয়ে বড় প্রশংসা

হোটেলের দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার পর অতিথিরা যেন তাৎক্ষণিক শান্তি অনুভব করেন—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। অনেক অতিথিই জানিয়েছেন, জায়গাটিতে প্রবেশ করেই তাঁদের মধ্যে প্রশান্তি ও স্বস্তির অনুভূতি তৈরি হয়।

মাইরিয়ামের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশংসা হলো কেউ যদি বলেন, ‘মনে হচ্ছে এখানে কিছুই করা হয়নি।’ কারণ তাঁদের উদ্দেশ্যই ছিল এমন একটি সরল ও স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সবকিছু যেন নিজের জায়গায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে রয়েছে।

সাহিত্যের সঙ্গে আতিথেয়তার সেতুবন্ধন

সাহিত্য মাইরিয়ামের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০০৫ সালে প্যারিসের হোটেল মঁতালামবের-তে সাহিত্য পুরস্কার চালুর মাধ্যমে হোটেলজগতে লেখকদের নিয়ে আসার অন্যতম প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি।

নিসে এসে সেই আবেগকে আবার ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘প্রি দে সেজোঁ’ বা ‘ঋতুর পুরস্কার’। এর লক্ষ্য লেখক, পাঠক ও হোটেল ব্যবসার মানুষের মধ্যে নতুন সংলাপ তৈরি করা।

প্রথম আসরে পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলীতে ছিলেন সভাপতি ক্রিস্তফ ওনো-দি-বিও, সঙ্গে যোসিয়েন সাভিনিয়ো, জ্যঁ-বাতিস্ত আন্দ্রেয়া, জ্যঁ-ক্রিস্তফ রুফাঁ, দাভিদ ফোয়েনকিনোস, আমান্ডা স্তের্স, বার্নার ল্যু, আলিনা গুরদিয়েল এবং জুলি এসক্লাপেজ। পুরস্কার পেয়েছেন গ্রেগরি ল্য ফ্লক তাঁর ‘পো দোর্স’ বইয়ের জন্য, যা প্রকাশ করেছে এদিসিওঁ দ্য স্যুই।

মাইরিয়ামের কাছে এটি আতিথেয়তার কেন্দ্রে সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার একটি উপায়।

নিসের আলো ও ভূমধ্যসাগরীয় উষ্ণতা

নিস বহুদিন ধরেই ভ্রমণকারীদের স্বাগত জানিয়ে আসছে। রানি ভিক্টোরিয়া থেকে শুরু করে এমন বহু শিল্পী এখানে এসেছেন, যাঁরা শহরটির অনন্য আলোতে আকৃষ্ট হয়েছেন।

শহরের উজ্জ্বলতা, রং এবং শাগাল, মাতিস থেকে ইভ ক্ল্যাঁ পর্যন্ত বিস্তৃত শিল্পঐতিহ্য মাইরিয়ামকে প্রতিদিনই অনুপ্রাণিত করে। তাঁর জন্ম মারাকেশে হলেও নিস এখন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় শহর।

এখানে তিনি খুঁজে পান সেই মানবিক উষ্ণতা ও ভূমধ্যসাগরীয় আকর্ষণ, যা তিনি অতিথিদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান। তাঁর লক্ষ্য হলো নিসের আলো ও ফরাসি রিভিয়েরার এই শহরের জাদুকরী বৈচিত্র্যকে আরও উদযাপন করা।

শহরের মানুষের জন্যও উন্মুক্ত কুভঁ

প্রথম থেকেই মাইরিয়ামের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কুভঁ যেন শুধু হোটেল হয়ে না থাকে; এটি যেন শহরের মানুষের জন্যও একটি প্রাণবন্ত ও উন্মুক্ত জায়গা হয়।

কমলাগাছের উঠানে বসা বাজারে একসঙ্গে আসেন স্থানীয় উৎপাদক, কারুশিল্পী, বেকার ও ভেষজপণ্য বিক্রেতারা। সবার জন্য উন্মুক্ত ‘বিস্ত্রো দে সেরুরিয়ে’-তে মাত্র ৫ ইউরোতে পাওয়া যায় পিসালাদিয়ের এবং ১.৫০ ইউরোতে কফি। পরিবেশটি রাখা হয়েছে সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ।

ভ্রমণকারী ও নিসের স্থানীয় মানুষের এই সরাসরি যোগাযোগই কুভঁ-এর পরিচয়ের অংশ। বাজার হয়ে ওঠে দেখা করা, কথা বলা এবং পরিচয় গড়ে তোলার জায়গা। এরপর সেই সময়কে আরও দীর্ঘ করা যায় ‘গ্যাঁগিয়েত’ বা ‘রেস্তোরাঁ দ্য কুভঁ’-এ দুপুরের খাবারের মাধ্যমে।

চার শতকের ইতিহাস, নতুন জীবনের স্পন্দন

কুভঁ-এর ইতিহাস চার শতকের। তবে হোটেল হিসেবে এর বয়স মাত্র ১৬ মাস—এমন ভাবনা থেকেই মাইরিয়াম নিজের ভূমিকাকে দেখেন একজন ‘সহায়ক’ হিসেবে।

তাঁর মতে, এই স্থান তাঁদের আগে থেকেই ছিল এবং তাঁদের পরেও থাকবে। তাঁদের কাজ হলো এর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করা—সংগীত, নৃত্য ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে। জীবন্ত শিল্প পুরো জায়গাটিতে এমন এক স্পন্দন তৈরি করে, যা অন্য কোনো উপায়ে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।

ক্রিসমাসেই কুভঁ-এর আত্মা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে

বছরের একটি ঋতু বেছে নিতে হলে মাইরিয়ামের উত্তর নিঃসন্দেহে ক্রিসমাস।

তাঁর কাছে এটি উষ্ণতায় ভরা একটি সময়—ক্রিসমাস ট্রি, সরল ও খাঁটি সাজসজ্জা, হলির ফুলের তোড়া, ১ জানুয়ারি চুম্বনের ঐতিহ্যের জন্য মিসলটো, আর প্রতিদিন উঠানে অতিথিদের জন্য রাখা ক্লেমেন্টাইন ও গরম ভাজা চেস্টনাট।

হোটেলের শেফ এন্দি ল্যপাজ, ফ্লোরিয়াঁ গাগলিও এবং জেফ্রে মার্ক্সও তাঁদের রুটি, খাবার ও মিষ্টান্নে শীতের এই স্বাদগুলোকে তুলে ধরেন।

মাইরিয়ামের কাছে এই ঋতু মানবিকতা ও উষ্ণতার প্রতীক—যা তাঁর চোখে ল্য কুভঁ-এর প্রকৃত আত্মার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।

 

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্যানসার কোষেই সক্রিয় হবে নতুন ‘স্মার্ট’ ওষুধ, সুস্থ কোষ থাকবে সুরক্ষিত

মাইরিয়াম কুরনাফ-লামবার্ট: নতুন করে ফিরে পাওয়া কনভেন্টের আত্মা

১১:১৯:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

মারাকেশ থেকে নিস, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে সাঁ-জার্মাঁ-দে-প্রে, তারপর বে দেজ আঞ্জ—মাইরিয়াম কুরনাফ-লামবার্টের পেশাজীবনের পথ তৈরি হয়েছে ভালোবাসা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া এবং অর্থপূর্ণ কাজের মধ্য দিয়ে। এখন তিনি হোটেল দ্য কুভঁ-এর নেতৃত্বে। নিসের পুরোনো শহরের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি একসময় ছিল সপ্তদশ শতকের পুওর ক্লেয়ার্স সম্প্রদায়ের একটি কনভেন্ট। পারসিয়াস গ্রুপের উদ্যোগে দীর্ঘ ও যত্নশীল সংস্কারের পর জায়গাটি নতুন জীবন পেয়েছে।

রোমানেস্ক স্থাপত্যের খিলানের চারপাশে এখন প্রায় এক হেক্টর ঝুলন্ত বাগান, সাইট্রাস গাছে সাজানো টেরেস, নিসের স্থানীয় মানুষের জন্য উন্মুক্ত বাজার, বেকারি, বিস্ত্রো এবং খোলা আকাশের ক্যাফে—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে শান্ত এক নিজস্ব জগৎ। মাইরিয়ামের মমতাময় নেতৃত্বে এই অসাধারণ হোটেল একসঙ্গে ধারণ করছে আধ্যাত্মিকতা ও আতিথেয়তা, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়। সংযোগ স্থাপনকেই যিনি জীবনযাপনের দর্শন বানিয়েছেন, সেই নারীর সঙ্গে কথোপকথন।

এক দশকের স্বপ্ন থেকে বাস্তবতা

হোটেল দ্য কুভঁ-এর যাত্রা শুরু হয় ২০২৪ সালের ২০ জুন। মাইরিয়ামের কাছে এটি ছিল স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মুহূর্ত।

তিনি বলেন, দশ বছরের পরিশ্রম ও আবেগের পর জায়গাটিকে আবার জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখা ছিল অসাধারণ আনন্দের। এই প্রকল্পে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন দূরদর্শী বিনিয়োগকারী ভ্যালেরি গ্রেগো, স্টুডিও মেডিতেরানে-র স্থপতি লুই-আতোয়াঁ গ্রেগো এবং ফেস্তেন আর্কিটেকচার ও আতেলিয়ে সাঁ-লাজারের দল।

প্রতিদিনই সেই আবেগ নতুন করে ফিরে আসে—অতিথিদের বিস্ময়, কর্মীদের আনন্দ এবং দিনের শেষে কমলাগাছের উঠান ও অ্যাঞ্জেলো স্মানিওত্তোর পরিচর্যায় থাকা কনভেন্টের বাগানের দিকে তাকিয়ে তাঁর নিজের কৃতজ্ঞতার অনুভূতিতে।

ঐতিহ্য রক্ষা করেই নতুন পরিচয়

মাইরিয়ামের কাছে ৪০০ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটি শুধু একটি হোটেল নয়, বরং একটি দায়িত্ব। তাঁর ভাষায়, কনভেন্টকে তার মূল গৌরবে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই সংস্কারের কাজ করা হয়েছে। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত দীর্ঘ সংস্কারকাজে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্থাপনাটির ইতিহাস ও শান্ত পরিবেশকে।

তিনি চান, অতিথিরা এখানে এসে শুধু থাকার অভিজ্ঞতা না নিয়ে একটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির মধ্য দিয়ে যান—যেখানে প্রশান্তি ও কথোপকথনের সঙ্গে মিশে থাকবে আনন্দময় এবং আন্তরিক আতিথেয়তা।

অতিথির অনুভূতিই সবচেয়ে বড় প্রশংসা

হোটেলের দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার পর অতিথিরা যেন তাৎক্ষণিক শান্তি অনুভব করেন—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। অনেক অতিথিই জানিয়েছেন, জায়গাটিতে প্রবেশ করেই তাঁদের মধ্যে প্রশান্তি ও স্বস্তির অনুভূতি তৈরি হয়।

মাইরিয়ামের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশংসা হলো কেউ যদি বলেন, ‘মনে হচ্ছে এখানে কিছুই করা হয়নি।’ কারণ তাঁদের উদ্দেশ্যই ছিল এমন একটি সরল ও স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সবকিছু যেন নিজের জায়গায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে রয়েছে।

সাহিত্যের সঙ্গে আতিথেয়তার সেতুবন্ধন

সাহিত্য মাইরিয়ামের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০০৫ সালে প্যারিসের হোটেল মঁতালামবের-তে সাহিত্য পুরস্কার চালুর মাধ্যমে হোটেলজগতে লেখকদের নিয়ে আসার অন্যতম প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি।

নিসে এসে সেই আবেগকে আবার ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘প্রি দে সেজোঁ’ বা ‘ঋতুর পুরস্কার’। এর লক্ষ্য লেখক, পাঠক ও হোটেল ব্যবসার মানুষের মধ্যে নতুন সংলাপ তৈরি করা।

প্রথম আসরে পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলীতে ছিলেন সভাপতি ক্রিস্তফ ওনো-দি-বিও, সঙ্গে যোসিয়েন সাভিনিয়ো, জ্যঁ-বাতিস্ত আন্দ্রেয়া, জ্যঁ-ক্রিস্তফ রুফাঁ, দাভিদ ফোয়েনকিনোস, আমান্ডা স্তের্স, বার্নার ল্যু, আলিনা গুরদিয়েল এবং জুলি এসক্লাপেজ। পুরস্কার পেয়েছেন গ্রেগরি ল্য ফ্লক তাঁর ‘পো দোর্স’ বইয়ের জন্য, যা প্রকাশ করেছে এদিসিওঁ দ্য স্যুই।

মাইরিয়ামের কাছে এটি আতিথেয়তার কেন্দ্রে সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার একটি উপায়।

নিসের আলো ও ভূমধ্যসাগরীয় উষ্ণতা

নিস বহুদিন ধরেই ভ্রমণকারীদের স্বাগত জানিয়ে আসছে। রানি ভিক্টোরিয়া থেকে শুরু করে এমন বহু শিল্পী এখানে এসেছেন, যাঁরা শহরটির অনন্য আলোতে আকৃষ্ট হয়েছেন।

শহরের উজ্জ্বলতা, রং এবং শাগাল, মাতিস থেকে ইভ ক্ল্যাঁ পর্যন্ত বিস্তৃত শিল্পঐতিহ্য মাইরিয়ামকে প্রতিদিনই অনুপ্রাণিত করে। তাঁর জন্ম মারাকেশে হলেও নিস এখন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় শহর।

এখানে তিনি খুঁজে পান সেই মানবিক উষ্ণতা ও ভূমধ্যসাগরীয় আকর্ষণ, যা তিনি অতিথিদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান। তাঁর লক্ষ্য হলো নিসের আলো ও ফরাসি রিভিয়েরার এই শহরের জাদুকরী বৈচিত্র্যকে আরও উদযাপন করা।

শহরের মানুষের জন্যও উন্মুক্ত কুভঁ

প্রথম থেকেই মাইরিয়ামের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কুভঁ যেন শুধু হোটেল হয়ে না থাকে; এটি যেন শহরের মানুষের জন্যও একটি প্রাণবন্ত ও উন্মুক্ত জায়গা হয়।

কমলাগাছের উঠানে বসা বাজারে একসঙ্গে আসেন স্থানীয় উৎপাদক, কারুশিল্পী, বেকার ও ভেষজপণ্য বিক্রেতারা। সবার জন্য উন্মুক্ত ‘বিস্ত্রো দে সেরুরিয়ে’-তে মাত্র ৫ ইউরোতে পাওয়া যায় পিসালাদিয়ের এবং ১.৫০ ইউরোতে কফি। পরিবেশটি রাখা হয়েছে সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ।

ভ্রমণকারী ও নিসের স্থানীয় মানুষের এই সরাসরি যোগাযোগই কুভঁ-এর পরিচয়ের অংশ। বাজার হয়ে ওঠে দেখা করা, কথা বলা এবং পরিচয় গড়ে তোলার জায়গা। এরপর সেই সময়কে আরও দীর্ঘ করা যায় ‘গ্যাঁগিয়েত’ বা ‘রেস্তোরাঁ দ্য কুভঁ’-এ দুপুরের খাবারের মাধ্যমে।

চার শতকের ইতিহাস, নতুন জীবনের স্পন্দন

কুভঁ-এর ইতিহাস চার শতকের। তবে হোটেল হিসেবে এর বয়স মাত্র ১৬ মাস—এমন ভাবনা থেকেই মাইরিয়াম নিজের ভূমিকাকে দেখেন একজন ‘সহায়ক’ হিসেবে।

তাঁর মতে, এই স্থান তাঁদের আগে থেকেই ছিল এবং তাঁদের পরেও থাকবে। তাঁদের কাজ হলো এর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করা—সংগীত, নৃত্য ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে। জীবন্ত শিল্প পুরো জায়গাটিতে এমন এক স্পন্দন তৈরি করে, যা অন্য কোনো উপায়ে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।

ক্রিসমাসেই কুভঁ-এর আত্মা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে

বছরের একটি ঋতু বেছে নিতে হলে মাইরিয়ামের উত্তর নিঃসন্দেহে ক্রিসমাস।

তাঁর কাছে এটি উষ্ণতায় ভরা একটি সময়—ক্রিসমাস ট্রি, সরল ও খাঁটি সাজসজ্জা, হলির ফুলের তোড়া, ১ জানুয়ারি চুম্বনের ঐতিহ্যের জন্য মিসলটো, আর প্রতিদিন উঠানে অতিথিদের জন্য রাখা ক্লেমেন্টাইন ও গরম ভাজা চেস্টনাট।

হোটেলের শেফ এন্দি ল্যপাজ, ফ্লোরিয়াঁ গাগলিও এবং জেফ্রে মার্ক্সও তাঁদের রুটি, খাবার ও মিষ্টান্নে শীতের এই স্বাদগুলোকে তুলে ধরেন।

মাইরিয়ামের কাছে এই ঋতু মানবিকতা ও উষ্ণতার প্রতীক—যা তাঁর চোখে ল্য কুভঁ-এর প্রকৃত আত্মার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।