মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে গত কয়েক বছরে যে কজনকে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম নাটালি হার্প। ৩৫ বছর বয়সী এই নারী ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী। প্রেসিডেন্টের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা লিখে দেওয়া থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ নানা কাজে তাঁর ওপর নির্ভর করেন ট্রাম্প।
সম্প্রতি ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের একটি বক্তব্যের পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন হার্প। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিসরে তাঁর প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
কীভাবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন হার্প
ক্যালিফোর্নিয়ায় বেড়ে ওঠা হার্প একটি রক্ষণশীল খ্রিস্টান পরিবার থেকে এসেছেন। প্রচলিত রাজনৈতিক পথ অনুসরণ না করেই তিনি হোয়াইট হাউসের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত হন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি দাবি করেন, প্রেসিডেন্টের একটি উদ্যোগ তাঁর জীবন বাঁচাতে সহায়তা করেছে। হাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হার্প প্রচলিত চিকিৎসায় সাড়া না পাওয়ার পর পরীক্ষামূলক চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ট্রাম্পের সমর্থিত ‘চেষ্টা করার অধিকার’ আইনের মাধ্যমে এমন চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো হয়েছিল।
২০২০ সালের রিপাবলিকান জাতীয় সম্মেলনে হার্প আবেগঘন বক্তব্যে ট্রাম্পকে তাঁর জীবন রক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরেন। এরপরই ট্রাম্পের রাজনৈতিক শিবিরে তাঁর পরিচিতি দ্রুত বাড়তে থাকে।

ট্রাম্পও হার্পের বক্তব্য ও উপস্থিতির প্রশংসা করেছিলেন। নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হওয়ার পর হার্প একটি রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিতি পান এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন—এমন মিথ্যা দাবির প্রচারেও যুক্ত ছিলেন।
২০২২ সালে তিনি আবার ট্রাম্পের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে যোগ দেন।
হোয়াইট হাউসে তাঁর আসল দায়িত্ব কী
হোয়াইট হাউসে হার্পের আনুষ্ঠানিক পদ হলো প্রেসিডেন্টের নির্বাহী সহকারী। সাধারণত এই ধরনের পদে সময়সূচি, যোগাযোগ, প্রশাসনিক কাজ এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক দায়িত্ব সামলাতে হয়।
কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে হার্পের ভূমিকা অনেক বেশি বিস্তৃত বলে বিভিন্ন সূত্রের বর্ণনায় উঠে এসেছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের আশপাশে প্রায় সবসময়ই তাঁকে দেখা যায়।
হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে ও সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁকে ‘মানব মুদ্রণযন্ত্র’ বলেও ডাকেন। কারণ ট্রাম্প ছাপা কাগজে বিভিন্ন সংবাদ, প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লেখা পড়তে পছন্দ করেন, আর হার্প প্রায়ই তাঁর জন্য এসবের মুদ্রিত কপি বহন করেন।
এর ফলে প্রেসিডেন্ট কোন তথ্য দেখছেন, কোন সংবাদ তাঁর হাতে পৌঁছাচ্ছে এবং কোন বিষয় তাঁর নজরে আসছে—এসবের ওপর হার্পের অস্বাভাবিক মাত্রার প্রভাব থাকতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ট্রাম্পের ‘দরজার প্রহরী’ নাকি স্বস্তির সঙ্গী
ট্রাম্পের সঙ্গে হার্পের সার্বক্ষণিক উপস্থিতির কারণে তাঁকে কেউ কেউ ‘দরজার প্রহরী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। আবার অনেকে তাঁকে ট্রাম্পের ‘স্বস্তির কম্বল’ বলেও অভিহিত করেছেন।
এর অর্থ হলো, তিনি শুধু প্রশাসনিক কাজ করেন না; ট্রাম্পের ব্যক্তিগত স্বস্তি ও আস্থার ক্ষেত্রেও তাঁর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লেখাতেও হার্পের ভূমিকা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট যা বলতে চান, তা তাঁর হয়ে লিখে দেওয়ার কাজও করেন তিনি।
২০২৪ সালের একটি ঘটনার ছবি সম্প্রতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, ট্রাম্পের নির্দেশনা অনুযায়ী হার্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য একটি লেখা টাইপ করছেন। ট্রাম্প তখন অন্য এক রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য দেখছিলেন।
গোপন বিমানযাত্রা ঘিরে নতুন বিতর্ক
হার্পকে নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের গোপন বিমানযাত্রাকে কেন্দ্র করে।
ইরানের সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর ট্রাম্প তুরস্ক থেকে একটি গোপন বিমানযাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রে ফেরেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। ওই যাত্রায় ট্রাম্পের সঙ্গে হার্পও ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ এ বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্পকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে হার্পের ভ্রমণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং কাতারের আমিরের উপহার হিসেবে পাওয়া নতুন প্রেসিডেন্টের বিমান নিয়েও কটাক্ষ করেন।
এরপর হার্পের ভূমিকা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা আরও বেড়ে যায়।
কেন ট্রাম্প এতটা বিশ্বাস করেন হার্পকে
হার্পের ভাই প্রেস্টন হার্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই তাঁর বোন হোয়াইট হাউসের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। এমনকি ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশসহ আগের কয়েকজন প্রেসিডেন্টকে চিঠিও লিখেছিলেন।
ভাইয়ের মতে, হোয়াইট হাউসে কাজ করার সুযোগ পাওয়া ছিল হার্পের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ। ট্রাম্পের প্রতি তাঁর গভীর কৃতজ্ঞতাও তাঁদের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।

হার্প বিশ্বাস করেন, ট্রাম্পের উদ্যোগের কারণেই তিনি জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছিলেন। ফলে ট্রাম্পের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত আনুগত্য অন্য অনেক সহযোগীর তুলনায় অনেক বেশি বলেই মনে করা হয়।
হোয়াইট হাউসও পাশে দাঁড়িয়েছে
হার্পকে ঘিরে বিতর্ক বাড়ার পর হোয়াইট হাউস প্রকাশ্যেই তাঁর পক্ষ নিয়েছে। তাঁকে প্রেসিডেন্টের একজন ‘বিশ্বস্ত ও মূল্যবান’ সহযোগী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এক সাংবাদিক ট্রাম্পকে হার্পকে নিয়ে অসফের মন্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন করার পর হোয়াইট হাউস ওই সাংবাদিকের সমালোচনা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সাংবাদিকের প্রশ্নকে একজন কর্মীর প্রতি অন্যায় আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তবে ট্রাম্প নিজে প্রকাশ্যে হার্পকে নিয়ে খুব বেশি কথা বলেননি।
ট্রাম্পের পাশে থাকা এক রহস্যময় মুখ
হার্পের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রকাশ্যে খুব বেশি তথ্য নেই। তাঁর বিষয়ে প্রচারিত বেশির ভাগ তথ্য এসেছে সাংবাদিকদের লেখা বই ও বেনামি সূত্রের মাধ্যমে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর উপস্থিতি অত্যন্ত দৃশ্যমান। ওভাল অফিস থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্টের অভ্যন্তরীণ বৈঠক এবং দেশ-বিদেশের সফর—প্রায় সর্বত্রই তাঁকে দেখা যায়।
তাই আনুষ্ঠানিক পদমর্যাদা তুলনামূলকভাবে সাধারণ হলেও ট্রাম্প প্রশাসনে নাটালি হার্পের প্রকৃত প্রভাব যে অনেক বেশি, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে। ট্রাম্পের কাছে তিনি একই সঙ্গে তথ্যের প্রবেশদ্বার, বিশ্বস্ত সহকারী এবং ব্যক্তিগত আস্থার একজন মানুষ—এমন ধারণাই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















